বুনো: যারা বেড়ে উঠেছিলো বন্যতায়

মাহমুদ আলম সৈকত

মঙ্গলবার , ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১২ পূর্বাহ্ণ
165

মানবশিশু মানুষের সাহচর্যেই বেড়ে ওঠে, বিকশিত হয়। আমাদের বাসযোগ্য পৃথিবীতে এটাই স্বত:সিদ্ধ, স্বাভাবিক। কিন্তু প্রকৃতিতে স্বাভাবিকতার বাইরেও তো কতকিছু ঘটে! সেসব বৈপরীত্যের কতটা আমরা খোঁজ রাখি? তাছাড়া সেই বৈপরীত্য কী প্রকৃতির খেয়ালেই ঘটছে নাকী মানুষের হিংস্রতা, নিষ্ঠুরতা, অবহেলা ইত্যাদিও ‘অন্যরকম মানুষ’ তৈরির জন্য দায়ী? প্রশ্নগুলো জরুরি তবে এইবেলা প্রশ্নগুলোকে সরিয়ে রেখে আমরা জেনে নিই কয়েকজন হতভাগ্য মানুষের কথা, যারা জীবনের একটা সময় কাটিয়েছে বুনো পরিবেশে, যারা বেড়ে উঠেছিলো বন্যতায়, যারা বেঁচে ছিল মানুষেরই নগ্ন পাশবিকতার থাবা মাড়িয়ে। ফেরাল চিলড্রেন বা বন্যতায় বেড়ে ওঠা শিশুদের নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণায় যুক্ত আছেন যুক্তরাষ্ট্রের জুলিয়া ফুলার্টন ব্যাটেন। ২০১৫ সালে তার একটি অভিসন্দর্ভ প্রকাশ পায়। এছাড়াও আরেকজন গবেষক মাইকেল নিউটন লিখেছেন ‘সেভেজ গার্লস এন্ড ওয়াইল্ড বয়েজ: আ হিস্ট্রি অব ফেরাল চিলড্রেন’ নামক বই। তাদেরই দুটি স্বতন্ত্র লেখা অবলম্বনে আজকের এই ফিচার। আজ রইলো সাতটি জীবনের সামান্য কিছু কথা।
মারিনা চ্যাপম্যান, কলম্বিয়া

১৯৫৪ সালের গোড়ার দিকে দক্ষিণ আমেরিকার এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে অপহৃত হয় গ্রামেরই একটি পরিবারের মেয়েশিশু মারিনা চ্যাপম্যান। পরিবারটি নিকটবর্তী পুলিশ ফাঁড়িতে অভিযোগ দায়ের করে, অভিযোগে লেখা হয় – অপহরণের কারণ অজ্ঞাত। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাওয়া যায় না তাকে। বছর গড়ায়। ১৯৫৯ সালের গ্রীষ্মে, সেই গ্রামের বেশ খানিকটা দূরে যে ঘন জঙ্গল আছে সেখানে একদল কাঠুরিয়া কাঠ সংগ্রহে গিয়ে থ বনে যায়! তারা আবিষ্কার করে এক কাপুচিন গোত্রীয় বানর পরিবারের সঙ্গে দিব্যি বসবাস করতে থাকা চার-হাত পায়ে হাঁটা এক মেয়েকে। বানরগুলোর মতোই সে কলা, কন্দ, ফুল-ফলের বিচি খায়। খাবার সংগ্রহের জন্য রীতিমতো বানরের কায়দা অবলম্বন করে। বড় আর মোটা একটা গাছের ফোকরে রাত কাটায়। এমনকী বানরের বিখ্যাত কাজ উকুন বাছার মতো কাজও সে ওদের মতোই করে। কিন্তু বয়স অনুপাতে শরীরটা তেমন বাড়ে নি। অবিশ্বাস্য এই গল্প দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের গ্রামে। উদ্ধার করা হয় মেয়েটিকে। লোকমুখে শুনে মেয়েটিকে দেখতে আসে সেই অপহৃত শিশু মারিনা’র বাবা-মা। এবং বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তারা আবিষ্কার করে যে এই-ই তাদের হারানো মেয়ে মারিনা চ্যাপম্যান। অপহরণকারীরা সম্ভবত তাকে ওই জঙ্গলে ফেলে রেখে যায়। ছয় বছরে তার শরীরটা না বাড়লেও মুখটা যেন মায়ের মুখই খোদাই করা! উদ্ধারের পর থেকে পারিবারের সাহচর্যেই সুস্থতা ফিরে পায় সে। মারিনার বয়স এখন প্রায় ষাট, বর্তমানে ইয়র্কশায়ারে থাকেন দুই কন্যা আর স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে।
শামদেও, ভারত

