ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সকল বাধা দূর করতে হবে

বৃহস্পতিবার , ৮ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:০১ পূর্বাহ্ণ
18

সহজে ব্যবসা করার সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ এগোলেও কার্যত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ২০১৯ সালের সহজে ব্যবসা করার ১৯০টি দেশের মধ্যে এক ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে ১৭৬তম। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৭তম। বিশ্ব ব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস-২০১৯’ নামের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। কোনো দেশে উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসার নিয়ম-কানুন ও প্রক্রিয়া কতটুকু সহজ বা কঠিন সে বিষয়ে জরিপের ভিত্তিতে তৈরি বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন ওয়াশিংটন থেকে প্রকাশিত হয়েছে। তালিকার শীর্ষে রয়েছে নিউজিল্যান্ড, তারপর রয়েছে সিঙ্গাপুর, ডেনমার্ক ও হংকং। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে ৮ নম্বর স্থানে ও ৪৬তম স্থানে রয়েছে চীন। পাকিস্তানের রাঙ্কিং ১৩৬। বলা যেতে পারে, বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ ব্যবসার ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংক পরিচালিত সহজে ব্যবসা করার সূচকে আফগানিস্তান ও মিয়ানমারের থেকেও পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের অবস্থান ১৬৭তম এবং মিয়ানমার আছে ১৭১-এ।
একটি ব্যবসা শুরু থেকে পরিচালনা পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ১০টি সূচকের ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। সেগুলো হল : ব্যবসায় শুরু, নির্মাণের অনুমোদন নেয়ার প্রক্রিয়া, বিদ্যুুতের সরবরাহ, সম্পত্তির নিবন্ধন, ক্রেডিট অর্জন, সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা, কর প্রদান, বৈদেশিক বাণিজ্য, চুক্তির বাস্তবায়ন ও অসচ্ছলতা দূরীকরণ। বাংলাদেশের অবস্থান গত বছরের র‌্যাংকিং থেকে এক ধাপ উঠে এসেছে ঠিকই, তবে সাতটি সূচকে আগের চাইতে পিছিয়ে গেছে। এর জন্য বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার ধীরগতিকে প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। আবার এই সূচকগুলোতে বিগত বছরগুলোর তুলনায় উন্নয়নের উদাহরণ সৃষ্টি করেছে আফগানিস্তান। পাঁচটি ক্ষেত্রে রেকর্ড হারে সংস্কারের মাধ্যমে তারা নিজেদের এই অবস্থান পরিবর্তন করতে পেরেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের অনেকে বলে থাকেন, বাংলাদেশের অগ্রগতি উদাহরণ দেওয়ার মতোই। অর্থনীতি ও আর্থসামাজিক বেশির ভাগ সূচকে বাংলাদেশ ছাড়িয়ে গেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে ছাড়িয়েছে তো অনেক আগেই।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি জনবহুল ও নিম্ন আয়ের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যেভাবে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য দূর এবং বৈষম্য কমানোকে সংযুক্ত করেছে, তা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করে প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন উদাহরণ দেওয়ার মতো একটি দেশ।
এ অবস্থায় সহজে ব্যবসা করার সুযোগ-সুবিধার সূচকে বাংলাদেশ এতো পিছিয়ে, তা ভাববার অবকাশ পাই না। অথচ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের সম্ভাবনাময় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বাণিজ্যিক আইনকানুনে দুর্বলতার জন্য এ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখানে পদে পদে বাধা। চুক্তি আইনের দুর্বলতা, কর আইনে জটিলতা, নিবন্ধন পেতে বিলম্ব এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংযোগে ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের হয়রানিতে পড়তে হয়। অন্যদিকে ঘুষ, দুর্নীতি, বন্দরে দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের নিয়মিত সমস্যা। এ কারণে সহজে ব্যবসা করার দিক থেকে ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এতো নিচে। আর এ অবস্থার উত্তরণে দেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক ও কর্পোরেট আইনে বড় ধরনের সংস্কার আনতে হবে।
বিনিয়োগের অন্যতম শর্ত হল জ্বালানি। ২০২১ সালে বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা হবে ২৪ হাজার মেগাওয়াট। এ ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করতে হবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি দিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে পরিবর্তন ছাড়া টেকসই জ্বালানি নিশ্চিত করা যাবে না। অন্যদিকে, দেশে বর্তমান কর্মক্ষম লোকদের নিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি প্রতিবেদন চিন্তার উদ্রেক করেছে। এতে দেখা যায়, ১৫ থেকে ২৬ বছর বয়সী ৪০ ভাগ কর্মক্ষম তরুণ নেই শিক্ষায়, নেই কাজে কিংবা নেই প্রশিক্ষণ গ্রহণে। অনেকে তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ করে বলছে, এসব নিষ্ক্রিয় তরুণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাণ্ডিত্য দেখাতে অতি সক্রিয়। কিন্তু অনুধাবন করতে পারছে না- তারা অনুৎপাদনশীল, সেই সঙ্গে সমাজের বোঝা। এদেরকে দ্রুত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে কর্মমুখী করতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ‘শোভন কাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন’ নামে অষ্টম লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। মোট কথা, সুশাসনই অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে পারে। ব্যবসা ও বিনিয়োগে সৃষ্ট বাধাগুলো দূর করা জরুরি।

x