ব্যাংক মালিকদের সুবিধা দিতে করপোরেট কর হ্রাস

অর্থনীতিবিদদের অভিমত ।। চাপ বাড়বে জনগণের ওপর

জাহেদুল কবির

মঙ্গলবার , ১২ জুন, ২০১৮ at ৭:০২ পূর্বাহ্ণ
73

প্রস্তাবিত বাজেটে (২০১৮১৯) করপোরেট করের হার আড়াই শতাংশ কমানোর সাথে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণপ্রাপ্তির কোনো সম্পর্ক নেই বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, এতে উল্টো ব্যাংকিং খাতে সরকারের ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা আয় কমে যাবে। ব্যাংক মালিকদের সুবিধা দিতেই করপোরেট করের হার কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তারা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউজিসি প্রফেসর খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম দৈনিক দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত বাজেটে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের সুবিধা করে দিতে করপোরেট কর আড়াই শতাংশ কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ব্যাংক মালিক পরিচালকদের মুনাফা বাড়বে। একই সাথে ৫ থেকে ৭ হাজার কোটি টাকা সরকারের রাজস্ব কমে যাবে। এই টাকাটি সরকারকে অন্য সোর্স থেকে আহরণ করতে হবে। এতে উল্টো জনগণের ওপর চাপ বাড়বে। অন্যান্য ব্যবসার ক্ষেত্রে কিন্তু করপোরেট কর ৪০ শতাংশই বহাল রেখেছে সরকার। বলা হচ্ছে, সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য ব্যাংক মালিকদের এই সুবিধা দেয়া হচ্ছে, করপোরেট কর কমানোর সাথে ব্যাংক ঋণগ্রহীতাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি উঠেছেসঞ্চয়পত্রের সুদের হার যেনো কমানো হয়। তবে সঞ্চয়পত্রে যেহেতু বেশি সুদ পাওয়া যায়, তাই সাম্প্রতিক সময়গুলোতে দেদারছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হচ্ছে। মানুষ সঞ্চয়পত্রের বিভিন্ন স্কিমে বিনিয়োগ করছে। আমার মতে, সঞ্চয়পত্র মূলত অবসরপ্রাপ্ত লোকজনের জন্য উপযুক্ত জায়গা। তবে এখন দেখা যায়, বড়লোকেরাও সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। তাই সঞ্চয়পত্রকে বিক্রিকে ঘিরে আলাদা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এতে কিছু কঠিন শর্ত জুড়ে দিতে হবে, যাতে বড়লোকেরা কোনোভাবে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে না পারে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা কমাতে ব্যাংক কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে সেই এক বছর আগে থেকেই। এটি খুবই দরকার। কারণ ব্যাংকিং সংকটের কারণ অনুসন্ধানের জন্য ব্যাংকিং কমিশন আবশ্যক। যদিও ইতোমধ্যে আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, আপাতত ব্যাংকিং কমিশন হচ্ছে না। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক কারণ আছেকিনা তা আমি বলতে পারবো না।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘ব্যাংকিং খাতে অরাজকতা সৃষ্টির জন্য স্বল্প সংখ্যক লোক দায়ী। কিন্তু বাজেটে তাদের তিরস্কার না করে বরং পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের মালিকদের চাপে আড়াই শতাংশ করপোরেট কর কমানো হয়েছে। এ খাতের টাকা কারা নষ্ট করলো তাদের বিচার হওয়া জরুরি। সেজন্য কমিশন গঠন না করলেও অন্তত একটা তদন্ত কমিটি গঠন করে তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা উচিত। আমার মতে ব্যাংকের সুদের হার কম বেশি নির্ভর করে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ের ওপর। এটার সাথে করপোরেট করের হার কমানোর সাথে ঋণের সুদ সিঙ্গেলে ডিজিটে আনার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী বলেছিন, ব্যাংকিং খাতে সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এ মাসের মধ্যেই একটি কমিশন গঠন করবেন। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটের পর তিনি জানালেন, কমিশন গঠনের কাজ আগামী সরকারের হাতে দিয়ে যাবেন। তার (অর্থমন্ত্রীর) এসব কথা আমরা বুঝতে পারি না। তিনি একেক সময় একেক কথা বলেন। তবে আমার মনে হয়, ব্যাংকিং কমিশন গঠন করলে ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতিবাজদের স্বরূপ উন্মোচিত হবে। নির্বাচনের বছরে সরকার হয়তো সেটি চাচ্ছেন না।’