এনিমেশন চলচ্চিত্র ‘দ্য জঙ্গলবুক’ বা জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘মুগলি’ কিংবা নিদেনপক্ষে ‘টারজান’ যারা দেখেছেন তাদের কাছে শামদেও (বা শ্যাম দেব) চরিত্রটি চেনা ঠেকবে নিশ্চয়। ভারতের উত্তর প্রদেশের ডিব্রুগড়ের গহীন জঙ্গলে ১৯৭২ সালে শামদেও’র খোঁজ পাওয়া যায়। বয়েস তখন আনুমানিক ছয়। গায়ের রঙ প্রায় কুচকুচে কালো, তীক্ষ্ণ দাঁত, বড় বড় ধারালো নখ, জটা চুল, হাত-পায়ের তালু আর কনুই-হাঁটুতে কড়া। নেকড়ের পালের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শিকারের সন্ধানে দৌড়োচ্ছে, দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে লড়ছে। নেকড়ে শাবকদের সঙ্গে খেলায় মাতছে। বন্য মুরগি শিকার করাটা তার পছন্দের। উদ্ধার পাওয়ার পর শামদেও কোনোদিনই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। উদ্ধার হওয়ার পর থেকে মারা যাওয়ার আগ পর্যন্ত কথা বলতে পারতো না সে। নেহায়েত দুয়েকটা দুর্বোধ্য ইশারা করতো। ফলে তাঁর পূর্বাপর জানা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৫ সালে মারা যায় শামদেও।
সুজিত কুমার, ফিজি

এক আট বছরের ছেলে ফিজির ব্যস্ত সড়কে উঁবু হয়ে বসে মুরগির মতো ডানা ঝাপটাচ্ছে আর কুড়কুড় করে ডাকছে! ছুঁড়ে দেওয়া খাবার সে মুরগির মতোই ঠোঁটে খুঁটে খুঁটে তুলে নিচ্ছে। পথচারীরা অবাক হয়ে দেখছে, ভাবছে মানুষ কখনো মুরগির মতো আচরণ করে নাকী? সুজিত কুমার দুর্ভাগা ছিলো, কারণ সে জানতোও না যে সে-ও আর পাঁচটা মানুষের মতোই মানুষ, মুরগি নয়। ১৯৭৮ সালে যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, তার ক’দিন আগেই দাদা মারা গেছে। এবং তারও প্রায় বছর সাতেক আগে চোরাকারবারিদের কোন্দলে বাবা খুন হলে, মা-ও আত্মঘাতি হয়। দাদা ছিলেন মদ্যপ-জুয়াড়ি। শিশুপালন হবে তাকে দিয়ে? পাষণ্ড দাদা ওই বছরখানেকের সুজিতকে পুরে দিয়েছিলো মুরগির খোঁয়াড়ে। পরবর্তী প্রায় সাত বছর সে বেড়ে ওঠে ছোট্ট একটি মুরগির খোঁয়াড়ে, মোরগ-মুরগির সাহচর্যে।
ওক্সানা মালায়া, ইউক্রেন, ১৯৯১

ওক্সানাকে খুঁজে পাওয়া যায় শহরের ভুগর্ভস্থ স্যুয়ারেজ পাইপ লাইনে, কুকুরদের সাথে। ওখানেই সে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বেড়ে উঠেছে শহরের বেওয়ারিশ কুকুরদের সঙ্গেই। একানব্বই সালে তাকে যখন খুঁজে পাওয়া যায় তখন তার বয়স আট। মানুষের সঙ্গে বসবাস না করার ফলস্বরূপ মনুষ্য ভাষা প্রায় বলতেই পারেনা সে, কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এটুকুই। শরীরের গঠনও খানিকটা বদলে যাওয়া, চার হাতে-পায়ে হাঁটে, মাঝেমধ্যেই মৃদু ‘ঘেঁউ’ শব্দ বেরিয়ে আসে, কষ গলে লালা গড়ায়। এক তুষার ঝড়ের হিমঠান্ডা রাতে ওক্সানা’র মদ্যপ বাবা-মা মদের ঘোরে তাঁকে বাইরে ফেলে রেখে যায়। হয়তো উষ্ণতার খোঁজেই ছোট্ট ওক্সানা দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেছিলো, হয়তো ছোট্ট মানুষটাকে উষ্ণতা দিয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছিলো রাস্তার কয়েকটি বেওয়ারিশ কুকুর। তারপর থেকে ওরাই হয়ে ওঠে তার সহচর, বাঁচার অবলম্বন। উদ্ধারের পর, স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হলে সে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে এবং ওডেসা’র এক পশু হাসপাতালে পশু পরিচর্যার কাজে যুক্ত হয়।
জন সেবুইয়া, উগান্ডা

