ব্যথা মুক্ত শীতকাল

মুজিবুল হক শ্যামল

শনিবার , ১ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ
159

হিম হিম কুয়াশা নিয়ে প্রকৃতিতে শীত জাঁকিয়ে বসেছে। শীতের শুরুতে প্রকৃতিতে তাপমাত্রা পরিবর্তনের কারণে নানারকম ভাইরাস জনিত রোগ ও ব্যথার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। শীত যেমন আরামের, তেমনি রোগেরও। তবে শীতের সঙ্গে ব্যথা বাড়া বা কমার প্রত্যক্ষ কোনও সম্পর্ক নেই, শীতে ব্যথা বাড়ে পরোক্ষভাবে। এই সময় শরীরের নার্ভগুলো হাইপারসেনসিটিভ অর্থাৎ অতিরিক্ত মাত্রায় সংবেদনশীল হয়ে যায়। তার জন্য শীতে একটু চোট-আঘাত বা বাতের ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। এর পাশাপাশি শীতে শারীরিক পরিশ্রম অনেকেই কমিয়ে দেয়। বিশেষত ছোট বা বয়স্করা শীতে হাঁটা-চলার বদলে লেপ-কম্বলের নিচে থাকতেই বেশি পছন্দ করে, ফলে হাঁড়ের সংযোগস্থল আরও স্টিফ বা শক্ত হয়ে যায়, তখন ব্যথা বাড়ে। পূর্ণিমা বা অমাবস্যায় ব্যথা বাড়ার যেমন কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নেই, তেমনই শীতের সঙ্গে ব্যথা বাড়ারও সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। পানি কম খেলে পানিশূন্যতা থেকে প্রদাহ ও ব্যথা বাড়তে পারে। ঠান্ডায় শরীর অতিরিক্ত তাপ হারালে হাতে পায়ে রক্ত চলাচল কমে, এতেও ব্যথা বাড়তে পারে।
শীতকালে ব্যথা কেন বাড়ে?

শীতে কি বাত রোগ হয়, নাকি শীতের কারণেও বাত রোগ হয়? আসলে কোনটিই ঠিক না, রোগীর ব্যথা শীতে বাড়ে। এটা কোনো রোগ নয়, এটা বিভিন্ন রোগের উপসর্গ মাত্রা। শীতে হাত ও পায়ের দিকে রক্তসঞ্চালন কমে যায়, ফলে জয়েন্ট সমূহের প্রদাহ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যথা ধীরে ধীরে জয়েন্ট ও মাংস পেশি শক্ত হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।
বিভিন্ন জয়েন্টের চারপাশের ত্বক খুব বেশি ঠাণ্ডা হলে স্নায়ু প্রান্তগুলোর সংবেদনশীলতা বেশি হয়। শীতকালে শরীরের অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন- ডি’র পরিমাণ হ্রাস পায়, যা মুড বা ভাব, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, হাঁড় ও জয়েন্টের সমস্যা সৃস্টি করে। বংশগতভাবে শীতকালে বিভিন্ন জয়েন্টে ব্যথা বা ফোলা দেখা দিতে পারে। বাতাসের চাপের সঙ্গে শীতকালে অক্সিজেনের পরিমাণও কমে যায়। আমরা নিঃশ্বাসের সঙ্গে অল্প পরিমাণ অক্সিজেন পাই, যা শরীরে সহজেই ক্লান্তি নিয়ে আসে এবং যেকোন কাজে আলস্যতা এনে দেয়। গরমকালে বাতের ব্যথার তীব্রতা কিছুটা কমতে পারে। শীতকালে অনেক সময় জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে ওঠে এবং জোড়া বা বাতের ব্যথা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায়। বয়স্ক লোকজন, বিশেষ করে যারা প্রদাহ আথ্রাইটিস, রিওমাটয়েড আথ্রাইটিসে ভুগছেন তাঁদের কষ্ট বহুলাংশে বেড়ে যায়। এছাড়া পেশি, লিগামেন্ট, হাঁড় ও স্নায়ুর ব্যথা তীব্ররূপ ধারণ করে।
কী কী কারণে শরীরে ব্যথা হতে পারে

