বৈষ্ণবজন তো…

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ১৬ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
127

পৃথিবীতে তুমি যে পরিবর্তন দেখতে চাও তা নিজ থেকেই শুরু কর। -মহাত্মা গান্ধী।
সহিংস পৃথিবীতে অহিংস নেতার সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী পালিত হলো এবার একটু অন্যরকমভাবে। পৃথিবীর চল্লিশটি দেশের সেরা শিল্পীরা গাইলেন গান্ধীজীর প্রিয় ভজন “বৈষ্ণব জন তো, তেনে কহিয়ে” সাড়ে পাঁচ মিনিট দীর্ঘ এই ভজন গত ২রা অক্টোবর প্রথম বারের মত প্রকাশ করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব অন্তোনিও গুতেরেস, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও ভারতীয় অনেক বিশিষ্ট অতিথি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভারতীয় দূতাবাস সে দেশের সেরা শিল্পীদের দিয়ে এই ভজন গাইয়েছে। গান্ধীজীর প্রিয় এই ভজনটি গুজরাটি জনপ্রিয় ভজন। এটা লিখেছেন নরসীমা মেহতা। গান্ধীজীর প্রতিটি বৈঠক ও অনুষ্ঠান শুরু হতো এই ভজন দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাঙ্গোলা, শ্রীলংকা, সার্বিয়া, ইরাক থেকে আইসল্যান্ড ৪০টি দেশের প্রথিতযশা শিল্পীদের দিয়ে এই ভজনটি রেকর্ড করা হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে এই ভজনটি গেয়েছেন বিশিষ্ট রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। ২০০৭ সালের ১৫ই জুন, জাতিসংঘের সাধারণ সভায় ২রা অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক অহিংস দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। মহাত্মা গান্ধীই বিশ্বের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিলেন। তিনিই বুঝিয়েছিলেন অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলনও পারে এর মূল উৎপাটন করতে। এই অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে জনগণকে সম্পৃক্ত করেছিলেন। তাঁর এই অহিংস আন্দোলনের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল অহিংস মতবাদ বা দর্শন। আর এই দর্শনই ছিল ব্রিটিশ বিরোধী সারা বিশ্বের মানুষের স্বাধীনতা ও অধিকার পাওয়ার আন্দোলনের চালিকা শক্তি। এবার গান্ধীজীর সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে তাঁর প্রিয় ভজন “বৈষ্ণব জন তো” বিশ্বব্যাপী প্রচারে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য আমরা এই উপমহাদেশে গান্ধীজীর অহিংস রাজনীতির চর্চা করিনা। তবে এবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দিনটি উপলক্ষে বছরব্যাপী বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
গান্ধীজী বিশ্বাস করতেন “চোখের বদলে চোখই যদি নীতি হয় তাহলে পৃথিবীতো একদিন অন্ধ হয়ে যাবে।” এই সার্ধশত বছরে পৃথিবী কত বদলে গেছে। হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীর কোথাও কোনো শান্তি নেই। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণ ঝরছে। অবিরাম। রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ২১তম। প্রথম অবস্থানে রয়েছে সিরিয়া, আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, ইরাক, দক্ষিণ সুদান, পাকিস্তান, ভারত। বাংলাদেশের মানুষ বরাবরই শান্তিপ্রিয়। সমাজে অশান্তি সহিংসতা কারো কাম্য নয়। শান্তির পক্ষে আজীবন লড়াই করা মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিনে আমরা প্রত্যাশা করব পৃথিবীব্যাপী কিছু সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠী, স্বার্থান্বেষী মানুষ সামাজিক শান্তি সম্প্রীতি নষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত তারা যেন শান্তির পথে ফিরে আসে। পৃথিবী জুড়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ এই দিনটিকে জনগণের সম্পৃক্ততায় সহিংসতা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতার দিন হিসেবে চিহ্নিত করুক।
বাংলাদেশ বহু ভাষা, বহু ধর্ম, বহু সম্প্রদায়ের স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশ। দীর্ঘ সময় ধরে আমরা শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছি কিন্তু প্রত্যেক জাতীয় নির্বাচনে বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ঘটে থাকে। বিশেষ করে সংখ্যালঘুরা বিভিন্ন রকম হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়ে থাকে।
যেটা হওয়া কখনোই উচিত নয়। গান্ধীজী তাঁর জীবনকে সত্য অনুসন্ধানের বৃহৎ উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি নিজের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং নিজের ওপর নিরীক্ষা চালিয়ে তা অর্জন করেন। তিনি তাঁর আত্মজীবনীর নাম দিয়েছিলেন “দি স্টোরি অফ মাই এক্সপেরিমেন্টস উইথ ট্রুথ। অর্থ সত্যকে নিয়ে আমার নিরীক্ষার গল্প। মহাত্মা বলেন তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ ছিল তাঁর নিজের অন্ধকার ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে কাটিয়ে উঠা। তাঁর দর্শন হলো সত্যই হলো ঈশ্বর। গান্ধীজী তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছিলেন যখন আমি হতাশ হই, আমি স্মরণ করি সমগ্র ইতিহাসেই সত্য ও ভালবাসার জয় হয়েছে। দুঃশাসক ও হত্যাকারীদের কখনো অপরাজেয় মনে হলেও সব সময় তাদের পতন ঘটে।
একজন সাধারণ হিন্দু হিসেবে তিনি সকল ধর্মকে সমানভাবে বিবেচনা করতেন। তিনি সব ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি বলেন, নৈতিকতা হারিয়ে ধার্মিক হওয়া বলতে কিছু নেই, উদাহরণ স্বরূপ, মানুষ মিথ্যাবাদী নির্মম এবং আত্মসংযমহীন হয়ে দাবি করতে পারে না যে ঈশ্বর তার সাথে আছে। বিশ্বের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় মহাত্মা গান্ধীর আদর্শ জীবন ও শিক্ষা অনুকরণীয়। গান্ধীজীর আদর্শের সঠিক চর্চা হলে এই বিক্ষুব্ধ পৃথিবীতে শান্তি নেমে আসবে।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়, সে সময় তিনি নতুন দিল্লীর বিরলাভবনে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। একজন হিন্দু মৌলবাদী যার সাথে চরমপন্থী হিন্দু-মহাসভার যোগাযোগ ছিল। নাটুরাম বিনায়ক গডসে ছিলেন গান্ধীজীর হত্যাকারী।
বিক্ষুব্ধ বিশ্বে বিভ্রান্ত মানুষের কাছে এই আধ্যাত্মিক নেতার অহিংস মতবাদ এক আশার বাণী এবং প্রার্থিত সমাজের মূল্যবোধসমূহের প্রতীক।

x