বৃষ্টির দিনে বগালেক

সমির মল্লিক : খাগড়াছড়ি

সোমবার , ৩ জুন, ২০১৯ at ১১:১২ পূর্বাহ্ণ
147

পাহাড় ভালোবাসেন এমন মানুষের কাছে বগা লেক খুবই পরিচিত নাম। বগালেক যায়নি এমন পর্যটকের সংখ্যা বোধহয় খুব কম ! তবে বর্ষায় বগা মেলে ধরে তার আসল সৌন্দর্য । মেঘের পেখম থেকে ঝড়ে পড়ে বৃষ্টি । বগালেকের স্বচ্ছ জলে সবুজের ছায়া,ঝিরি ঝিরি বৃষ্টিতে ভরে উঠছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২০০ ফুট উপরের এই প্রাকৃতিক লেক । জনশ্রুতি আছে প্রাচীন কোন আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকেই বৃহৎ এই লেকের সৃষ্টি । চট্টগ্রাম থেকে এরকম ঝড়ো বৃষ্টিকে মাথায় নিয়ে রওনা হই বগালেক এর উদ্দ্যেশে । সকালের বাসে ২ ঘণ্টার ব্যবধানে পৌঁছাই পাহাড় শহর বান্দরবানে। প্রাতঃরাশ সেরেই আবার রওনা হলাম রুমা স্টেশনের দিকে। স্টেশনে পৌঁছাতেই বৃষ্টি প্রথমবারের মত ভিজিয়ে দিলে সবাইকে । রুমা’র বাস ছাড়বে সকাল ১০ টায় । অপেক্ষার সময়টা বয়ে গেল চোখের পলকে। একসময় ঝড়ের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে আমাদের বাস।
বান্দরবান থেকে রুমা পর্যন্ত পুরো পথটায় পাহাড়ে মোড়ানো। উঁচু পাহাড়ের পথ ধরে, বৃষ্টির মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছে অভিযাত্রী বাসটি, বৃষ্টিকে ষোলআনা উপভোগ করতে বাসের ছাদই শ্রেষ্ঠ অবলম্বন, তবে বৃষ্টিতে বাসের ছাদ থেকে ঝাপসা দূরের জগত। কারণ সবুজ পাহাড়গুলো ততক্ষণে নিজেকে ঢেকেছে বৃষ্টির চাদর, কাছে-দূরের পাহাড়গুলোকে স্পষ্ট দেখা যায় না। বৃষ্টিতে আমাদের প্রায় জুবথুবু অবস্থা। পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কখনো কখনো নিচু গাছের মৃদু আঘাত ! বৃষ্টির বৈতরণী পাড়ি দিয়ে কিছুটা সময়ের জন্য বিরতি। বৃষ্টি ভেজার দিনে গরম চা খুবই কার্যকরী ! ওয়াই জংশন মুরং দোকানে গরম চায়ের চুমক দিতে দিতেই বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেল । এবারের বৃষ্টির গতিও কিছুটা মন্থর। বৃষ্টিস্নাত সবুজের পথ পেরিয়ে বাস চলেছে রুমা’র পথে। হালকা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আড্ডা হয় এক মুরং বন্ধুর সাথে। দুপুরের নাগাদ পৌঁছায় রুমা স্টেশন। স্টেশনেই নেমেই দেখলাম স্রোতস্বীনি সাগু নদীর তীব্র স্রোত, উজানের বয়ে আসা বৃষ্টির পানি- পাহাড়ী ঢল !
অগত্য রুমা বাজার যেতে হবে নৌকায় । তীব্র গতির স্রোত ঠেলে ইঞ্জিনচালিত দেশী বোট রুমা বাজারের দিকে যাত্রা করল। দলে যারা সাঁতার জানত না, তারা একটু ভয় পেয়ে গেল! তবে পথটা বেশীক্ষণের নয়, জলের পথ শেষ হতেই তাদের চোখে মুখে ভুবন জয়ের হাসি !
রুমা বাজারে অভ্যর্থনা জানাল গাইড শাহজাহান। দুপুরের খাওয়া শেষ করেই বগালেকের পথে যাত্রা। ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণ তাই রুমা থেকে বগালেক পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাজার আর্মি ক্যাম্পে পরিচয় লিপিবদ্ধ করেই রওনা যাত্রা শুরু ।
