বেগম রোকেয়া : দেদীপ্যমান জ্যোতিতে সচেতনতা জাগ্রত করার প্রতীক

উম্মে সালমা

শনিবার , ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ
24

সামাজিক কুপ্রথা কুরীতি-নীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি ছিন্ন করে মুসলমান নারীর মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের মহান উদ্দেশ্যে বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্যায়ে এগিয়ে আসেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নারীমুক্তি কামনা করে বিংশ শতকের প্রথম দশকেই লেখনীর মাধ্যমে সমাজের নারীর অধঃপতি অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেন। সমাজ ও জাতির কল্যাণের নিমিত্তে নারীর শিক্ষিত ও সচেতন হওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, নারীর মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হওয়া যে আবশ্যক, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির যে অপরিহার্যতা এবং নারীর মানসিক দাসত্বের অবসান যে একান্তভাবে কাম্য তাঁর চিন্ত-চেতনার মধ্যে এ সব কথা যারপরনাই প্রতিফলিত হয়েছে।

বেগম রোকেয়া (৯ ডিসেম্বর ১৮৮০-৯ ডিসেম্বর ১৯৩২)। বাংলার মুসলিম নারী জাগরণের ইতিহাসে রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন অনন্য এবং অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। অসাধারণ প্রতিভা এবং ব্যক্তিত্ব বলে যুগ-যুগান্তরে নিপীড়িত বাঙালি মুসলিম নারী সমাজকে তিনি দিয়েছিলেন আলোর সন্ধান। সামাজিক কুপ্রথা কুরীতি-নীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি ছিন্ন করে মুসলমান নারীর মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের মহান উদ্দেশ্যে বিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্যায়ে এগিয়ে আসেন বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনি নারীমুক্তি কামনা করে বিংশ শতকের প্রথম দশকেই লেখনীর মাধ্যমে সমাজের নারীর অধঃপতি অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তুলেন। সমাজ ও জাতির কল্যাণের নিমিত্তে নারীর শিক্ষিত ও সচেতন হওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, নারীর মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হওয়া যে আবশ্যক, নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির যে অপরিহার্যতা এবং নারীর মানসিক দাসত্বের অবসান যে একান্তভাবে কাম্য তাঁর চিন্ত-চেতনার মধ্যে এ সব কথা যারপরনাই প্রতিফলিত হয়েছে।
দুই.
বেগম রোকেয়া উপলব্ধি করেছিলেন, শিক্ষার দেদীপ্যমান বিমল জ্যোতির প্রভাবে নারীমনে সচেতনতা ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগ্রত হয়ে তোলার প্রতীক হয়ে উঠেছিল তার জীবনকর্ম। ফলে সমাজে নারী নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। নারী তার কর্তব্য-কর্মে এগিয়ে যাবার সাহস সঞ্চার করে। তাঁর জীবনকালেই যে তাঁর চিন্তা চেতনার ধারা বাঙালি মুসলিম সমাজকে প্রভাবিত করেছিল, তার স্বাক্ষর রয়েছে বাঙালি মুসলমানদের সামাজিক ইতিহাসে। বেগম রোকেয়ার চিন্তা-চেতনার ধারা বিশ্লেষণে এ কথা আরো প্রতীয়মান হয় যে উনবিংশ শতাব্দীকে বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে যে রেনেসাঁস সূচিত হয়েছিল, বাংলার মুসলিম সমাজের বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনে প্রবর্তক বেগম রোকেয়া ছিলেন সেই রেনেসাঁসের একজন যোগ্য উত্তরাধিকারী।
তিন.
১৯১৬ সালে ১৬ ডিসেম্বর দেশনেত্রী সরোজিনী নাইডু বেগম রোকেয়ার স্বদেশ ভাবনা, নারী শিক্ষার বিস্তার, মহৎ সাধনার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছিলেন। সরোজিনী নাইডু বলেছিলেন, ‘আজ একান্তভাবে অপরিচিতভাবে রোগ শয্যায় শুইয়া আপনাকে এই চিঠিখানা লিখলাম। কয়েক বৎসর হতে দেখছি, আপনি কী দুঃসাহসের কাজ করে চলেছেন। মুসলমান বালিকাদের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের জন্য আপনি যে কাজ হাতে নিয়েছেন। তা সাফল্যের জন্য দীর্ঘকাল ব্যাপী যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা বাস্তবেই বিস্ময়কর। আপনার প্রতি আমার আন্তরিক সহানুভূতি ও শ্রদ্ধা।’
চার.
