বেলজিয়ামকে থামিয়ে ফাইনালে ফ্রান্স

নজরুল ইসলাম

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৭:০১ পূর্বাহ্ণ
207

নাহ! আর পারল না। থেমে গেল অদম্য রেড ডেভিলরা। দেখা গেলনা লুকাকু নামক দানবের চিতার গতি। কিংবা ডি ব্রুইনের বুলেট শট বা নিখুঁত পাস। এডিন হ্যাজার্ড যা একটু চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। কিন্তু তার সে চেষ্টা কাজে আসেনি। ফলে থামতে হলো বেলজিয়ামকে। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলা হলোনা রেড ডেভিলদের। অপরদিকে ১৯৯৮ সালের পর আবার বিশ্বকাপ জয়ের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গেল ফ্রান্স। বিশ বছর এবং পাঁচবারের প্রচেষ্টায় আবার বিশ্বকাপের ফাইনালে জিদানঅরিদের ফ্রান্স। দুই দশকের অপেক্ষার অবসান হলো পগবাএমবাপেগ্রিজম্যানদের হাত ধরে। আরো একবার বিশ্বকাপ জয়ের দ্বার প্রান্তে ফ্রান্স। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের পর এবার কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের কিনারায় দিদিয়ের দেশম। গতকাল রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এবারের বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে পগবাএমবাপেগ্রিজম্যানদের ফ্রান্স ১০ গোলে হ্যাজার্ডলুকাকুকোম্পানিদের বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে। বিশ্বকাপের শুরু থেকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে আসা বেলজিয়ামকে থামতে হলো সেমিফাইনালে এসে। আরো একবার হতাশ হতে হলো বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মকে। থেমে গেল গ্যালারির লাল ঢেউ। এবার বর্ণিল হলো নীল রঙে। এই সেমিফাইনাল ম্যাচটিতে খেলার কথা ছিল বিশ্ব ফুটবলের দুই চির প্রতিদ্বন্দ্বি আর্জেটিনা এবং ব্রাজিলের। কিন্তু তারা বিদায় নিয়েছে আগেই। তারপরও আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে ফ্রান্স আর ব্রাজিলকে হারিয়ে বেলজিয়াম সেমিফাইনাল পর্যন্ত আসায় এই ম্যাচটির গুরুত্ব অনেকখানি বেড়ে গিয়েছিল। অনেকের মতে এই ম্যাচটি ছিল ফাইনালের আগে ফাইনাল। আর সে ফাইনালটা জিতে নিল ফ্রান্স। বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তার দল সেমিফাইনালে গেলে তিনি রাশিয়া যাবেন খেলা দেখতে। তিনি তার কথা রেখেছেন। আর ফ্রান্সের ফুটবলাররাও যেন তাদের প্রেসিডেন্টের সম্মান রক্ষা করলেন। গ্যালারিতে বসে দলের ফাইনালে যাওয়া দেখলেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট। এ যেন একের ভেতর একাধিক পাওয়া পগবাএমবাপেদের জন্য। গেল বছর নিজেদের মাটিতে ইউরো কাপের ফাইনালে হেরে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল দেশম শীষ্যদের সে ক্ষতে যেন বেশ ভালই প্রলেপ দিচ্ছে এই বিশ্বকাপে। খুব বেশি ফেভারিটের তকমা না থাকলেও ফ্রান্স যেন বুঝিয়ে দিল কতটা বারুদে ঠাসা দল তারা। তারুণ্যের জয় গান গাইতে রাশিয়া আসা ফ্রান্স যেন এখন বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করল। আর একটি ম্যাচ জিতলেই যে, জিদানের পর বিশ্বকাপ জেতা হয়ে যাবে গ্রিজম্যানএমবাপেদের। আর সে লক্ষ্যেই দারুণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ফ্রান্স। এবারের বিশ্বকাপে অনেকেরই বাজি ছিল বেলজিয়ামের পক্ষে। অবশ্য মাঠেও তারা তাদের সে বাজির পক্ষে প্রমাণ দিয়ে এসেছে প্রতিটি ম্যাচে। কিন্তু আসল জায়গায় এসে আটকে গেল লুকাকুহ্যাজার্ডরা। শেষ পর্যন্ত ১৯৮৬ সালের পর আরো একবার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে খালি হাতে ফিরতে হলো বেলজিয়ামকে। তাও আবার বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্মকে। এবারে আর হলোনা। এখন অপেক্ষা আরো চার বছর। ২০২২ সালে কাতারে দেখা যাবে আবার রেড ডেভিলদের। আর ফরাসিরা এখন অপেক্ষা করছে ফাইনালে কাকে পাবে সে আশায়। যেখানে ইংল্যান্ড কিংবা ক্রোয়েশিয়া যে কেউই হতে পারে তাদের সামনে বাধা।