রুমা থেকে বগালেকের পায়ে হাঁটা পথের দূরত্ব প্রায় ১৭ কিলোমিটার। এখন সড়ক পথ তৈরি হয়েছে। দূরত্ব অত বেশী না হলেও বৃষ্টির কারণে পথ বেশ পিচ্ছিল। কাঁধে ব্যাকপেক, হাতে ট্রেকিং স্টিক নিয়ে হেঁটে চলেছি ৯ জনের অভিযাত্রী’র দল। উপরে তাকাতে মনে হল যেন আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামবে ! ভাবতে না ভাবতেই চোখের সামনে দেখছি দূরের পাহাড়গুলো কেমন করে বৃষ্টিতে ঢেকে আসছে ।
কানে আসছিল বৃষ্টির শোঁ শোঁ শব্দ, বৃষ্টি ক্রমাগত এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে । বৃষ্টি আমাদেরকেও ছুঁয়ে ফেলল। তখন প্রায় বিকেল। সন্ধ্যার আগেই বগালেক পৌঁছাতে হবে, তাই বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। ঝুপঝুপ বৃষ্টিতে পিচ্ছিল রাস্তা মাড়িয়ে হাঁটতে লাগলাম ।
বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা, যাত্রা পথের হালকা বিরতি । এর মধ্যে বৃষ্টি কিছুটা কমে এসেছে । মেঘহীন আকাশ বেশ ঝকঝকে । তবে ঘনিয়ে আসছে সন্ধ্যা। মেঘমুক্ত আকাশের হঠাৎ চাঁদের উঁকিঝুঁকি, সেই আলোতে হাঁটতে থাকলাম বগা লেকের পথে। বৃষ্টি,পাহাড়ের পথে জ্যোৎস্নাস্নান সবমিলিয়ে অদ্ভুত শিহরণ ! একধরনের থ্রিলিং নিয়ে, কৃত্রিম আলোর সাহায্য ছাড়াই শেষমেশ পৌঁছে গেলাম বগালেক। বগালেকের ঠাণ্ডা জলে মুখ ভিজিয়ে সিয়াম দি’র কটেজে জলপান। এখানেই আমাদের রাতযাপন। কটেজে নিজেদের ব্যাকপ্যক রেখেই লেকের জলে লম্বা গোসল প্রস্তুতি! ঝাঁকে ঝাঁকে তারার দল বগালেকের আকাশে। ক্লান্ত অভিযাত্রীর দল নিজেদের ভিজিয়ে নিল বগালেকের শান্ত শীতল জলে । বগালেকের চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন পাহাড়ের সারি । বাতাসের শব্দ বয়ে আসছে কাছের পাহাড় থেকে।
রাতের বগালেকটা যেন এক মায়াবীপুরী’র রাজ্য । দূর পাহাড়ের ঝিঁঝিঁপোকা শব্দ, কাছে-দূরের মেঘ, সবুজ বন আর ১২০০ ফুট উপরে বিশাল জলের আঁধার সব মিলিয়ে এই যেন এক অন্য পৃথিবীর চিত্র ।
এত উঁচু পাহাড়ের বুকে যুগের পর যুগ অপরিবর্তনীয় শতাব্দীর এই প্রাকৃতিক লেক না দেখলে মনে হয় এক জীবন বৃথা! রাতের আহারে ভাতের সাথে ঝাল ব্যঞ্জন, অতুলনীয় স্বাদের রসনা তৃপ্ত মন। ঝিরিঝিরি ঠান্ডা বাতাসে চাঁদের আলোয় জমে উঠে আমাদের রাতে আড্ডা। সহস্র নক্ষত্রের ঢাকা বগালেকের রাতের আকাশ। সবুজ পাহাড়ে আটকে আছে বিশাল চাঁদ -এযেন চাঁদের পাহাড়। জ্যোৎস্নায় নরম আলোয় ডুবে যাই ঘুমের দেশে। ভোরে ঘুম জড়ানো চোখ মুছতেই দেখি চাঁদের পাহাড়গুলো ঢেকে আছে তুলোট মেঘের সারিতে। কটেজের দোতলা কাঠের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছি মনে হচ্ছে মেঘের জনপদে আমি এর আদিম বাসিন্দা । এমন অনুভূতি কেবল বগালেকই দিতে পারে !

x