বেগম রোকেয়া পাঠাগার : বই পাঠক সবই আছে নেই শুধু ঘর

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ২৫ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৩৪ পূর্বাহ্ণ
155

বই হচ্ছে অন্ধকার থেকে আলোর পথে অগ্রসর করে দেয়ার প্রধান মাধ্যম। বই পাঠের মাধ্যমে অজ্ঞ মানুষ জ্ঞানী হয়। যেই সমাজে জ্ঞানী মানুষ সৃষ্টি হয় সেই সমাজ থেকে অন্ধকার কেটে গিয়ে আলোকিত হয়। আদিকাল থেকে মানুষ অজানাকে জানার জন্য,অদৃশ্যকে দেখার জন্য জ্ঞান অর্জন করছে। যার যার মত করে চেষ্টা করে আসছে অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে দেশ ও সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে দিতে।
যুগে যুগে গুণী জ্ঞানীরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা বদলে দিতে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে আসছে বইকে। সকল শ্রেণি পেশার মানুষের মাঝে পাঠ্যাভ্যাস সৃষ্টির প্রেরণা যোগাচ্ছে বিভিন্ন স্বাদের লেখনীর বই এর মাধ্যমে। চলমান এই ধারায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম বই পড়ে নিজেদের জ্ঞান ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে। দূর হচ্ছে অজ্ঞতা, অজানাকে জানছে,অদৃশ্যকে দেখার মাধ্যম খুঁজে পাচ্ছে। যেসব সমাজের মানুষ পাঠ্যাভ্যাস বেড়েছে সেই সমাজ থেকে অন্ধকার কেটে আলোকিত হয়েছে।
জ্ঞানী গুণীদের এই প্রচেষ্টা চলমান আছে বিশ্বের দেশে দেশে। এই চেষ্টায় মানুষের মাঝে পাঠ্যভ্যাস বাড়াতে অগ্রসরমান সমাজের জ্ঞানীরা এলাকায় এলাকায় সৃষ্টি করেছে লাইব্রেরি।
বই এর পাঠক সৃষ্টি করার মহান ব্রত নিয়ে ২০০৬ সালে রাউজান উপজেলা সদরের একদল শিক্ষিত তরুণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার নামে একটি পাঠাগার। ওই সময় যারা এই মহৎ উদ্যোগটি গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে কয়েকজন হচ্ছে সৈয়দ মুহিবুল্লাহ,মোহাম্মদ আতিকুল ইসলাম, সৈয়দ আহসানউল হক, মোহাম্মদ শাহ আলম, মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন, রিপন চৌধুরী অন্যতম। উপজেলার মুন্সিরঘাটার মাদরাসা গেইটের নবাব মঞ্জিলেই বসে তারা পরিচালনা করতেন এই কার্যক্রম। প্রথম দিকে ছোট পরিসরে পাঠাগারের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হলেও ২০১৩ সালে রিপন দেব এর তৎপরতায় এর কার্যক্রম সমপ্রসারণ করা হয়। গ্রামে গ্রামে পাঠক সৃষ্টিতে দল বেঁধে তৎপরতা শুরু করা হয়। পাঠাগারের উদ্যোক্তা যারা ছিলেন তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সেই সুবাদে পরিচিত জনদের কাছ থেকে বই সংগ্রহ করে রোকেয়া পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করেন। প্রথম দিকে তারা যেই ঘর পাঠাগার হিসাবে ব্যবহার করতেন,শেষ পর্যায়ে ওই ঘরে তাদের ছেড়ে দিতে হয় বিভিন্ন কারণে। সংগৃহীত বই নিয়ে রাখা হয় প্রতিষ্ঠাদের কয়েকজনের ঘরে। পাঠাগারের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিজেদের মধ্যে কোনো সময় আলাপ আলোচনার প্রয়োজন হলে তারা অস্থায়ী ঠিকানা হিসাবে ব্যবহার করেন রাউজান ইংলিশ স্কুলের একটি কক্ষকে।
প্রতিষ্ঠাতাদের একজন রিপন দেব বলেছেন তাদের রোকেয়া পাঠাগারের স্থায়ী ঘর না থাকলেও এখন এই পাঠাগারের বই এর পাঠক উপজেলা সদরের অসংখ্য নারী পুরুষ। সপ্তাহে একদিন তারা দল বেঁধে গ্রামে বের হন ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে। মানুষের বাড়িতে গিয়ে পাঠকদের পছন্দের বই দিয়ে আসেন। নির্ধারিত সময় শেষে তারা ওই বই ফেরত দিয়ে নতুন বই সংগ্রহ করেন। জানা যায়, এখানে যারা বই পড়েন তাদের মধ্যে বেশির ভাগ নারী, রয়েছে, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ। রাউজানের ব্যতিক্রম ধর্মী এই পাঠাগারে বই এর সংখ্যা এখন চার’শ এর বেশি। এখানে রয়েছে ইতিহাস, প্রবন্ধ,গল্প,কবিতা, মুক্তিযুদ্ধ, ভ্রমণ কাহিনীসহ বিভিন্ন স্বাধে গুণীজনদের লেখা বাই। সংশ্লিষ্টদের মতে রোকেয়া পাঠাগারের বর্তমান তালিকাভুক্ত পাঠক সংখ্যা প্রায় দেড়’শ। এরমধ্যে নিয়মিত পাঠক এক’শ এর কাছাকাছি। পাঠাগারের সদস্য হওয়ার জন্য তাদের রয়েছে নির্ধারিত ফরম। ৩০ টাকা দিয়ে সদস্য হলে তাদেরকে চাহিদা অনুসারে বই দেয়া হয়। এই পাঠাগারের সদস্যরা প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিষয় ভিত্তিক পাঠচক্রের আয়োজন করেন,জাতীয় দিবস সমূহ পালনে কর্মসূচি গ্রহণ করেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পরিচালিত গণহত্যার স্থান জগৎমোল্লা পাড়ার বধ্যভূমিতে প্রতিবছর বিজয় দিবসের কর্মসূচি নেয়া হয়।
লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস (বিভিন্ন প্রকাশনার তথ্যের ভিত্তিতে) থেকে জানা যায় ভারতবর্ষের কলকাতায় ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল এর সহায়তায় ইংরেজরা সর্বপ্রথম ‘কলিকাতা পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে বিশেষ ব্যক্তিদের উদ্যোগে ইংল্যান্ডে ‘গণগ্রন্থাগার আইন’ পাস হওয়ার পর জনগণের করের টাকায় লাইব্রেরি তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ১০০ থেকে দেড়’শ বছরের পুরনো লাইব্রেরির সংখ্যা রয়েছে প্রায় অর্ধশত। এগুলো গড়ে উঠেছে ১৮৩১ সাল থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে। ১৯২৪ সালে বেলগাঁও শহরে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের ৩৯তম অধিবেশনে গ্রন্থাগার নিয়ে এক আলোচনার মাধ্যমে ব্রিটিশ ভারতের সর্বত্র পাঠাগার প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। সর্বপ্রথম ভারতে গ্রন্থাগার সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯২৪ সালে। ১৯২৫ সালে ‘নিখিল বঙ্গ গ্রন্থাগার সমিতি’ নামে একটি পাঠাগার সমিতির আত্ম প্রকাশ ঘটেছিল।

x