বৈশাখের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

আব্দুস সালাম

বুধবার , ১০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
91

তোমরা অনেকেই জানো যে বাংলাদেশে দুই ধরণের বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা হয়। ইংরাজী বর্ষপঞ্জি ও বাংলা বর্ষপঞ্জি। এছাড়াও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে ইংরেজী বর্ষপঞ্জির পাশাপাশি বাংলা বর্ষপঞ্জি ব্যবহার করা হয়। বাঙালি সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে বাংলা বর্ষপঞ্জিনির্ভর। হিন্দু সমপ্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো পালনের ক্ষেত্রে দিন নির্বাচনে বাংলা মাসকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়। ইংরেজীর মতো বাংলা বর্ষপঞ্জি সৌরভিত্তিক বর্ষপঞ্জি। বৈশাখ বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বঙ্গাব্দের প্রথম মাস। প্রতিবছর ১৪ই এপ্রিল অর্থাৎ বৈশাখ মাসের ০১ তারিখেই ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উৎসবের মাধ্যমে পুরাতন বছর বিদায় দিয়ে বাংলা নববর্ষকে বরণ করা হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর সকল বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এটি বাঙালি জাতির সর্ববৃহৎ উৎসব। বাংলাদেশের প্রতিটি গ্রাম ও শহরে নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে পূর্ব হতেই ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। সূর্যোদয়ের সাথে সাথেই বাংলা বর্ষপঞ্জিতে যোগ হয় একটি নতুন বছর। অতীতের দুঃখ, ব্যথা, কষ্ট, গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে সকলে স্বাগত জানাই। এ প্রসঙ্গে তোমাদের একটা কথা মনে করিয়ে দিই। ১৪০২ সালের ১ বৈশাখ থেকে বাংলা একাডেমি আন্তর্জাতিক রীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে রাত ১২ টা হতে দিন গণনা শুরু করার নিয়ম চালু করেছে। যা এখনও বহাল রয়েছে।
তোমরা একটু খেয়াল করলে দেখবে আমাদের দেশে সারাবছর জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো ইংরাজি বর্ষের দিন-তারিখ মোতাবেক পালন করা হয়। যেমন-শহীদ দিবস, শিশু দিবস, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস ইত্যাদি। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো ইংরাজি বর্ষের দিন-তারিখ মোতাবেক পালন করা হলেও বৈশাখ মাস বাঙালি সংস্কৃতির সকল চেতনা জাগ্রত করে। হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতি আমরা সকলে উপস্থাপন করি। বাঙালি সংস্কৃতিতে বৈশাখ মাসের গুরুত্ব যে অত্যধিক তা নববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমেই বোঝা যায়। ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও উৎসবের মাধ্যমে পুরাতন বছর বিদায় দিয়ে অতীতের ভুলগুলো শুধরে একটি সুখী-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয়ে বাঙালিরা নতুন আমেজ ও উদ্দীপনায় নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর সকল বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ। এটি বাঙালি জাতির সর্ববৃহৎ উৎসব।
তোমরা অনেকে দেখেছ বৈশাখকে কেন্দ্র করে গ্রাম ও শহরে নানানধরণের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অনুষ্ঠান হলো- হালখাতা, বৈশাখী মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পুতুল নাচ, নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা ও কুস্তি খেলা ইত্যাদি। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার মারমা, ত্রিপুরা ও চাকমারা সম্মিলিতভাবে বৈসাবি উৎসবের মাধ্যমে নববর্ষকে বরণ করে নেয়। ১২ই বৈশাখ চট্টগ্রামের লালদীঘির ময়দানে কুস্তি খেলার বড় আয়োজন করা হয় যা জব্বারের বলি খেলা নামে সুপরিচিত। হাজার বছরের লালিত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করে সর্বশ্রেণির জনসাধারণ উৎসবে হয় মাতোয়ারা। ওইদিন শহরের লোকজনদের চালচলন ও পোশাক-পরিচ্ছদে খাঁটি বাঙালিপনার চিহ্ন ফুটে ওঠে। গ্রাম-শহরের মানুষ ভোরবেলায় উঠে বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখে। তারা নতুন জামাকাপড় পরে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। এদিন মেয়েরা বাসন্তী শাড়ি, চুড়ি, আলতা ও ফিতা এবং পুরুষরা নানা রঙের ফতুয়া, পাঞ্জাবি-পায়জামা পরতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। এদিন প্রায় ঘরেই ভালো ভালো খাবার রান্না করা হয়। তোমরা যারা ঢাকায় থাকো তারা জানো যে ঢাকার রমনার বটমূলে সূর্য উদয়ের সাথে সাথে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। সারাদিন ব্যাপী চলতে থাকে নানান ধরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। দেশবরেণ্য শিল্পীর পরিবেশন করে আবহমান গ্রামবাংলার সুপরিচিত গান ও নৃত্য। পরিবারের সকল সদস্যরা সেসব অনুষ্ঠান মনোরম পরিবেশে উপভোগ করে। পহেলা বৈশাখে সকালবেলায় পরিবারের সদস্য এবং প্রিয়জনদের নিয়ে মাটির সানকিতে পান্তা-ইলিশ মজা করে খাওয়ার নতুন রীতিটি এখন বেশ উপভোগ্য। ছোট ছোট বাচ্চাদের তুলতুলে গাল ও হাতে শিল্পীরা রং-তুলিতে গ্রাম-বাংলার চিরচেনা ডালা-কুলা, পাখা, ঢোল-তবলা, একতারা-দোতারার বিভিন্ন চিত্র অঙ্কন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে খুব সকালে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিভিন্ন বয়সের মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা ইনস্টিটিউটে ফিরে আসে। এ শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলার চিত্রকে ফুটিয়ে তোলা হয়। শোভাযাত্রার জন্য বানানো হয় রঙ-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি।
হালখাতার কথা তো তোমাদের বলাই হয়নি। এটি পহেলা বৈশাখের একটি ঐতিহ্যবাহী অন্যতম আয়োজন। গ্রাম-শহরে আজও এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শুধু পহেলা বৈশাখেই নয় সারা মাসব্যপী বিভিন্ন শ্রেণির ব্যবসায়ীরা হালখাতার মাধ্যমে পুরনো সব হিসাব চুকিয়ে নতুন হিসাবের সূচনা করেন। ক্রেতারা তাদের পাওয়া পরিশোধ করতে এলে তাদেরকে ব্যবসায়ীরা মিষ্টিমুখ করান। অনেক ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্যে বছরের শুরুর দিন তাদের দোকান কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দোয়া অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেন।
এতক্ষণ তোমাদের বাংলা নববর্ষ ঘিরে বৈশাখ মাসে কী কী করা হয় অর্থাৎ সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কথা বললাম। এখন তোমাদের বলবো বৈশাখের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কথা। কালবৈশাখী ঝড় বৈশাখ মাসের একটি উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। এ সময় দিনের তাপমাত্রা প্রচন্ডভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে সন্ধ্যার আগে আগে কালবৈশাখী তার রুদ্ররূপ নিয়ে হাজির হয়। তার প্রচন্ডতা মুহূর্তের মধ্যে সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি ঘরবাড়ি, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। বৈশাখ মাসে মাঠঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়। আমাদের দেশের উত্তোরাঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। অনেক নলকূপে পানি পাওয়া যায় না। দিনের মধ্যভাগে সূর্যের আলোতে মনে হয় আগুনের ফুলকি নৃত্য করছে। তীব্র দাপদাহে সকল প্রাণী হাঁস-ফাঁস করতে থাকে।

x