বাংলার মুসলিম সমাজের বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের প্রবর্তক বেগম রোকেয়া রেনেসাঁসের একজন অন্যতম উত্তরাধিকারী ছিলেন। তাঁর প্রাণশক্তি ও গতিময়তা না থাকলে, স্বামীর দেশ বিহারের ভাগলপুরে প্রথমবার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠার পর, মাত্র দশ মাসের মাথায়, স্বজন বঞ্চনার সম্মতি নিয়ে, তাঁকে যখন চিরদিনের মতো সেখানকার পাঠ চুকিয়ে কলকাতায় চলে আসতে হলো, তখন নতুন জায়গায় আবার নতুন করে বিদ্যালয় চালুর উদ্যোগ তিনি নিতে পারতেন না। কোন সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই অদম্য ইচ্ছা শক্তি ও দৃঢ় মনোবল নিয়েই তিনি শুরু করেন নারী জাগরণের অসম্ভব ও কঠিন চিন্তাসাধনামুলক কাজটি। তাঁর চিন্তা চেতনাগুলোকে তিনি প্রকাশ ঘটিয়েছেন তাঁর রচনায়, মতিচুর ১ম খন্ড (১৯০৫) মতিচুর ২য় খন্ড (১৯২২), ‘সুলতান’স ড্রিম’ (১৯২২), পদ্মরাগ (১৯২৪), অবরোধবাসিনী (১৯৩১), তাঁর সমাদৃত রচনাবলি।
পাঁচ.
১৯০৫ সালে প্রকাশিত হয় বেগম রোকেয়ার ‘মতিচূর’ প্রথম খন্ড নামক একটি সংকলন গ্রন্থ। বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের ইতিহাসে এই গ্রন্থটির প্রকাশনা নিঃসন্দেহে এক যুগান্তকারী ঘটনা। সমাজের সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্যে উক্ত গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি অবরোধবাসিনী নারীর দুঃখ-দুর্দশা ও সমাজের করুণ চিত্র সমাজের নিকট তুলে ধরেন। ১৯০৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘সুলতান’স ড্রিম’ গ্রন্থটি। পরবর্তীতে এর অনুবাদ ‘সুলতানার স্বপ্ন’ শিরোনামে ‘মতিচূর’ দ্বিতীয় খন্ডে সন্নিবেশিত হয়। উক্ত রচনায় তিনি এক অপূর্ব নারী জগতের কল্পনা করেছেন, সেখানে পুরুষ পর্দার আড়ালে গৃহকোণে আবদ্ধ এবং নারী মস্তিস্ক বলে অতি সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। সুবিধা লাভ করলে নারীর সুপ্ত প্রতিভা যে বিকশিত হতে পারে, এটাই প্রকাশ পেয়েছে তাঁর উক্ত রচনায়। পুস্তকটি ছিল নারীর উপর পুরুষের প্রভুত্বের বিরুদ্ধে চিন্তাশীল একটি প্রকল্প। বলা যায়, এই গ্রন্থের মাধ্যমে তিনি নারীর হীনমন্যতা দূর করে নিজ প্রতিভা ও গুণাবলি সম্পর্কে সচেতন করে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন।
ছয়.
বেগম রোকেয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা ‘অবরোধবাসিনী’। তিনি এই গ্রন্থে নারী সমাজের দুঃখ, দুর্দশার চিত্র সম্বলিত অতি চমৎকার ও নিপুণতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন। এর অধিকাংশ কাহিনী বেগম রোকেয়ার নিজস্ব রচনা। এর মধ্যে কয়েকটি উর্দু কাগজ হতে সংগ্রহ করে তার অনুবাদও করেছেন। সমাজকে জাগ্রত করার ক্ষেত্রে সম-সাময়িক বাঙালি মুসলিম সমাজে অবরোধবাসিনী এর ভূমিকা অপরিসীম।
ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করে বেগম রোকেয়া লক্ষ্য করেন যে, শুধু বাংলার মুসলিম সমাজ নয়, ভারতীয় উপমহাদেশের সমগ্র মুসলিম চিরাচরিত সামাজিক বিধি-ব্যবস্থায় চরমভাবে অবহেলিত নির্যাতত ও দুর্দশাগ্রস্ত। তিনি আরো উপলব্ধি করেছিলেন নারী সমাজ তাদের এই অসহনীয় অবস্থা সম্পর্কে আদৌ সচেতন নন। তাই নারী মনে চেতনার ভাব সঞ্চারণের উদ্দেশ্যে বেগম রোকেয়া নির্ভীক চিত্তে বলেছিলেন, ‘পাঠিকাগণ, আপনরা কি কোন দিন আপনাদের দুর্দশার কথা চিন্তা করিয়া দেখিয়াছেন? এই বিংশ শতাব্দীর সভ্য জগতে আমরা কী? দাসী! পৃথিবী হইতে দাস ব্যবসা উঠিয়া গিয়াছে শুনতে পাই। কিন্তু আমাদের দাসত্ব গিয়াছে কিনা? না!’