বাত সমস্যা : বাতের সমস্যা শীতকালে খানিকটা বাড়ে। বায়োমেট্রিক চাপ এই সময়ে কমে যাওয়ার দরুণ তাপমাত্রায় পরির্তন হয়। ফলে এই সময়টায় ব্যথা বেশি হয়।

সায়াটিকা : সায়াটিকা নার্ভটি শরীরের মধ্যে সবচেয়ে বড়। এতে চাপ বাড়লইে শরীরে ব্যথা হয়। শীতকালে এই সমস্যা আরও বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস জনিত ব্যথা : যারা ডায়াবেটিস রোগীদের সব সময় ব্যথা অনুভব হলেও, তাঁদের এসময় শীতের কারনে ব্যথার পরিমাণটা বেশি লক্ষ্য করা যায়। তাই ব্যথা থেকে বাঁচতে সময় বের করে ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন।

মাংসপেশিতে টান : শীতকালে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় মাংসপেশিতে টান ধরে। এছাড়া নানা কাজে পেশির ব্যবহার করতে গিয়ে পায়ের টান ধরে ব্যথা হয়।

ফাইব্রোমাইয়ালজিয়া : অনেক সময়ই আমরা বুঝতে পারি না সমস্যাটা ঠিক কোথায় ও কেন হচ্ছে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ব্যথা ও শারীরিক অসামর্থ্যতার একটি অন্যতম কারণ হতে পারে। আর এই অবহেলার ফলে পা থেকে ব্যথা শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এটি সাধারণত শীতকালে দেখা দেয়।

শারীরিক চাপ বৃদ্ধি : শীতকাল ও বিশেষ করে বরফে ঢাকা এলাকায় শারীরিক চাপ স্বাভাবিকের চেয়ে আরও বেড়ে যায়। ফলে পায়ে, হাঁটুতে ব্যথা হওয়া স্বাভাবিক।

অল্প পানি পান : শীতকালে আমরা অনেকেই অল্প পানি পান করি। প্রয়োজনের তুলনায় পানি কম পান করলে শরীরে ফ্লুইডের ঘাটতি দেখা দেয়। এ সময়ে মাংসপেশি এমনিতেই আড়ষ্ট থাকে। শরীরে পানি ঘাটতির কারনে ত্বক ফাটতে শুরু করে।

প্রতিরোধ ও চিকিৎসা : শীতকালে ব্যথা মুক্ত থাকতে চাইলে অবশ্যই আপনাকে কিছুটা সময় ব্যায়াম করতে হবে। শীতের সময় ব্যায়াম করা স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। আর শরীর যাতে অতিরিক্ত তাপ না হারায় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে, ব্যথার স্থানে গরম সেক দিবেন। কারণ গরম কোনও কিছুর সংস্পর্শে এলে মাংসপেশী শিথিল ও রক্তনালি প্রসারিত হয়, ফলে ব্যথা থেকে আরাম মেলে। যাঁদের নিয়মিত আর্থাইটিস এর চিকিৎসায় ফিজিওথেরাপি নিতে হয়, তাঁদের ব্যথা বাড়লে ফিজিওথেরাপিষ্টের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা বা ব্যায়াম করতে হবে। শারীরিক পরিশ্রম না করে শীতে জবু-থবু হয়ে বসে থাকবেন না। এতে জয়েন্ট বা সন্ধির প্রদাহ বাড়ে, ঠাণ্ডায় বাইরে না বেরোলেও ঘরের মধ্যেই হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করুন। এতে সন্ধির স্টিফ বা শক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
পানি খান বেশি করে, পানি কম খেলে পানিশূন্যতা থেকে প্রদাহ ও ব্যথা বাড়তে পারে। যাদের নিয়মিত আর্থাইটিস এর চিকিৎসা ফিজিওথেরাপি নিতে হয়, তাদের ব্যথা বাড়লে ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা বা ব্যায়াম করতে হবে। শীতে ব্যথার ভয়ে কুঁকড়ে থাকলে ব্যথা কিন্তু আরও মাথাচাড়া দেবে। ব্যথা উপশমের পন্থাগুলোকে মেনে ব্যথা থেকে দূরে থাকুন আর উপভোগ করুন মাত্র কয়েক দিনের অতিথি শীতকে।

x