বৃদ্ধা মেরি ও অন্যান্য

কান্তা তাজরিন

মঙ্গলবার , ২৯ মে, ২০১৮ at ৫:৫৪ পূর্বাহ্ণ
18

আজ ঘরে নতুন পর্দা লাগিয়েছি। যতটা ভেবেছিলাম মনমতো হয়নি। বরাবরই বাস্তবের চেয়ে কয়েক ধাপ এগিয়ে থাকে কল্পনা। একটা মনের মতো ঘরের স্বপ্ন তো সবাই দেখে। আরো বিশেষ করে বললে মেয়েরাই বেশি দেখে। কারুর সাথে ঘর বাঁধা না, স্রেফ প্রাকৃতিক নিয়মে নারী যেহেতু সন্তান ধারণ করে সেহেতু একটা নিরাপদ ছিমছাম আশ্রয় তার চাই। সেই কবে থেকে খাদ্যের সংস্থানও করেছে নারী। স্কুলের সমাজবিজ্ঞান বইতে পড়েছিলাম কৃষির শুরুও নারীর হাতে। আচ্ছা এইসব পুস্তকীয় জ্ঞান তো সবাই জানে, কি বলতে চাইছি সেটা শুরু করি। কিন্তু আমার সংশয়ী মন অপ্রস্তুত। কি করে বলি সদাচারের নামে কত কত নারী স্রেফ মানুষের না মানুষের ছায়ার জীবন কাটিয়ে গেছে, খোদ এই নারীবাদের ভৌগলিক উত্থানের এই ইউরোপে!!

গত শতাব্দীর শেষ ভাগে রিপাব্লিক অব আয়ারল্যান্ডের সমাজ খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিল। অনেক কাল ধরে আটকে থাকা কূপের ভেতর থেকে বেরুতে চাইছিল। তার আগে সমাজ পরিচালিত হতো ধর্মীয় নেতা আর ধর্মযাজকদের ইশারায়, বাতলে দেয়া শৃংখলায়। এই পাল্টে যাওয়া বা পাল্টানের হাওয়া লাগা সময়ে একজন সাংবাদিক প্রাচীনপন্থা বিষয়ে খবর জোগার করতে গিয়ে এক আশ্চর্য তথ্য পান। একটা প্রজন্ম বেঁচে থেকেও মৃতের জীবন কাটিয়ে গেছে। তাদের অস্তিত্বই ছিল না রাষ্ট্রনামক প্রতিষ্ঠানের কাছে, না তারা ভোট দিত না তাদের নাম তোলা হত কোনো নথীপত্রে। তাদের শিক্ষিত শোভন পরিবারও তাদের নাম মুছে দিত চিরতরে জীবন থেকে, এই অদৃশ্যজনেরা কখনো তাদের পরিবারের নাম নিতে পারত না পাছে পরিবার কলঙ্কিত হয়। কলঙ্ক শব্দটা থেকে কি বোঝা যাচ্ছে এরা সকলেই নারী ছিল? এরা প্রত্যেকেই ছিল কলঙ্কিনী রাধার নানা রূপ। কলঙ্ক সে একা নারীর, যেমন কথিত আছে লজ্জাও একা নারীরই ভূষণ

বিবাহবহির্ভুত সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে এবং তার ফলে সন্তান ধারণ করলে, সেই পাপীকে সমাজ থেকে সরিয়ে নেয়া হত। স্বভাবতই সরিয়ে নেয়া হতো তার সন্তানকেও। সেইসব নারীদের জায়গা হতো পাপস্খলনের কেন্দ্রে। কি করে পাপ মোচন হতো? মাগদালিন লন্ড্রির কাপড় ধুয়ে। এই মাগদালিন লন্ড্রিতে পরিচ্ছন্ন পরিপাটি হতে আসত আয়ারল্যান্ডের সমস্ত চার্চের পবিত্র ব্যবহৃত বস্ত্র (পবিত্রর সাথে কাপড় শব্দটা কেমন বেমানান না?)। বলে রাখা সমীচীন যে, আয়ারল্যান্ড ধর্মীয় রাস্ট্র ছিল এবং কট্টর না হলেও এখনো ধার্মিকই আছে। তো, সেই তুমুল ধর্মের ধ্বজ্জা ওড়ানোর কালে, চার্চের সংখ্যাও ছিল প্রতুল, ব্যবহারও ছিল বেশি আর অতি ব্যাবহারের ফলে মলিনতাও ছিল বেশি, মানে বস্ত্রের।

