বেরিয়ে আসছে বুয়েটে নির্যাতনের একের পর এক ঘটনা

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:১৪ পূর্বাহ্ণ
184

আবরার ফাহাদ নিহত হওয়ার পর ফিরে আসছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের অতীতের বিভিন্ন নির্যাতনের কথা। শিক্ষার্থীরা বলছেন, র‌্যাগিংয়ের নামে বুয়েটে নির্যাতন আর অপমানের ঘটনা ঘটে হরহামেশাই। ভিন্ন মতের অনেককে শিবির নাম দিয়ে নির্যাতনের ঘটনাও আছে অনেক। ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ খোলা একটি ওয়েবপেইজে গত ৯ অক্টোবর পর্যন্ত র‌্যাগিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের এমন ঘটনা ঘটে এলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ‘জেনেও’ উদ্যোগী হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। খবর বিডিনিউজের।
ক্ষমতাসীন দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীদের নির্যাতন বন্ধে অহায়ত্বই ফুটে উঠেছে বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানের কথায়। বুয়েটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখে তার দপ্তর। আবরার হত্যার বিচার দাবিতে উত্তাল বুয়েটে গতকাল বুধবার নির্যাতন নিয়ে শিক্ষার্থীদের বহু প্রশ্নের মুখে অধ্যাপক মিজান বলেন, আমরা চেষ্টা করি, কিন্তু পেরে উঠি না। অনেক সময় তথ্যও আমার কাছে আসে না। ব্যর্থতার দায় নিয়ে দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন না কেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আমরা যদি এভাবে চলে যাই, তাহলে এই অবস্থায় কোনো শিক্ষক দায়িত্ব নেবেন না। তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে ছয়জন শিক্ষার্থী তাদের নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, তবে তাদের কেউ নাম প্রকাশে রাজি হননি।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এবং শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় তার আগের দুই রাতে অর্থাৎ বুধবার এবং বৃহস্পতিবার র‌্যাগিংয়ের দিন ঠিক থাকে। নির্ধারিত কিছু কক্ষ ছাড়াও হলের ছাদগুলোতে চলে নির্যাতন। নির্যাতনের জন্য ক্রিকেট খেলার স্ট্যাম্প ব্যবহার হয় বেশি। বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের ২০১৬ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, প্রথম বর্ষে পড়ার সময় একদিন আমাকে ছাত্রলীগের কয়েকজন ছাদে নিয়ে ডেকে পাঠায়। হাফপ্যান্ট পরে হলে ঘুরলাম কেন, এটা নাকি আমার অপরাধ। সেদিন আমাকে মারধর ও চড়থাপ্পড় দিয়ে ছেড়ে দেয়। এর পরের দিন আবার ডাকা হয়। সেদিন আমার অপরাধ ‘চুল বড় কেন’, অথচ আমার চুল ছোটই ছিল। আমাকে ওইদিন স্ট্যাম্প দিয়ে পিটিয়েছিল তারা।
শেরে বাংলা হলের ২০১৮ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাকেও ডেকে নেওয়া হয়েছিল, আবরারকে যে রুমে পিটিয়ে হত্যা করা হয়, সেই ২০১১ নম্বর কক্ষে। সেদিন ১০-১২ জনকে একসঙ্গে নিয়ে চড়-থাপ্পড় দিয়েছিল ছাত্রলীগের নেতারা। আবরার হত্যাকাণ্ডের আসামি অনিক সরকার সেদিনের নির্যাতনে নেতৃত্ব দিয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, আমাকে যখন চড়-থাপ্পড় দেওয়া হয়, এমনভাবে কথা বলছিল, যেন আমাকে আদর করছে। এক নাগাড়ে ২০-২৫টি থাপ্পড় দিয়েছিল। র‌্যাগিংয়ের নামে এমন নির্যাতন স্বাভাবিক ঘটনা হিসাবে দাঁড়িয়েছে মন্তব্য করে এই শিক্ষার্থী বলেন, আবরারকে যখন ডাকা হয়, তখনও সবাই ভেবেছিল, র‌্যাগ দেওয়ার জন্য নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ঘটনা এই পর্যায়ে পৌঁছবে কেউ ভাবেনি।