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আরো বলেন, ‘আমানত বাড়াতে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর কথা বলেছেন অনেকে। আমার মতে, সঞ্চয়পত্রে যথাযথ লোকেরা বিনিয়োগ করছেন কিনা সেটি মনিটরিং করতে হবে। সঞ্চয়পত্র যদি অবসর প্রাপ্ত লোক ও বিধবা শ্রেণীর লোকজন কিনে তাহলে সুদের হার কমানোর প্রয়োজন নেই বলে মনে করি।’

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ব্যাংক মালিকরা সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে ইতোমধ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাই তাদের তুষ্ট করতেই করপোরেট করের করের হার আড়াই শতাংশ কমানো হয়েছে। সুতরাং সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণপ্রাপ্তির বিষয়টি এখানে মুখ্য নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে দেশে সুশাসনের অনুপস্থিতি রয়েছে। ব্যাংকিং কমিশন গঠনের কথা থাকলেও সেটিতেও পিছু হটেছে সরকার। বিষয়টা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। সরকার হয়তো নির্বাচনের বছরে এসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে চাইছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সঞ্চয়পত্র বিক্রিও সরকার সুচিন্তিতভাবে করছে বলে মনে হচ্ছে না। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বেশি হওয়ায় মানুষ বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। এতে কিন্তু সরকারের ঋণের বোঝা বাড়ছে। তাই বাজেটের আকার বাড়ার সাথে সাথে বাজেটে ঘাটতিও বাড়ছে। এটা অনেকটা দুষ্টচক্রের মতো।’

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘করপোটের করের হার কমার ফলভোগ করবেন একমাত্র ব্যাংক মালিকরাই। এর ফলে ব্যাংক মালিকরা ঋণের সুদ কমাবেন বলে আমরা মনে করি না। সরকারের কাছে আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছি, ব্যাংক ঋণের সুদের হার যেন সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হয়। কিন্তু সেটি তো হয়নি উল্টো গত মার্চে বিভিন্ন ব্যাংক ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নির্ধারণ করেছে। এতে দেশে বিনিয়োগ কমে আসছে। দিনে দিনে ঋণখেলাপির সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বিষয়টি নিয়ে আমরা ব্যবসায়ী সমাজ উদ্বিগ্ন।’

এদিকে গত রোববার দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাতের ‘বিশৃঙ্খলা’ নিয়ে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের তোপের মুখে পড়েন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। ২০১৭১৮ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে ২০১৮১৯ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক মালিকদের বাড়তি সুবিধা দেয়ায় তারা অর্থমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেন। সংসদে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আলী আশরাফ সম্পূরক বাজেটের আলোচনায় বলেন, ব্যাংকিং খাতকে সুষ্ঠু শৃঙ্খলার মধ্যে আনা প্রয়োজন। না হলে আর্থিক খাত ভেঙ্গে পড়বে। এ বিষয়ে অর্থমন্ত্রীকে পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, খেলাপিদের একটু ধরেন। অর্থ পাচারকারীদের ধরেন। ব্যাংকের লুটপাট থেকে বেরিয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে না পারলে বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হবে না। লুটপাটকারীদের ধরেন, মানুষের কনফিডেন্স ফিরে আসবে।

সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য

উল্লেখ্য, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ঘাটতি ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা। ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে নেয়া হবে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। আর সঞ্চয়পত্র থেকে ২৬ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা নেয়া হবে, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে খেলাপী ঋণে আক্রান্ত ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। যা গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল ৭৪ হাজার ৩০৩ কোটি ১১ লাখ টাকা।

x