ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের উচ্চ হার বিপুল জনগোষ্ঠীকে আর্থিকভাবে ভঙ্গুর করছে

রবিবার , ২০ মে, ২০১৮ at ৫:২৬ পূর্বাহ্ণ
105

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বে প্রশংসিত হলেও চিকিৎসার ব্যয়ভার সমাজের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসুখেবিসুখে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার সারা বিশ্বেই তা অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০১৪ সালের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বলছে, বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশই বহন করতে হয় ব্যক্তিকে। ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার এর চেয়ে বেশি হয় মাত্র পাঁচটি দেশে। পত্রিকান্তরে অতি সম্প্রতি এ খবর প্রকাশিত হয়েছে। খবরে আরো বলা হয়, পরিবারের সেবা সংশ্লিষ্ট সব ধরনের প্রত্যক্ষ ব্যয়কে আউট অব পকেট হেলথ এক্সপেন্ডিচার হিসেবে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসা ও ওষুধ বাবদ ব্যয়, থেরাপি সংশ্লিষ্ট উপকরণ এবং অন্যান্য পণ্যও সেবা। ডব্লিউএইচও’র তথ্যমতে, এ ব্যয়ের হার বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কেবল নাইজেরিয়া, আজারবাইজান, কম্বোডিয়া, সুদান ও ইয়েমেনে। দেশগুলোর অসুখবিসুখ নিরাময়ে ব্যক্তিব্যয়ের হার যথাক্রমে ৭১ দশমিক ৬৭, ৭ দশমিক শূন্য ৮, ৭৪ দশমিক ১৯, ৭৫ দশমিক ৫২, ও ৭৬ দশমিক ৪২ শতাংশ। আর বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে ব্যক্তিব্যয়ের হার ৬৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকার চিকিৎসা নিতে ৬৬ টাকা ৬৮ পয়সাই বহন করতে হচ্ছে ব্যক্তিকে। তবে সর্বশেষ হিসাবে এ হার আরো বেড়েছে। চিকিৎসা নিতে ব্যক্তিব্যয়ের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি বদল হচ্ছে রোগের ধরনও। আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রোগের অভিমুখ এখন সংক্রামক থেকে অসংক্রামকের দিকে। ১৯৮৬ সালে মাত্র ৮ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামিক রোগে ঘটলেও এখন মারা যাচ্ছে ৬৭ শতাংশ। ২০১৭ সালে মোট মৃত্যুর ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে অসংক্রামক রোগে। আর ২০১৪ সালে মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশই ছিল অসংক্রামক রোগে। অসংক্রামক রোগ দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল হওয়াই এর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে আর্থিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে মানুষ। সরকারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের তথ্য বলছে চিকিৎসা নিতে ব্যক্তির ব্যয় অস্বাভাবিক বেশি হওয়ায় প্রতিবছর প্রায় অর্ধকোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে।

উপরোক্ত বিবরণ থেকে আমরা দেখছি দেশের স্বাস্থ্যখাতে বর্তমানে দুটো চিত্র বিরাজমান। একদিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের সাফল্য বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবর্তনশীল আর্থসামাজিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়বহুল অসংক্রামক রোগের বিস্তৃতি বাড়ায় বাংলাদেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় ক্রমে বাড়ছে। ২০১২ সালেও দেশে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যব্যয় যেখানে ছিল ৬৩ ভাগ, সেখানে মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ স্বাস্থ্য ব্যয়ের ১০০ টাকার মধ্যে ৬৭ শতাংশই এখন ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ করতে হচ্ছে। চিকিৎসার এই বর্ধিত ব্যয় ভার বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন কি অনেকেই গরিব হয়ে পড়ছে। ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টের তথ্যমতে, স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে বাংলাদেশ প্রতি বছর দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে ৪০৫০ লাখ মানুষ। এ অবস্থা চলতে থাকলে সরকারের দারিদ্র্য বিমোচনে লক্ষনীয় সাফল্যের বিষয়টিও বিবর্ণ হবে, সন্দেহ নেই। কাজেই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ে দ্রুত রাশ টানতে হবে। এক্ষেত্রে সরকার তথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা কাম্য।

লক্ষ্যনীয়, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় কমানোর একটি ভালো সমাধান সকলের জন্য নিশ্চিত করা। বিশ্বের উন্নত দেশ কল্যাণ রাষ্ট্রগুলোয় মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রায় শতভাগ এই বীমার ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় মেটাতে ওইসব দেশের মানুষকে আর্থিক সমস্যায় পড়তে হয় না। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত আমাদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে। সেখানেও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয় বেশি। তবে তারা এখন স্বাস্থ্য বীমায় অনেক এগিয়ে গেছে। বিশেষ করে দেশটি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা স্বাস্থ্য সেবা প্যাকেজ চালু করেছে। বাংলাদেশও এটি অনুকরণ করতে পারে। পরিতাপের বিষয়, বিভিন্ন মহল থেকে স্বাস্থ্য বীমার ওপর জোর দেওয়া হলেও দেশের এক শতাংশেরও কম মানুষের আওতায় এসেছে। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, কর্পোরেট হাউজ ও বিশ্ববিদ্যালয় তাদের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্য বীমা চালু রাখলেও এসব বীমা সব ধরনের স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিতে পারছে না। এছাড়া আমাদের দেশে ব্যক্তি উদ্যোগে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আসার প্রবণতা নেই বললেই চলে। ফলে বেড়ে চলা স্বাস্থ্য ব্যয় মেটানো দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের জন্য ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। এ অবস্থায় সবার জন্য স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য বীমা চালু করা প্রয়োজন।

সারাবিশ্বে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় (ইউএইচসি) জোর দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশেও এজন্য এরই মধ্যে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণা অনুযায়ী, জীবনযাত্রার মান নির্বিশেষে প্রত্যেকেরই প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার কথা। এ স্বাস্থ্য সেবা পেতে কাউকে যাতে আর্থিক দীনতায় পড়তে না হয়, তাও উল্লেখ করা হয়েছে ঘোষণায়। কিন্তু আমাদের দুঃখ, এ ঘোষণা বাস্তবায়ন হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে। ফলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের উচ্চহার কমছে না। এ অবস্থায় ঘোষণার বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় সব শ্রেণি পেশার মানুষকে স্বাস্থ্য বীমার আওতায় আনতে হবে। এটি বাস্তবায়নের জন্য দেশের শহরাঞ্চলের দরিদ্র শ্রেণি ও গ্রামীণ হতদরিদ্র শ্রেণির প্রিমিয়ামের টাকা সরকারকে ভর্তুকির মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে। এটা ছাড়া এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। মনে রাখা দরকার টেকসই উন্নয়নের স্থায়িত্বের জন্য প্রয়োজন জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা। আর এটি করতে হবে রাষ্ট্রকেই। এজন্য সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি শতভাগ বাস্তবায়ন অপরিহার্য। এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরা কঠিন হবে না। আমাদের প্রত্যাশাণ্ড বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারকেরা কার্যকর উদ্যোগ নেবেন।

x