ম্যাচের শুরু থেকেই দারুন প্রতিদ্বন্দ্বীতার আভাস। শুরু থেকেই আক্রমণ আর পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা দু দলের মধ্যে। আর সে সুবাধে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম সুযোগটা এসেছিল ফরাসিদের সামনে। ১১ মিনিটের ঘটনা। পল পগবার বাড়ানো বল ধরে এগিেয় গিয়েছিলেন এমবাপে। কিন্তু কীপারকে একা পেয়েও বলটা মেরে দিলেন তার গায়ে। এমন একটি আক্রমণ সামাল দিয়ে চার পরই এবার বেলজিয়ামের আক্রমণ। বামপ্রান্ত দিয়ে আক্রমণে উঠে ডি ব্রুইন নিখুঁত মাইনাস করেছিলেন। হ্যাজার্ড শটও নিয়েছিলেন। কিন্তু বিধি বাম। বল চলে গেল সাইডবার ঘেষে। ২১ মিনিটে কর্নার কিক থেকে উড়ে আসা বলে উপরে উঠে আসা অলডারভেইরেল্ড যে শট নিয়েছিলেন সেটাও চলে গেল কীপারের হাতে। পরপর দুটি আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া ফ্রান্স এবার আবার আক্রমণে। ২৩ মিনিটে সতীর্থের বাড়ানো বলে জিরুদ পা লাগাতে পারলে এগিয়ে যেতে পারতো ফ্রান্স তখনই। ৩০ মিনিটে আবার জিরুদের শট চলে গেল সাইডবার ঘেষে। এবার বেঞ্জামিন পাভার বল বাড়িয়েছিলেন। ৩৯ মিনিটে এবার বেঞ্জামিন পাভার নিজেই মিস করণে আরেকটি সুযোগ। এবার তার শটও চলে যায় সাইডবার ঘেষে। ফলে গোলশূণ্যভাবে বিরতিতে যেতে হয় দুদলকে।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে আক্রমণের ধার বাড়ায় ফ্রান্স। আর সে সুবাধে গোলও পেয়ে যায় তারা ম্যাচের ৫৩ মিনিটে। এবার ডানপ্রান্ত থেকে আঁতোয়ান গ্রিজম্যানের কর্নার। উড়ে আসা বলে স্যামুয়েল উমতিতির নিখুত হেড। বল আশ্রয় নেয় জালে। এগিয়ে যায় ফ্রান্স। তিন মিনিট পর ব্যবধান দ্বিগুন হয়ে যাচ্ছিল প্রায়। বেলজিয়াম ডিবঙের ভেতর এমবাপে বল বাড়িয়েছিলেন । অলিভার জিরুদ শটও নিয়েছিলেন। কিন্তু তার সে শট প্রতিহত হয় বেলজিয়ামের এক ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে। সমতা ফেরানোর সুযোগটা হাতছাড়া করে বেলজিয়াম খেলার ৬৪ মিনিটে। ডি ব্রুইনের ক্রস থেকে দারুন এক হেড নিয়েছিলেন ফেলাইনি। কিন্তু বল চলে যায় সাইডবার ঘেষে। এরপর মুহুর্মুহু আক্রমণে ফ্রান্সের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত করে রাখে বেলজিয়ামের স্ট্রাইকাররা। কিন্তু গোলের দেখা মিলছিলনা। ৮১ মিনিটে আরো একবার বেলজিয়ামকে গোল বিঞ্চত করে ফরাসি গোল রক্ষক। এবার ডি বঙের বাইরে থেকে দ্রিস মের্তেন্স এর বিদ্যুত গতির শট ফিরিয়ে দেন ফরাসি গোল রক্ষক। আরো একবার হতাশ হতে হয় রেড ডেভিলদের। সময় যতই শেষের দিকে যাচ্ছিল ততই ফ্রান্সের উপর চাপ বাড়াচ্ছিল বেলজিয়াম। ৮৬ মিনিটে সমতা ফেরানোর আরো একটি সুযোগ এসেছিল হ্যাজার্ডদের সামনে। কিন্তু ডি ব্রুইনের মাইনাসে পা লাগাতে পারলেননা লুকাকু। ইনজুরি সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে গ্রিজম্যান ব্যবধান দ্বিগুণ করে ফেলছিল। কিন্তু এমবাপের বাড়ানো বলে তার শট রুখে দেন বেলজিয়াম গোল রক্ষক। একেবারে শেষ মিনিটে আরো একটি সুযোগ এসেছিল ফ্রান্সের সামনে। কিন্তু বদলী তোলিসোর শট চলে যায় বেলজিয়াম কীপারের হাতে। আর সে শটের পরপরই রেফারি লম্বা বাঁশি বাজিয়ে জানিয়ে দেন ফ্রান্স বিশ্বকাপের ফাইনালে। উল্লাসে মেতে উঠে পুরো ফরাসি শিবির। আর হারের লজ্জা আর হতাশায় যেন নুইয়ে পড়ে বেলজিয়ামের সোনালী প্রজন্ম। এবারে আর হলোনা। ফিরতে হচ্ছে খালি হাতে। আর দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনারে জায়গা করে নিয়ে যেন উৎসবে মাতোয়ারা ফ্রান্স।

x