ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হিসেবে কাজ করছে সঞ্চয়পত্র

শুক্রবার , ১০ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:৫৩ পূর্বাহ্ণ
216

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার সমন্বয় করাবিষয়ক এক বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার সাধারণত ব্যাংকে আমানতের সুদের চেয়ে এক বা দেড় শতাংশ বেশি থাকে। কিন্তু এখন এটা অনেক বেশি হয়ে গেছে। এটা কমাতে হবে। তবে হারের পরিবর্তন যদি কিছু হয়ও, নির্বাচনের আগে হবে না।

নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হচ্ছে নাএটা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য সুসংবাদ। যদিও সরকারকে প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ এমনকি তিন গুণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে হচ্ছে। দাতাদের অব্যাহত চাপ সত্ত্বেও নির্বাচনের আগে সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমানো হচ্ছে না। কারণ সুদহার কমালে সাধারণ মানুষের কাছে সরকার অজনপ্রিয় হওয়ার আশংকা থাকছে। ফলে ব্যাংকের আমানতের সুদহার কমে গেলেও অর্থ বিনিয়োগের জনপ্রিয় মাধ্যমটি আগের মতোই আকর্ষণীয় থাকছে।

সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নিয়ে কয়েক বছর ধরে বিভিন্নমুখী বিতর্ক চলছে। বিতর্কটা প্রাসঙ্গিকই। সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকার জনগণকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে কিছু টাকা ধার করে। আমানতকারীদের দেওয়া হয় মুনাফা। ব্যবস্থাটা দীর্ঘদিন ধরেই চলছিল। জনগণকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে খোলা হয়েছিল একটি পরিদপ্তর। এখন তা অধিদপ্তরে উন্নীত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এর শাখা আছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকও এর কিছু কাজ করে।

সাম্প্রতিক সময়ের বিতর্কটা মুনাফার হার কমানো নিয়ে। ব্যাংকের আমানত থেকে এটা বেশি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকে পড়েছেন এখানেই। ফলে সরকারের পরিকল্পিত বিনিয়োগের অনেক বেশি পরিমাণে বেড়ে গেছে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি। এতে সরকারের দায় বাড়ছে। গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে অতিরিক্ত মুনাফা। এ ব্যবস্থা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন। শিল্পপতিব্যবসায়ীরাও এর মুনাফার হার কমাতে বিভিন্ন পর্যায়ের সভাবৈঠকে দাবি জানাচ্ছেন। বলছেন, বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার কম সুদে টাকা ধার করতে পারত। দায় কম হতো সরকারের।

বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রের সুদ ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি পেনশন সঞ্চয়পত্রের সুদ ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ, পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্রের সুদ ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ, তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদ ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ এবং তিন বছর মেয়াদি ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদ ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ। অর্থ বিভাগ, আইআরডি এবং জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারকে প্রতিবছর লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ এমনকি তিন গুণ সঞ্চয়পত্র বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

আগামী জানুয়ারি থেকে জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সব কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মধ্যে চলে আসবে বলে মনে করেন অর্থমন্ত্রী। বলেন, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় এলে আর সমস্যা থাকবে না। তখন সঞ্চয়পত্র কেনার সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) একটা সংযোগ থাকবে এবং কেউ সীমার অতিরিক্ত সঞ্চয়পত্র কিনছেন কি না, তাও ধরা যাবে সহজেই।

উল্লেখ করতে হয়, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের উপকারভোগীদের সিংহ ভাগ হলেন পেনশনভোগী, বৃদ্ধ, দুস্থ ও অসহায় নারী। অবশ্য ধনিক শ্রেণির কিছু লোকও অধিক মুনাফার সুযোগ নিয়ে এসব সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি উপেক্ষা করার মতোও নয়। তবে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফার টাকায় যাঁদের ওষুধ কিনতে হয়, এর মুনাফা ছাড়া যাঁদের চুলায় আগুন জ্বলে না, তাদের হৃৎস্পন্দন শুরু হয় সুদের হার কমানোর সংবাদে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, ‘দেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। পাশাপাশি আয় বৈষম্য বাড়ছে। একটা নমুনা জরিপ চালালেও প্রমাণিত হবে, সঞ্চয়পত্রের মুনাফানির্ভর লোকগুলোর বিশাল অংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশীদার নন। বরং উঁচু চাকরি থেকে অবসর নেওয়া ব্যক্তিরা ক্রমান্বয়ে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণিতে চলে যাচ্ছেন। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা বলয় খুবই দুর্বল। এদিকে নজর না দিলে আয়বৈষম্য ক্রমবর্ধমান হয়ে সামাজিক শৃঙ্খলাকে ব্যাহত করতে পারে। শক্তিশালী সামাজিক নিরাপত্তাবলয় তৈরি হলে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হারও কিছু হ্রাস করা যাবে। তা না করে এতে হাত দিলে হাজার হাজার পরিবারের দুর্ভোগ বাড়বে এবং সামাজিক নিরাপত্তা আরও দুর্বল হবে। সঞ্চয়পত্র ব্যক্তির অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা হিসেবেও কাজ করছে।’ এজন্য সুদের হার পরিবর্তনের ব্যাপারে সব সময় সাধারণ মানুষের বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

x