বেপরোয়া চালক ও যানবাহনের দুরবস্থা সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে

শুক্রবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৮ at ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ
93

বেপরোয়া চালক ও যানবাহনের দুরবস্থা যে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে, তা উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা অনুসারে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর জন্য। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। পরিবেশপরিস্থিতিসহ অন্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ। আর ব্র্যাকের গবেষণা বলছে, ৩৮ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার উৎস হচ্ছে বাসমিনিবাস। ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ দুর্ঘটনার মূলে ট্রাক। ১২ শতাংশ মোটরসাইকেল। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ সমূহ : বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, বিপজ্জনক অভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেস বিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, মহাসড়ক ও রেলক্রসিংয়ে ফিডার রোডের যানবাহন উঠে পড়া, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকায় রাস্তার মাঝ পথে পথচারীদের যাতায়াত।

চালক বেপরোয়া, নির্বিকার’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে গতকাল দৈনিক আজাদীর প্রথম পাতায়। এতেও সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে কিছু তথ্য প্রদান করা হয়েছে। বলা হয়েছে, অন্য গাড়ির আগে গিয়ে যাত্রী বেশি পাওয়ার আশায় বাস চালকেরা বেপরোয়া ও বিশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালান। চালকেরা মনে করেন, একটু আগে যেতে পারলেই বোধহয় যাত্রী বেশি পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীপথচারীদেরই। নগরীর ইপিজেড থেকে মুরাদপুরগামী মহিবুল শাহীন নামে ১০ নম্বর বাসের এক যাত্রী বলেন, এ রোডে চালকদের যাত্রীর অভাব নেই। তারপরও এক গাড়ি অপর গাড়ির সাথে রাস্তায় প্রতিযোগিতা করে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে অন্য গাড়ির আগে যেতে চায়, আরও বেশি যাত্রী পাওয়ার আশায়। এতে দুর্ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে যাত্রীদের।

আসলে এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপকতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো চালকদের এই প্রবণতা। এই প্রাণঘাতী প্রবণতা দূর করতে না পারলে সংকট আরো বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বেপরোয়া চালকদের রাশ টানতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য, মোটরযান আইন অনুসারে, একজন পেশাদার চালক টানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না। এর বেশি চালাতে হলে অবশ্যই আধা ঘণ্টার বিরতি দিতে হবে। তবে কোনোভাবেই দিনে আট ঘণ্টার বেশি যানবাহন চালাতে পারবেন না। কিন্তু চালকদের অনেকে টানা ১২১৬ ঘণ্টাও যানবাহন চালাচ্ছেন। চালকদের পক্ষে বলা হচ্ছে, চালকদের ঘাতক তকমা দিয়ে সবাই দায়িত্ব সারছে। কিন্তু চালক যে বিশ্রাম পাচ্ছেন না, প্রশিক্ষণ দরকার এবং তাঁদের জীবনমান রক্ষা করতে হবেএটা কারও নজরে নেই। ফলে চালকেরা এখন জাতীয় শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। এমন মনোভাব থাকলে সমস্যার সমাধান হবে না।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করার জন্য বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করা হয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পক্ষ থেকে। এর মধ্যে রয়েছে : ট্রাফিক আইন, মোটরযান আইন ও সড়ক ব্যবহার বিধিবিধান সম্পর্কে স্কুলকলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের জন্য, মসজিদ, মন্দির, গির্জায় জনসাধারণের জন্য ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা; টিভি চ্যানেল ও সংবাদপত্র সমূহে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করা; জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশ থেকে হাটবাজার অপসারণ করা, ফুটপাত বেদখল মুক্ত করা; রোড সাইন (ট্রাফিক চিহ্ন) স্থাপন করা; জেব্রাক্রসিং অংকন করা; চালকদের প্রফেশনাল ট্রেনিং ও নৈতিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা; যাত্রী বান্ধব সড়ক পরিবহন আইন ও বিধিবিধান প্রণয়ন; গাড়ির ফিটনেস ও চালকদের লাইসেন্স প্রদানের পদ্ধতি উন্নত বিশ্বের সাথে তালমিলিয়ে আধুনিকায়ন করা; জাতীয় মহাসড়কে স্বল্পগতি ও দ্রুতগতির যানের জন্য আলাদা লেন এর ব্যবস্থা করা; প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইনে সড়ক নিরাপত্তা তহবিল গঠন করে সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা; সড়ক দুর্ঘটনায় পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হারিয়ে যারা ছিন্নমূল ও দারিদ্র্যের কাতারে নেমে যাচ্ছে তাদের ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব নেওয়া।

এ সুপারিশমালা অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও বাস্তবায়নযোগ্য। সড়ক দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হবে।

x