বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধসহ ১০ দফা

আবরারের বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি ভিসিকে ।। ছোট ভাইকে পেটাল পুলিশ ।। জাতিসংঘ ও যুক্তরাজ্যের নিন্দা

আজাদী ডেস্ক

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:০৭ পূর্বাহ্ণ
95

আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গতকালও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) আন্দোলন চালিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তারা শহীদ মিনার চত্বরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। পরে সংবাদ সম্মেলন করে ১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরে বাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার, আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি, জড়িতদের বুয়েট থেকে আজীবন বহিষ্কার, দ্রুত আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট প্রকাশ এবং ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করাসহ ১০ দফা দাবি পেশ করেন। বেঁধে দেওয়া সময়ে দাবি পূরণ না হলে তারা ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষাসহ সব অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম অচল করে দেয়ার হুঁশিয়ারি জানান।
জাতিসংঘ ও যুক্তরাজ্যের নিন্দা : আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার নির্মম ঘটনার নিন্দা জানিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ ও যুক্তরাজ্য। গতকাল আলাদা বিবৃতিতে এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দার পাশাপাশি বিচার প্রক্রিয়ায় অবাধ ও সুষ্ঠু তদন্তের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের বিবৃতিতে বলা হয়, মুক্তভাবে নিজের মতপ্রকাশের জন্য বুয়েটের তরুণ ছাত্রকে খুন করার নিন্দা জানায় জাতিসংঘ। বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনে চলমান বহু বছরের সহিংসতায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন, যেসব ঘটনায় দায়ীদের দৃশ্যত দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ফেইসবুক পোস্টে ব্রিটিশ হাইকমিশন লেখেন, মুক্তবাক, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পক্ষে যুক্তরাজ্যের নিঃশর্ত অবস্থান রয়েছে।
আবরারের বাড়িতে ঢুকতে দেয়া হয়নি ভিসিকে : গতকাল বিকালে বুয়েট উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম কুষ্টিয়ায় আবরারের কবর জিয়ারত শেষে তার বাড়িতে ঢুকতে চাইলে এলাকাবাসীর বাধার মুখে পড়েন। গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বিকাল পৌনে ৫টার দিকে আবরারের গ্রাম রায়ডাঙ্গার ঈদগাহ মাঠে পৌঁছান। সেখানে ফাহাদের দাদা আব্দুল গফুর, বাবা বরকত উল্লাহ ও ভাই ফায়াজসহ নিহত ফাহাদের কবর জিয়ারত করেন এবং স্বজনদের সান্ত্বনা দেন। এরপর তিনি অদূরে ফাহাদের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা দেন তার মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য। কিন্তু বাড়ির সামনে গিয়ে তিনি জনতার ক্ষোভের মুখে পড়েন। এক পর্যায়ে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতাকে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে। তবে এসময় আবরারের ছোটভাই ফায়াজ, তার ফুপাতো ভাইয়ের স্ত্রী ও আরও এক নারী আহত হন। পরে ভিসি সাইফুল দ্রুত সেখান থেকে কুষ্টিয়া সার্কিট হাউসে চলে আসেন।
ছোট ভাইকে পেটাল পুলিশ : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুয়েট উপাচার্যকে ‘এখন কেন আসছে, এত দেরি করে’ নিহত ফাহাদের ভাই ফায়াজের এমন প্রশ্ন করার সময় পুলিশ তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। ফায়াজ অভিযোগ করে বলেন, আমার গায়ে হাত দিয়েছে। বুকে গুতো মেরেছে। কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান নিজে আমাকে মেরেছে। আমার এক ভাইকে পিটিয়ে মেরেছে, এবার পুলিশ কি আমাকে মারবে? এ ব্যাপারে অভিযুক্ত মোস্তাফিজুর রহমানের বক্তব্য পাওয়া না গেলেও পুলিশ সুপার এসএম তানভীর আরাফাত বলেন, পুলিশ কেন মারবে ফায়াজকে? এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। এ অভিযোগ ভিত্তিহীন।
মোমবাতি মিছিল : নিহত আবরার ফাহাদ স্মরণে মোমবাতি প্রজ্জ্বলন ও মিছিল করেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় বুয়েটের শহীদ মিনার চত্বরে পূর্বঘোষিত মোমবাতি প্রজ্জ্বলন কর্মসূচি শুরু হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা শহীদ মিনার চত্বর থেকে মৌন মোমবাতি মিছিল নিয়ে বুয়েট ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে একই জায়গায় ফিরে আসেন।