তবে আবরারের ঘটনাকে ভিন্ন রকম হিসাবে বর্ণনা করে ২০১৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, সাধারণত সিনিয়র ব্যাচের নেতারা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের র‌্যাগ দেয়। কিন্তু নানা রকম স্ট্যাটাসের জন্য আবরারকে শিবির ব্লেইম দিয়ে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। যখন কাউকে শিবির ব্লেইম দিয়ে নেওয়া হয়, তখন সে সিনিয়র হলেও জুনিয়র-সিনিয়র সবাই মারে। র‌্যাগের নামে এক শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে কান ফাটিয়ে দেওয়া হয় গত বছরের সেপ্টেম্বরে হল থেকে বহিষ্কার হন আহসান উল্লাহ হলের ছাত্রলীগ নেতা সৌমিত্র লাহিড়ী। কিন্তু দলীয় প্রভাবে তিনি হলেই ছিলেন বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
ওই হলের কেমিকৌশল বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, সৌমিত্র হলে বহাল তবিয়তেই ছিল। উল্টো তার উপকার হয়েছে, বহিষ্কারের সুযোগে হলের বিভিন্ন ফি দিতে হয়নি তাকে। র‌্যাগিংয়ের কারণে শাস্তির নজির একমাত্র সৌমিত্রই বলে জানান শিক্ষার্থীরা। এর বাইরে অনেক ঘটনা ঘটে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি বলে তাদের অভিযোগ। এত অভিযোগ এলেও বুয়েটের বিভিন্ন হলে ঘুরে র‌্যাগিংবিরোধী ব্যানার দেখা গেছে। দেড়-দুই মাস আগে এই ব্যানারগুলো লাগানো হয় বলে জানান দুই হলের কর্মচারীরা।
র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ সবসময় উদ্যোগী ভূমিকা নেয় বলে দাবি করেছেন বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউস সানি। তিনি বলেন, র‌্যাগ ছাত্রলীগের নামে কেউ দেয় না। এরপর র‌্যাগিংয়ের নামে নির্যাতনে জড়িত কয়েক ছাত্রলীগ নেতার নাম জানালে সানি বলেন, আমরা যখনই কোনো ঘটনা জেনেছি, সে বিষয়ে প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে বলেছি। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, অপরাধীর পরিচয় অপরাধী, তার পরিচয় ছাত্রলীগ না। যারাই এমন র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাই আমরা। আবরার হত্যাকাণ্ডে বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল, সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিনসহ ১৩ জন ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
ওয়েবসাইটেও ১৬৬ নির্যাতনের বর্ণনা : বুয়েটের হলগুলোতে নিয়মিতই এমন নির্যাতনের ঘটনা ঘটার বিষয় উঠে এসেছে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৈরি করা একটি ওয়েবপেইজে। ২০১৭ সালের ৩১ মার্চ ‘ইউ রিপোর্টার’ নামের অনলাইনে রিসার্চ প্রজেক্ট শুরু করা হয়, যাতে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত র‌্যাগিংসহ বিভিন্ন বিষয়ে ১৬৬টি অভিযোগ জমা পড়েছে। এই ‘ইউ রিপোর্টার’এ প্রথম অভিযোগটিই ছিল মধ্যরাতে বড় ভাইরা ডেকে নিয়ে ঘণ্টাখানেক দাঁড় করিয়ে রেখে ‘আপত্তিকর কথা’ বলা নিয়ে। এই প্রজেক্টের বিষয়ে সিএসই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবিএম আলিম আল ইসলাম জানান, এই প্রজেক্ট বৃহৎ উদ্দেশ্যে করা। এটা তৃতীয় বিশ্বের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যক্তিদের অনেক না বলা কথা এখানে বলা এই প্রজেক্টের লক্ষ্য। তিনি জানান, এটা বুয়েটের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখন সীমাবদ্ধ আছে। তৃতীয় বিশ্বের যে কেউ যেন এই সাইটে ঢুকতে পারে সে ব্যাপারে কাজ চলছে।
আলিম বলেন, এই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক মো. মোস্তফা আকবর কয়েক মাস আগে সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিবেদন একত্রিত করে বুয়েটের ছাত্র কল্যাণ দপ্তরে পাঠান। তবে এর ভিত্তিতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, তা তিনি জানেন না।

x