বুনো পথে হরিণ মারা ঝরণায়

সমির মল্লিক : খাগড়াছড়ি

সোমবার , ৬ মে, ২০১৯ at ১০:৩৬ পূর্বাহ্ণ
47

নতুন ঝরণা, নতুন ট্রেইল ! ভ্রমণ পাগল মানুষের কাছে এসব নিয়ে বেশ কৌতূহল। বেশ কিছুদিন হয় নতুন ঝরণার খোঁজ করছি। কিন্তু নানা প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈরিপূর্ণ প্রাকৃতিক পরিবেশ ইত্যাদি পরিস্থিতির কারণে সম্ভব হয়নি। অবশেষে দীর্ঘ ট্রেকিংয়ের পর নতুন ঝরণার সন্ধান পেলাম। রাঙামাটির সবচেয়ে উচু ঝরণা, উচ্চতায় প্রায় ১৫০ ফুট। ঝরণার নাম হরিণ মারা।
সকাল থেকেই বৃষ্টি! ঝমঝম বৃষ্টি পুরো পাহাড় তখন প্রায় সাদা। এমনই এক ঘোরলাগা পরিবেশ প্রকৃতিতে। দীর্ঘদিন ধরে নতুন ঝরণার ট্রেইল ধরে হাঁটার ইচ্ছে ,তাই প্রকৃতির বৈরি হাওয়া সত্ত্বেও দিঘীনালা থেকে রওয়ানা হলাম। মোটর বাইকে ক্ষনস্থায়ী ভ্রমণ শেষে পৌঁছাই মূল ট্রেইল। এখান থেকে পুরোটা হাঁটার পথ। বৃষ্টিতে উঁচু ুনিচু পাহাড়ি পথ বেশ পিচ্ছিল। আকাশের রূপ তখনও বেশ মেঘকালো । সময় আর দুরত্বের কথা বিবেচনা নিয়েই দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম ট্রেইলের পথ ধরে। কিন্তু ঘন জঙ্গল আর ধারালো শন পাতা হাঁটার গতিকে মন্থর করে দিল। মন জুড়ানো সব ল্যান্ডস্কেপ-সবুজ পাহাড়ের কোল ঘেষা আদিবাসী বসতি, আদিবাসীরা ফসল বুনন করছে জুমের ক্ষেতে, ছোট ছোট ক্যাসকেট। সবুজ পাহাড়জুড়ে জুম চাষ। বড় বড় বৃক্ষরাজি ! পথ চলতে চলতে কানে আসে বজ্রপাতের গুড়ুম গুড়ুম শব্দ। এমন বর্ষণমুখর দিনে-ঝরণার পথটাই সত্যিই বেশ রোমাঞ্চকর। ট্রেইলের পথ চলতে চলতে স্থানীয় এক আদিবাসী বন্ধুর সাথে দেখা হলে, তার আপ্যায়ণ গ্রহণ করতে হল, তাকেও ট্রেকিংয়ের সাথী করে নিলাম। দূর পাহাড় থেকে কানে আসছে বৃষ্টির আগমনী শব্দ । বোঝা যাচ্ছিল বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা ক্রমশ আমাদের দিকেই আসছে। নিরুপায় হয়ে সবাই ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে একাকার, এই বৃষ্টির মধ্যে আমাদের বিরতিহীন পথ চলা। তবে বৃষ্টিতে পায়ে হাঁটার পথটা ধীরে ধীরে আরো বেশি দূর হয়ে আসছিল এবং ঘন ঢাকা পথে পা কোথায় ফেলছি তাও বুঝাচ্ছিল না। ঘন সুবজের জঙ্গল, জোক এবং কালো মেঘের আকাশে পেরিয়ে ঝরণা কাছেই আসতে ঝরণার শব্দ পেলাম। ঝরণার কাছে পৌঁছাতে মনে হল, দীর্ঘ খাড়া পথ বেঁয়ে নামতে হবে। কিন্তু নামার পথেই যত বিপত্তি, ট্রেইলটা প্রায় ৮০ ডিগ্রি খাড়া । পাথর আর ঘন জঙ্গলের পথটা মাড়িয়ে নামা খুব কষ্টকর ,তাই সাথে থাকা দেশি দা দিয়ে জঙ্গল কেটে কেটে নিচে নামতে হচ্ছে। বৃষ্টির কারণে পথের ঝুঁকিটা আরো বেড়ে গেল। পাথরের খাঁজ ধরে এমন পাহাড়ি ট্রেইলে নিচে নামা রোমাঞ্চের বিপরীতে ভয় ছিল বেশী। ট্রেইলের ঘন জঙ্গলের ভিতরে নামতে নামতে চোখে পড়ে বিশাল ঝরণার ধারা। অতিবৃষ্টির কারণে ঝরণায় পানির গতি ছিল খুব বেশি। কলকল ঝরণার তীব্র ধ্বনি ! প্রায় ১৫০ ফুট উপর থেকে বেয়ে পাথরের পথ বেয়ে নেমে আসছে ঝরণার স্রোত। ঝরণার ঢাল বেয়ে নেমে আসা জলের স্রোত মিশেছে ঝিরিতে। পাহাড়ের প্রাচীন পাথর বেয়ে সাদা রেখার নিচে নেমে আসছে ঝরণার স্রোত। সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে ঝরণা থেকে ফেরার পালা, প্রায় অন্ধকারের ট্রেইল ধরে আবার হাঁটার পথ শুরু।
প্রয়োজনীয় তথ্য; ঢাকা থেকে সরাসরি বাসযোগে খাগড়াছড়ি অথবা দিঘীনালা পৌঁছানো যায়। দিঘীনালা বাসটার্মিনাল থেকে মোটরবাইক বা চাঁদের গাড়ি করে ১০ নাম্বার নামক জায়গায় নেমে, পাহাড়ি ট্রেইল ধরে পায়ে হেঁটে ঝরণায় পৌঁছানো যাবে। ঝরণা প্রকৃতির এক অসাধারণ সৌর্ন্দয্য। ঝরণা দেখতে গিয়ে এর আশে পাশে কোন প্ল্যাস্টিক, বোতল, প্যাকেট ফেলে ঝরণাকে নোংরা করবেন না ।

x