আন্দোলনকারীদের ১০ দফা : গতকাল শিক্ষার্থীদের পেশ করা দাবিগুলো হল- (১) আবরার ফাহাদের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সিসিটিভি ফুটেজ ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুসারে শনাক্ত খুনিদের প্রত্যেকের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। (২) সিসিটিভি ফুটেজ থেকে জড়িতদের শনাক্ত করে শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করতে হবে। (৩) মামলার সব খরচ এবং আবরারের পরিবারের ক্ষতিপূরণ বুয়েট প্রশাসনকে বহন করতে হবে। শুক্রবার বিকাল ৫টার মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নোটিস জারি করতে হবে। (৪) দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্বল্পতম সময়ে আবরার হত্যা মামলার নিষ্পত্তি করার জন্য বুয়েট প্রশাসনকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। বুয়েট প্রশাসনকে সক্রিয় থেকে সমস্ত প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং নিয়মিত ছাত্রদের তথ্য দিতে হবে। (৫) আবরার হত্যা মামলার অভিযোগপত্রের কপি অবিলম্বে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। (৬) বুয়েটে ‘সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে দীর্ঘদিন ধরে বুয়েটে হলে হলে ‘ত্রাসের রাজনীতি’ কায়েম করে রাখা হয়েছে। জুনিয়র ব্যাচকে সবসময় ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে রাজনৈতিক মিছিল মিটিংয়ে যুক্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে যে কোনো সময় যে কোনো হল থেকে সাধারণ ছাত্রদের হল থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে হলে হলে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হয়েছে। রাজনৈতিক সংগঠনের এহেন কর্মকাণ্ডে সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ক্ষুব্ধ। তাই ১৫ অক্টোবরের মধ্যে বুয়েটে সকল রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। (৭) বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কেন ৩০ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পরও ঘটনাস্থলে যাননি এবং ৩৮ ঘণ্টা পরে উপস্থিত হয়ে কেন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ করেছেন, কোন তিনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে স্থান ত্যাগ করেছেন, তাকে ক্যাম্পাসে এসে জবাবদিহি করতে হবে। (৮) আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্ন মতাবলম্বীদের ওপর সকল প্রকার শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে এবং এ ধরনের সন্ত্রাসে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব প্রশাসনকে বাতিল করতে হবে। একই সাথে আহসানউল্লাহ হল এবং সোহরাওয়ার্দী হলের পূর্বের ঘটনাগুলোতে জড়িত সকলের ছাত্রত্ব বাতিল করতে হবে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে। (১০) আগে ঘটা এ ধরনের নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ এবং পরবর্তীতে তথ্য প্রকাশের জন্য একটি কমন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কোনো ওয়েবসাইট বা ফর্ম থাকতে হবে এবং নিয়মিত প্রকাশিত ঘটনা রিভিউ করে দ্রুততম সময়ে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বুয়েটের বিআইআইএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হবে। ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি প্রদর্শন করতে হবে এবং পরবর্তী ১ মাসের মধ্যে কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু করতে হবে। নিরাপত্তার স্বার্থে সবগুলো হলের প্রত্যেক ফ্লোরের সবগুলা উইংয়ের দুই পাশে সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যবস্থা করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আবাসিক হল থেকে ছাত্র উৎখাতের ব্যাপারে নীরব থাকা এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হওয়ায় শেরে বাংলা হলের প্রভাস্টকে ১১ অক্টোবর বিকাল ৫টার মধ্যে প্রত্যাহার করতে হবে।
ভিসির পদত্যাগ দাবি শিক্ষক সমিতির : আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। গতকাল দুপুরে সহকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনার চত্বরে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচিতে হাজির হয়ে এ দাবি জানান সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ। তিনি বলেন, উপাচার্যের পদত্যাগের দাবির বিষয়ে শিক্ষক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুয়েটে আগের বিভিন্ন ঘটনায় ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে আজকের এই অবস্থা হয়েছে। আমরা উনাকে এসব ঘটনার জন্য দায়ী করছি। উনাকে বুয়েট থেকে পদত্যাগ করতে হবে। আমরা পদত্যাগ দাবি করছি। উনি যদি পদত্যাগ না করেন, সরকারের কাছে অনুরোধ থাকবে উনাকে যেন অপসারণ করা হয়। এর আগে সকাল ১০টা ধেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত জরুরি সভায় বসে শিক্ষক সমিতি। এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ব্যর্থতার দায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ পুরো প্রশাসনের অপসারণ চেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাক্তন ছাত্রদের সমিতি। সকালে বুয়েট খেলার মাঠে জরুরি বৈঠক থেকে হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচারের জন্য সাত দফা দাবি জানায় বুয়েট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। বৈঠকের পর সমিতির সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর এক বিবৃতিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানান।

x