জীবনের নানা ক্ষেত্রে শক্তি-সামর্থ দিয়ে জগতের অগ্রগতিকে সহায়তা করার অধিকার আছে নারীর। কিন্তু নারীর ব্যক্তিত্ব বিকাশের ক্ষেত্রে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা এমনই প্রতিকূল ছিল যে, নারীর স্বাধীন অস্তিত্ব স্বীকার করা হতো না।
তাছাড়া নিষ্ঠুর সমাজ বিধানের ফাঁদে পড়ে নারী ছিল সমাজের সকল প্রকার ন্যায্য সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এই সুযোগের অভাবকেই বেগম রোকেয়া নারী জাতির দাসত্বের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রসঙ্গত তাঁর অভিমত ব্যক্ত করে তিনি বলেন ‘আমাদের এই বিশ্বব্যাপী অধঃপতনের কারণ কেহ বলতে পারেন কি? স্ত্রী জাতি সুবিধা না পাইয়া সংসারের সকল প্রকার কার্য হইতে অবসর লইয়াছে। এবং ইহাদিগকে অক্ষম ও অকর্মণ্য দেখিয়া পুরুষ জাতি ইহাদের সাহয্য করিতে আরম্ভ করিল। ক্রমে পুরুষ পক্ষ হইতে যতই বেশি সাহায্য পাওয়া যাইতে লাগিত, স্ত্রী পক্ষ ততই অধিকতর অকর্মণ্য হইতে লাগিল।’
সাত.
নির্যাতিত, নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, উপেক্ষিত ও পুরুষদের সুপরিকল্পিত দাসত্ব বন্ধনে আবদ্ধ বাঙালি মুসলিম নারী জাতির সর্বাঙ্গীন মঙ্গল সাধনই ছিল বেগম রোকেয়ার জীবনের ব্রত। এ উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখেই তিনি লেখনীর সাহায্যে তাঁর চিন্তা চেতনাকে সমাজের নিকট পেশ করেন। বাস্তবজীবনেও তাঁর চিন্তাধারার কার্যকর করার ও প্রচেষ্টা করেন। ‘পদ্মরাগ’ ছিল তার জীবন স্বপ্ন সম্পর্কিত এমনি একটি উপন্যাস। ‘পদ্মারাগ’ এ বর্ণিত তারিণী ভবনের প্রতিষ্ঠাতা দীন তারিণীর যে বর্ণনা বেগম রোকেয়া দিয়েছেন, তা থেকে অনুমান করা হয় যে, লেখিকা দীনতারিনী চরিত্রটির মধ্য দিয়ে আপন জীবন-ঘটনা ব্যক্ত করেছেন। পদ্মরাগ উপন্যাসে দীনতারিণী চরিত্রটির বর্ণনা ছিল এমনই ‘লব্ধ প্রতিষ্ঠ ব্যরিস্টার তারিণীচরণ সেন অকালে দেহত্যাগ করেছেন। তাহার পুত্রকন্যা কেহই ছিল না। ছিলেন কেবল দ্বিতীয় পক্ষের সপ্তদশবর্ষীয়া তরুণী বিধবা দীনতারিণী। লেখিকার ভাষায় ‘দেবর-ভাসুর প্রভৃতি আত্মীয় স্বজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দীনতারিণী একটি বিধবা আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। একটি বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন ‘নারী ক্লেশ নিবারণী সমিতি’ নামে একটি সভাও গঠন করিলেন। ভবনের একপ্রান্তে বিরাট আশ্রম, অন্যপ্রান্তে বিদ্যালয়। কিন্তু ক্রমে তাঁহাকে তৎসংলগ্ন একটা আতুর-আশ্রম স্থাপন করিতে হইল।’ তারিণী বিদ্যালয়ের শিক্ষার প্রবেশ এবং শিক্ষা পদ্ধতির সঙ্গে আমরা বেগম রোকেয়ার প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল শিক্ষাব্যবস্থার সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। অন্যদিকে বেগম রোকেয়া নারীদের জন্য এমন একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন যেখানে সকল পরিত্যক্ত বাঙালি, উপেক্ষিত, অবস্থায়, লাঞ্ছিত নারী তাদের সুন্দর জীবন খুঁজে পাবে এবং সমাজের সব রকম অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে।
আট.
