বোরোর বাম্পার ফলনেও কৃষকের মাথায় হাত

উৎপাদন খরচ বেশি, লাভের টাকা মধ্যস্বত্বভোগীর পকেটে!

মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ১৬ মে, ২০১৯ at ৩:২১ পূর্বাহ্ণ
65

চলতি মৌসুমে বোরোর ‘বাম্পার ফলন’ হয়েছে চট্টগ্রামে। তবুও হাসি নেই প্রান্তিক কৃষকের মুখে। তারা বলছেন, এবার বোরোর উৎপাদন খরচ ছিল বেশি। বিপরীতে ধানের স্থানীয় বাজার মূল্য কম। ফলে বেশি ফলনেও লাভবান হচ্ছেন না তারা। বরং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে তাদের। এতে ভবিষ্যতে চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। এদিকে চলতি বোরো মৌসুমের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করেছে খাদ্য মন্ত্রণালয়। কৃষকদের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে সংগ্রহের জন্য ন্যায্য মূল্যও ধার্য করা হয়েছে। কিন্ত গতবারের ন্যায় এবারও সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান-চাল সংগ্রহ করা হচ্ছে না। মিল মালিকরাই সরবরাহ করছেন এসব।
ফলে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে মিল মালিকরাই লাভবান হচ্ছেন বলে দাবি কৃষকদের। তারা বলছেন, স্থানীয়ভাবে মিল মালিকরাই মর্জি মাফিক মূল্য নির্ধারণ করে ধান সংগ্রহ করেন।
চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নগরীর পাঁচলাইশ ও ডবলমুরিং থানা এবং জেলার ১৩ উপজেলায় ৬০ হাজার ৮৮৪ হেক্টর জমিতে বোরো চাষাবাদ হয়েছে। এতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে দুই লাখ ৫৬ হাজার ৪৮২ মেট্রিক টন ধান। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ৮২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এতে দুই লাখ ৩৬ হাজার ৯৫৮ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে হইব্রিড চাষাবাদ হয়েছে ১০ হাজার ৩৪২ হেক্টর জমিতে। মঙ্গলবার পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ৪৮ হাজার ৭৯৬৯ মেটিক টন। যদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪৭ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন। উপশী জাতের চাষাবাদ হয়েছে ৫০ হাজার ৫৪২ হেক্টর জমিতে। মঙ্গলবার পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৮৮ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টন ধান। অবশ্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ৫৬ হাজার ৪৮২ মেট্রিক টনের।
হাসি নেই কৃষকের মুখে : বাঁশখালী উপজেলার কৃষক করিম দৈনিক আজাদীকে বলেন, প্রতি কানি জমিতে বোরোর উৎপাদন খরচ হয়েছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। প্রতি কানি জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ আড়ি ধান। প্রতি আড়ি ধানের স্থানীয় বাজার মূল্য সর্বোচ্চ ১২০ টাকা। ওই হিসেবে উৎপাদিত ধানের বিপরীতে আয় হবে ১০ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি কানিতে আর্থিক ক্ষতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। এ কৃষক বলেন, কৃষি শ্রমিকের মজুরি এখন দৈনিক ৭০০ টাকা। রোপণের সময়ও একই ছিল। এছাড়া অন্যান্য খরচও বেশি। ফলে বেড়েছে চাষাবাদ খরচ। বিপরীতে আয় কম। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
ফটিকছড়ির বাসিন্দা, বাংলাদেশ ইনফ্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এর নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এস.এম. ফরমানুল ইসলাম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, বাবা জানালেন পানি খরচ, জমির খরচ (নিজের জমি বলে) আর নিজের শ্রম বাদ দিয়ে তিন কানি (১২০ শতক) জমিতে বোরো ধান করে খরচ হয়েছে ৫৩ হাজার টাকা। ধান অসম্ভব ভালো হয়েছে (৩০০ আড়ি বা ৭৫ মণ)। তারপরও বর্তমান বাজার মূল্যে ১২০-১৩০ টাকা আড়ি হিসেবে নেট আর্থিক ক্ষতি প্রায় ২০ হাজার টাকা। এভাবে চললে ধান চাষে মানুষের যেটুকু উৎসাহ আছে তাও অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে!
লাভ মধ্যস্বত্বভোগীর :
চলতি মৌসুমে সরকার বোরো ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করেছে। এবার প্রতিকেজি ধানের সংগ্রহ মূল্য ২৬ টাকা, প্রতিকেজি সিদ্ধ চালের সংগ্রহ মূল্য ৩৬ টাকা এবং প্রতিকেজি আতপ চালের সংগ্রহ মূল্য ৩৫ টাকা নির্ধারণ করেছে। গত ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এ সংগ্রহ অভিযান চলবে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। চট্টগ্রাম জেলা থেকে তিন হাজার ৯২৭ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া সারাদেশ থেকে এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন ধান, ১০ লাখ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল এবং এক লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন আতপ চাল সংগ্রহ করবে সরকার।
কৃষককরা বলছেন, প্রতি আড়ি ধানে ৬ কেজি আতপ চাল উৎপাদন হয়। সরকার নির্ধারিত মূল্য কেজিপ্রতি ৩৫ টাকা করে বিক্রি করলে আড়ি প্রতি আয় হবে ২১০ টাকা। সে হিসেবে কানি প্রতি উৎপাতি ধানের বিপরীতে আয় হবে ২১ হাজার টাকা। এতে খরচ বাদ দিয়ে লাভবান হওয়ার সুযোগ আছে। কিন্ত সরাসরি সরকার চাল সংগ্রহ না করায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে দাবি করেন।
কৃষি বিভাগ যা বলছে : চট্টগ্রাম জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. গিয়াস উদ্দিন দৈনিক আজাদীকে বলেন, এবার বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। হাইব্রিড হেক্টর প্রতি ৪ দশমিক ৭১ মেট্রিক টন এবং উপশী ৩ দশমিক ৭২ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। চাষিরাও আমাদের সহযোগিতা পেয়েছে। রোগ-বালাই, পোকা-মাকড়ে ফসলের যাতে ক্ষতি না করে সেই বিষয়ে আমরা সতর্ক ছিলাম। তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছি। সবমিলিয়ে ফলন ভালো হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় ৮২ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
‘বাম্পার ফলনের ফলে প্রান্তিক কৃষকরা কতটুকু সন্তুষ্ট। তাদের বক্তব্য উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলে আপনাদের কি মনে হয়েছে?’ এমন প্রশ্নে এ কৃষি কর্মকর্তা বলেন, আমরা কৃষি বিভাগ তাদের সহযোগিতা করি। মূলত, তারা যেন কমি বেশি উৎপাদন করতে পারে সে বিষয়গুলো আমরা দেখি। সেভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করি, ভার্টিকালি উৎপাদন কিন্তু বাড়ছে। এখন বাজারের মূল্য পাওয়াটা হচ্ছে আপেক্ষিক ব্যাপার। যতই উৎপাদন খরচ কম হবে ততই কৃষকদের লাভ।

x