জনের গল্পটা একটু অন্যরকম। সে তিনবছর বয়েসে বাড়ি পালায়, তাদের বাড়ি ছিলো উগান্ডার শহরতলীতে। ঠিক পালানোও বলা যাবে না। ১৯৮৮ সালের মার্চে তার মা খুন হয়। আর খুনের ঘটনাটা সে দেখে ফেলে। তার বাবাই মা-কে সেদিন খুন করেছিলো। লুকিয়ে দেখা সেই ঘটনার পরপরই সে বাড়ি ছেড়ে দিগ্বিদিক দৌড়ুতে শুরু করে এবং জঙ্গলে পথ হারিয়ে ফেলে। জঙ্গলে পথ হারানোর প্রায় চার বছরের মাথায় ১৯৯১ সালে তাকে উদ্ধার করা হয়। এবং তার ভাষ্যমতে একপাল বানরের সঙ্গেই সে চার চারটি বছর কাটায়। তার কথার সত্যতা মেলে তারই বানরোচিত আচরণে। অবশ্য উদ্ধার পাওয়া অন্য শিশুদের মতো সে-ও একসময় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে। বর্তমানে সে পার্ল আফ্রিকান চিলড্রেন কেয়ারের একজন সিনিয়র সদস্য।
ইভান মিশোকভ, রাশিয়া

ইভানের চরিত্রটা সেই হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার চরিত্রের সঙ্গে খানিকটা মিলে যায়। সেই যে, হ্যামিলন শহরের অদ্ভুত বাঁশিওয়ালা বাঁশিতে সুর তুললো আর সঙ্গে সঙ্গে ইঁদুরের পাল চললো তার পিছু পিছু। ইভানও তেমন। সে অবশ্য বাঁশি বাজাতো না, কিছু বিশেষ ইশারা করতো আর ঠিক তখনই রাজ্যের কুকুর তার পিছু পিছু রওনা হতো। জনের মতো ইভানও বাড়ি ছেড়ে পালায়। না, কোনো খুনোখুনি তাকে দেখতে হয়নি তবে বিশাল পরিবারে দারিদ্রের কষাঘাত এতোটাই বিপর্যস্ত করে তাকে যে সে ওই সিদ্ধান্ত নেয়। মাত্র ছয় বছর বয়েসে সে পথে নামে। ভবঘুরের মতো ঘুরতে ঘুরতে, লোকজনের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে খেয়ে দিন কাটাতে কাটাতে কী করে যেন তার বন্ধুত্ব হয়ে যায় রাস্তার কুকুরদের সঙ্গে। সেই বন্ধুত্ব এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে যে সে ওই কুকুরগুলোর সঙ্গে সারাদিন কাটায়, তাদের সঙ্গে ঘুমায় শীত-বর্ষা। এক পর্যায়ে শুধু নিজের খাবারই নয়, কুকুরদের খাবারও সে সংগ্রহ করতে শুরু করে। রাস্তার যত কুকুর আছে, তারা যেন সব ইভানেরই সহোদর! ১৯৯৮ সালে ইভানকে যখন সড়ক থেকে উদ্ধার করা হয়, তখন তার বেশভূষা কিছুই আর মানুষের পর্যায়ে নাই, এমনকী গলার স্বরেও পরিবর্তন এসেছে। মৃদু গরগর শব্দ করে, কুকুরের মতো শুঁকে শুঁকে দেখে সবকিছু। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, কুকুরের পালের কাছে সে যেন সাক্ষাত ‘রবিনহুড’।
মাদিনা ত্রাতা, রাশিয়া

মাত্রাতিরিক্ত মাদকের নেশা, পারিবারিক হিংস্রতা-সহিংসতা, দারিদ্রতা আর অবহেলার মূর্তিমান স্বাক্ষর এই মাদিনা ত্রাতা। ২০১৩ সালে মাত্র চার বছরের মাদিনাকে যখন তাদেরই বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় তখন সে তীব্র ঠান্ডায় মেঝেতে কুুঁকড়ে আছে, শরীরে একরত্তি সুতো নেই, একটানা গোঙাচ্ছে সে, কেবল কয়েকটি কুকুর তার চারপাশে শুয়ে আছে। মাদিনার জন্মের পরপরই তার বাবা মারা যায়। তেইশ বছর বয়সি মা ছিল পাড় নেশাগ্রস্ত। প্রতিদিনই বাইরে থেকে মদ খেয়ে আসতো। আর ঘরে মেয়ে পড়ে থাকতো কুকুরদের আশ্রয়ে। জন্মের পর থেকে উদ্ধার হওয়ার আগ পর্যন্ত সে কোনোদিনই বাইরে পৃথিবী দেখেনি অর্থাৎ ওই চারবছর সে ছিলো গৃহবন্দী। খাবারও জুটতো কুকুরের মতোই, বাইরের ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে আনা হাড়গোড় এইসব। বর্তমানে সে একটি চাইল্ড ফ্রেন্ডলি সেন্টারের তত্ত্বাবধানে আছে, স্কুলে যেতে শুরু করেছে সে।

বি:দ্র: সংযুক্ত ছবিগুলো জুলিয়া ফুলার্টন ব্যাটেন প্রজেক্ট এবং বিবিসি-কালচার এর জন্য তোলা এবং সবাই-ই মডেল। ছবিগুলো মূলত চরিত্রগুলোরই রূপায়ন।

x