নারী মুক্তির পূর্বশর্ত হচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা- এ কথা বেগম রোকেয়া বিশ্বাস করতেন। তাঁর এ উপন্যাস রচনার মুল বক্তব্যই হচ্ছে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি। বেগম রোকেয়ার চিন্তা ও অনুভূতি জানতে বিরাট স্থান জুড়ে ছিল নারী সমাজ। তবে নারী সমাজের অগ্রগতিই তাঁর একমাত্র চিন্তা ছিল না। তিনি দেশের উন্নয়ন এবং সহযোগিতা ছাড়া দেশের যে অগ্রগতি হতে পারে না তা তিনি তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধ আলোচনায় ফুটিয়ে তোলেছেন। ‘জ্ঞানফল’ ‘মুক্তিফল’ নামক প্রবন্ধে তাঁর এ দেশ ভাবনার সুচিন্তিত মতামত প্রকাশিত হয়েছে। স্বদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে তিনি নীরব ছিলেন না। ইংল্যান্ডে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধশালী ভারতবর্ষের ঐশ্বর্য ও প্রাচর্যু গ্রাস করে ভারতবর্ষে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠিত করেছে তা ‘জ্ঞানফল’ শীর্ষক রূপকথার মধ্য দিয়ে বেগম রোকেয়া পাঠক সম্মুখে উপস্থাপিত করেন অতি নিপুণতার সঙ্গে।
সুদীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হবার পর স্বাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত হবার চেতনা ভারতবাসীর মধ্যে পরিলক্ষিত হলেও নারী প্রতি পুরুষের অবিচার, উদাসীনতা এবং সর্বোপরি বৈষম্যমুলক আচরণ ভারতবাসীর স্বাধীনতার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। দেশ ও জাতির বাহ্যিক মুক্তির লক্ষ্যে পুরুষের ন্যায় সমাজে নারীর ভূূমিকা ও কিছু কম নয়। কিন্তু নারীকে তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে বঞ্চিত রেখে পুরুষ সমাজ স্বদেশের স্বাধীনতার গতিকে করে মন্থর।
নয়.
নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ ও তার ক্ষমতায়নের প্রশ্নটি আজ বিশ্ব পরিসরে এক আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশে নারীর অধিকার, নিরাপত্তা এবং তার স্বাধীনতা বিষয়ে অনেক শীর্ষক সম্মেলন হচ্ছে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে। যদিও এ ক্ষেত্রে ঘোষণা ও বাস্তবতার মধ্যে কিছুটা পার্থক্য আছে, এমনকি শিল্পোন্নত দেশগুলোতেও রয়েছে। কোনো সমাজ কতটা উন্নত বা অগ্রসর তা বিচারের ক্ষেত্রে যে সমাজে নারীরা পুরুষের সঙ্গে তুলনায় কতটা অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করছে তা বোঝা যাবে সে সমাজের অগ্রগতির মাধ্যমে। যেখানে নারীর বৈষম্য, নারী অধিকার বঞ্চিত হবে সে সমাজ, দেশ হবে অনগ্রসর। প্রায় শতাব্দী কাল আগে পশ্চাদপদ উপনিবেশিক সমাজের একজন নারী বেগম রোকেয়া নারী পুরুষের মজুরি-বৈষম্যের এ বিষয়টির উল্লেখ করে লিখেছিলেন, ‘পুরুষের পরিশ্রমের মূল্য বেশি, নারীর কাজ সস্তায় বিক্রয় হয়। … পুরুষ যে কাজ করিলে মাসে ২ টাকা বেতন পায়, ঠিক সেই কাজ স্ত্রী লোকে ১ টাকা পায়। চাকরের খোরাকি মাসিক ৩ টাকা আর চাকরাণীর খোরাকি ২ টাকা। (সুত্র : স্ত্রী জাতির অবনতি, ১ম খন্ড)
বৈষম্যের এ বিষয়টি রোকেয়া উত্থাপন করেছেন এমন এক সময়ে, যখন আমাদের সমাজে ব্যাপক অংশের মধ্যে নারীদের প্রকাশ্য কর্মক্ষেত্রে প্রবশের প্রশ্নেই প্রবল বিরুদ্ধতা বিরাজ করছে। এমনকি শিক্ষিত ও অপেক্ষাকৃত সচেতন বলে পরিচিত অংশটিও নারী শিক্ষকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মোটামুটি একমত হলেও সে শিক্ষার ধরণ এবং নারীদের কাজের পরিধি নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংশয়-মত দ্বৈততা দেখা যায়। বেগম রোকেয়া কেবল কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষের জন্য সমান সুযোগ ও যোগ্যতার স্বীকৃতিই দাবি করেননি, আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন যে পরিশ্রম আমরা ‘স্বামীর’র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?’ গৃহকর্মকে এভাবে শ্রমের মর্যাদা ও রোকেয়ার আগে আর কেউ দিয়েছেন জানা নেই।
দশ.
