ব্যবসার প্রধান সমস্যা দুর্নীতি রোধে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেয়া হোক

রবিবার , ৪ নভেম্বর, ২০১৮ at ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ
22

বাংলাদেশে ব্যবসার প্রধান সমস্যা দুর্নীতি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট-২০১৮ তে। পত্রিকান্তরে ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) বাংলাদেশে ব্যবসা করার ক্ষেত্রে দুর্নীতিকে সবচেয়ে বড় সমস্যা চিহ্নিত করেছে। সমস্যা হিসাবে দুর্নীতির পরই রয়েছে অবকাঠামো ঘাটতি ও আমলাতন্ত্রের অদক্ষতা। এসব সমস্যার মধ্যেই প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে (জিসিআই) আরো এক ধাপ অবনমন হয়েছে বাংলাদেশের। গত ১৭ অক্টোবর প্রকাশিত গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট ২০১৮ তে এ তথ্য উঠে এসেছে। ডব্লিউইএফের পার্টনার প্রতিষ্ঠান হিসেবে গত ১৭ অক্টোবর রাজধানী সিরডাপ মিলনায়তনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে এবার মোট ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম যা গত বছরের তুলনায় এক ধাপ অবনমন। এক্ষেত্রে ২০১৭ সালে ১৩৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০২ তম। এবারের প্রতিবেদন তৈরিতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৮৩ ব্যবসায়ীর মতামত নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নয়জন কৃষি, ৩০ জন শিল্প, ৪৩জন সেবা ও একজন মিশ্র খাতের ব্যবসায়ী। প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রতিযোগিতা সূচক তৈরিতে বিবেচ্য মোট ১২টি স্তম্ভের মধ্যে তিনটিতে বাংলাদেশের উন্নতি হলেও বাকি নয়টিতে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় ২০১৬ সালে এক ধাপ এবং ২০১৭ সালে সাত ধাপ অগ্রগতিতে দেশবাসী আশান্বিত হয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে ঘোষিত প্রতিবেদনে এক ধাপ অবনমন দেশবাসীকে কিছুটা হতাশ করেছে।
অবশ্য এবার সঠিকভাবে বাংলাদেশের পয়েন্ট কমেনি, বরং শূন্য দশমিক পয়েন্ট বেড়েছে। তবে এবারের গবেষণা পদ্ধতিতে একটা বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেসব বিষয় কেন্দ্র করে সুচক তৈরি হয়, সেখানে এবার আইসিটি ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সঠিকভাবে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়ার কারণ এটাই। ডব্লিউইএফ এর প্রতিবেদনে আগামী দিনগুলোর জন্য পাঁচটি ফ্যাক্টর উঠে এসেছে। এগুলো হলো, অবকাঠামোতে প্রস্তুতি, প্রস্তুতিগত উৎকর্ষ, প্রাশিক্ষিত জনবল, প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও নীতিমালার উপযোগিতা। শ্রমনির্ভরতা দিয়ে আমরা অর্থনীতিকে প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তুলতে পারব না। এ পাঁচটিকে সমন্বিত রাখতে পারা না গেলে, প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলা যাবে না। তবে সবকিছু ছাপিয়ে ব্যবসার প্রধান সমস্যা হিসেবে দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসার ব্যাপারটি খুবই হতাশাব্যঞ্জক। শুধু পাকিস্তান ছাড়া প্রতিবেশী দেশগুলো সক্ষমতাসূচকে এগিয়ে আছে। কাজেই সক্ষমতার সমীহযোগ্য অবস্থানে পৌঁছানোর জন্যে এখনো অনেক পথ অতিক্রম করতে হবে বাংলাদেশকে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যেসব বিষয়ের ওপর নেতিবাচক মতামত ব্যক্ত করেছেন তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশে ব্যবসায় প্রযুক্তি নির্ভরতা ও দক্ষতা বাড়ানো ছাড়া অন্য কোন পথ নেই। সামষ্টিক অর্থনীতি ও অবকাঠামোর মতো মৌল ভিত্তিগুলো কিছুটা জোরদার হলেও দক্ষতায় বাংলাদেশ রয়েছে পেছনে। বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। এখন বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা (এসডিজি অর্জনে সফল হওয়ার পর বাংলাদেশ এবার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ নিচ্ছে। দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায় ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যেসব সমস্যা চিহ্নিত করেছে সেগুলো হলো দুর্বল অবকাঠামো, বিনিয়োগের জন্য অর্থ না পাওয়া, নীতির ধারাবাহিকতা না থাকা, মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, টাকার অবমূল্যায়ন, করহার, শিক্ষিত কর্মীর অভাব, শ্রম আইনের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বল জনস্বাস্থ্যসেবা। এসব সমস্যা বহু পুরনো হলেও প্রতিকারে কোন সরকারই দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানের প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়েছে।
অবকাঠামোগত উন্নয়নে পিছিয়ে থাকার কারণে আমদানি-রফতানি দুটো খাতেই ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়ছে। আকাশপথের অবস্থা খানিকটা ভালো থাকলেও সড়ক, নৌ ও রেলপথের অবস্থা ভালো নয়। তাই পরিবহনেও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিনিয়োগ পরিবেশের অভাব, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকা, নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতি, ব্যবসায়ে উচ্চহারে করসহ একাধিক কারণে দেশ থেকে মুদ্রা পাচার হচ্ছে। এর থেকে রেহাই পেতে সরকারি-বেসরকারি বিবিধি উদ্যোগ গ্রহণ দরকার। আজকের পৃথিবী প্রতিযোগিতার পৃথিবী। সর্বক্ষেত্রে চলছে প্রতিযোগিতা। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ সবখানেই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগিতাপূর্ণ কোন অর্জন নিয়ে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। সকল অর্জনকে ধরে রাখতে হবে, অগ্রগতির ধারাকে আরো বেগবান করতে হবে আমাদের। বিশ্বপরিসরে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জনে আমরা অগ্রগতির ধারায় রয়েছি-এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে আমাদের আরো অনেক এগুতে হবে। এর জন্য এগোবার পথে যেসব বাধা বিপত্তি চিহ্নিত হয়েছে সেগুলো উত্তরণে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।সক্ষমতা উন্নয়নে উপযুক্ত অবকাঠামো, নীতি-কৌশলের সঙ্গে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা, সুশাসনের ক্ষেত্রে অগ্রগতি জরুরি। এক্ষেত্রে সরকার শুধু নয়, একই সাথে সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্বশীলদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে।

x