এই মাগদালিন লন্ড্রিতে মেরি নামের এক মেয়ে তার সতেরো বছর বয়েসে এসে এখানেই তার বাকী জীবন কাটিয়ে ফেলল। কারণ সে ঐ একই অভিযোগে অভিযুক্ত। তো, যখন সাংবাদিকরা এই চমকপ্রদ সংবাদ প্রচারের জন্য সবখান থেকে জড়ো হচ্ছিলেন তখন বিবিসিতে একদিন মেরির সাক্ষাৎকার আসে। মেরি জানালেন এই লন্ড্রির কাজ করার অভিজ্ঞতা, সকাল থেকে সন্ধ্যা গরম জল, ক্ষার আর বিরামহীন পরিশ্রম করার কথা। বিনিময়ে পরিষ্কার শয্যা আর আহার। ছুটি নেই, বেতন নেই, সপ্তাহে একদিন প্রার্থনার জন্য কাজ থেকে অব্যাহতি। নামকরা এই লন্ড্রির নাম সমুজ্জ্বল রাখতে রাখতে তারা জীবনের নানা ঔজ্জ্বল্য বিষয়ে জ্ঞান হারিয়েছিল। যখন তিনি এই সাক্ষাৎকার দেন, তখন তাঁর বয়েস একষট্টি, সেও আজ থেকে প্রায় দুই দশক আগের ঘটনা। তাকে সাবধানে প্রশ্ন করা হয়েছে, ধর্মের নামে উৎসর্গ করে দেয়ার পরও কি তিনি ধর্মে বিশ্বাসী, পরজন্মে, স্বর্গে? তিনি খুব প্রত্যয়ের সাথে জানালেন, ‘নিশ্চয়ই বিশ্বাসী! ঈশ্বরের ইচ্ছায় যদি আমি এইখানে আজীবন আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে গেছি তো সেই ঈশ্বর অবশ্যই আমার জন্য পরজন্মও রেখেছেন। আর এই জন্মের চেয়ে, এই জীবনের চেয়ে তো যে কোনো জীবন বা জন্ম ঢের ভাল।’

মন ভার হয়ে আসছে, বৃদ্ধা মেরির জন্য শুভ কামনা। সত্যিই যদি স্বর্গ বলে কিছু থেকে থাকে তিনি সেটা এই জীবনের বিনিময়ে কিনেছেন। তিনি যেন সেখানে ভাল থাকেন। এই গল্পের পর আর কিছু বলটা জোলো শোনাবে। তারপরও তেতো পাচনের পর এক টুকরো মিছরি। এই সময়ে বাংলাদেশের এক মেয়ে, পাপ অন্যায় ইত্যাদি ভেবে ভেবে নিজেকে অপরাধী করত, বঞ্চিত করত ভাল থেকে, ভাললাগা থেকে। হঠাৎ তার বোধোদয় হল, তার একটাই অস্তিত্ব, একটাই শরীর মনকে ধারণ করার জন্য আর এই জীবনটাকে যাপন করার জন্য। তারপর সে তার চুল আর নখের কাছে ক্ষমা চাইল হাতপাগায়ের কাছে ক্ষমা চাইল, প্রতিজ্ঞা করল এখন থেকে নিজের যত্ন নেবে নিজেকে ভাল রাখবে।

একটা জীবন

এই একটা জীবন

অসম্ভবের মতো অবাক করা

x