নারীবাদী কথাটাকে তার আধুনিক ও প্রচলিত অর্থে হয়তো রোকেয়া সম্পর্কে প্রয়োগ করা যাবে না। নারীবাদ এই ধারণাটির সঙ্গেও সে অর্থে রোকেয়ার পরিচয় থাকবার কথা নয়। এমনকি মেরি ওলস্‌টন কাফটকে (১৭৫৯-১৭৯৭) যদি আমরা প্রথম নারীবাদী হিসেবে গণ্য করি (যদিও মেরি তাঁর নিজের লেখায় ‘নারীবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করেননি) তাহলেও তাঁর রচনার সঙ্গে রোকেয়ার প্রত্যক্ষ পরিচয়ের কোনো প্রমাণ সমগ্র রোকেয়া রচনাবলিতে পাওয়া যায় না। এমনিতে ‘নারীবাদ’ ধারণাটিকে কোন একক সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। কিন্তু নারীবাদের মূলকথা যদি হয় পুরুষের সঙ্গে সার্বিক সাম্য ব্যবস্থা কিংবা নারীর স্বাবলম্বী অস্তিত্বের স্বীকৃতি, তবে সে নারীবাদের সুর বেগম রোকেয়ার ‘মতিচূর’ (১ম খন্ড) এর বিভিন্ন প্রবন্ধ এবং সুলতান’স ড্রিম ও পদ্মরাগ এ তো বটেই, অপেক্ষাকৃত স্বল্প আলোচিত রচনা সৌরজগৎ, জ্ঞানফল, মুক্তিফল, সৃষ্টিতত্ত্ব, ভ্রাতা-ভগ্নী প্রভৃতিতে ধ্বনিত হয়েছে।
নারী-স্বাধীনতা বলতে বেগম রোকেয়া কেবল নারীদের শিক্ষার সুযোগ ও তাদের অবাধ চলাফেরার অধিকারকেই বোঝাননি। অবস্থার খানিকটা তারতম্য সত্ত্বেও পুরুষ শাসিত সমাজে কি ভারত বর্ষে, কি ইউরোপে, নারীরা যে আসলে পরাধীন এ সত্যটি বেগম রোকেয়া ঠিকই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ডেলিশিয়া হত্যাসহ একাধিক রচনায় তিনি তাঁর এই মত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। নারীমুক্তির এই বিশেষ প্রসঙ্গেই নয়, অন্যান্য প্রসঙ্গেও তিনি ইউরোপ বা পাশ্চাত্যের সঙ্গে সভ্যতা ও প্রগতিকে সমার্থক জ্ঞান করেননি। তাঁর সমসাময়িক আমাদের অধিকাংশ প্রাগ্রসর লেখক-চিন্তাবিদের সঙ্গে তুলনায় বেগম রোকেয়ার বিশিষ্টতা অনুমেয়।

বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন হোসেন সারাজীবন নারী শিক্ষার উন্নতিকল্পে, নারীর অবরোধ মুক্তি কামনায়, দেশকালের প্রেক্ষিতে ও সমাজের উন্নয়ন সাধনকল্পে তিনি যে ভূমিকা রেখেছিলেন, সে জন্য তিনি কেবল নারী নয়, সমগ্র মানুষের কাছে কালে ও কালোত্তরে অনন্য এবং সমাদৃত হয়ে থাকবেন। কাল নিরবধি তাঁর চেতনাবোধ জাগ্রত হয়ে থাকবে।
সহায়ক গ্রন্থ :
* মাহাবুবুল হক : বাংলা সাহিত্যের আধুনিক যুগ
* মোরশেদ শফিউল হাসান : বেগম রোকেয়া : কালো ও কালোত্তরে,
বেগম রোকেয়া : সময় ও সাহিত্য, বেগম রোকেয়া ঃ জীবন ও সাহিত্য
উম্মে সালমা, শিক্ষার্থী, এম এ, বাংলা বিভাগ, চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ।

x