বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার

ড. মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন

শনিবার , ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৮:০২ পূর্বাহ্ণ
488

আমি যখন এই লিখাটি শুরু করেছি ঠিক তখন এসএসসি ২০১৮ বাংলা ১ম, বাংলা ২য়, ইংরেজি ১ম, ইংরেজি ২য়, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয় সমূহের পরীক্ষা শেষ হয়েছে। কি দুর্ভাগ্য? অবাক। আমার মনে প্রশ্ন এই দেশটা আসলে কোন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে? জীবনের শুরুতে একজন দুর্নীতিবান মানুষরূপে সন্তানদের প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা নিজের অজান্তে আমরা কেন করে চলেছি? গত বছরগুলোর চেয়ে এবারের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস যেন নিয়মে দাঁড়িয়েছে। সুখের সংবাদ ফাঁসের সাথে জড়িত কেউ না কেউ প্রতিদিন আটক হচ্ছে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ২০ লাখের অধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। পরীক্ষা শুরুর আগেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোন কোনভাবে প্রশ্নপত্র আগে থেকেই ছড়িয়ে পড়ছে। পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে যেটি হুবহু মিল। শিক্ষামন্ত্রী ফাঁসকারীদের ধরিয়ে দিলে ৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছেন। প্রশ্ন ফাঁস হলে পরীক্ষা বাতিল হবে ঘোষণা থাকলেও পরবর্তী সময়ে একটি কমিটি গঠন এবং কমিটির সুপারিশের আলোকে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ব্যংক, মেডিকেল পরীক্ষার সাথে শিক্ষামন্ত্রী সংশ্লিষ্ট নয়, সেখানে কারা প্রশ্নফাঁস করছে?

চারদিকে পরীক্ষার নামে ছোটদেরও দুর্নীতির কাছাকাছি পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। শুধু পাবলিক পরীক্ষা নয়। একেবারে প্রাইমারীও। তাও আবার ১ম, ২য় ও ৪র্থ শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর আমরা শুনেছি। বরগুনা সদর ও বেতাগী উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস। দুদক বলছে শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্টরাআর মন্ত্রী বলছেন শিক্ষকদের কথা। ৪র্থ শ্রেণির প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িত। আজব এতদিন মন্ত্রী, এমপি সবাই বলেছে ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথে পরীক্ষার প্রশ্নের কোন মিল নাই। এবার কিন্তু মিলে গেছে। পরীক্ষার প্রশ্ন আর ফাঁস হওয়া প্রশ্নের সাথেও অমুক অমুক দল জড়িত। আজব খবর হচ্ছে বরগুনা সদর উপজেলার মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২৫৫টি।

পাশের বাসার ভাবীর ছেলেটি অমুক স্কুলে আমারটাও তমুক স্কুলে পড়তে হবে না হয় মান যায়। এই প্রথার কারণে ছেলে মেয়েরা রাতদিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে পড়তে পড়তে। অপরদিকে বাবারা সন্তানকে টাকা দিয়ে ভর্তি করানোর প্রবণতার সাথে সাথে প্রাইমারীর একজন কচি মানুষকে দুনীতির পথে এগিয়ে দিচ্ছে। ভয়ানক এক প্রতিযোগিতা। ভয়ানক এক অন্ধকার। আর এই অন্ধকার প্রথম আসছে অভিভাবকের কাছ থেকে। তারপর শিক্ষক। তারপর শিক্ষার সাথে যুক্তরা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার যে পচন সেটি অনেক পুরনো। এই অন্ধকার অনেক পেছনের। এই গলদ অনেক আভিজাত্যের। এ+ পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রতিটি মা বাবা যা শুরু করে দিয়েছে এর শিকার আদরের কচিমন আগামীর স্বপ্নবাজরা। কাকে বুঝাই। কাকে বলি। বিগত দেড়যুগেরও বেশি সময় নিয়ে এই বিষয়ে গবেষণা, পড়ালেখা, কথা বলতে গিয়ে এখন রীতিমত অন্ধকার দেখি। ছাত্রদের উপর পরীক্ষা, ব্যবহারিক প্রতিবছর চলছেই। শেষ কোথায়?

৪ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহের গফরগাঁও আমাদের অভিভাবকদের কাণ্ড নিশ্চয় সংবাদে পড়েছেন? সেখানে পরীক্ষা শুরুর আগে অভিভাবক সন্তানকে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন থেকে উত্তর বের করে হলে পাঠান। আদরের এ+ পাওয়া সন্তান সে উত্তর হুবহু লিখে দিয়ে চলে আসে। পরীক্ষা শেষে দেখে প্রশ্ন মিলেনি। সন্তানরা অভিভাবকের দেয়া বৃত্ত যথাযথ ভরাট করে দিয়ে চলে আসে। তারপর শুরু আন্দোলন। কেন্দ্র সচিবকে বাধ্য করতে থাকে আবার পরীক্ষা নেয়ার। কেন্দ্র সচিব জানিয়ে দেন উত্তর পত্র সীল করা হয়ে গেছে। আর সম্ভব না। আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে দুষি। সরকারকেও। শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্নফাঁস হয়নি, নীতিহীন শিক্ষকরাই দায়ী এইসব বলে শেষ করতে চেয়েছিলেন। এবার আর তা পারেননি। এবার কম্বলটা চলেই গেছে। আসলে আমরা সবাই কম বেশি এই কাজটি করে চলেছি। অজানা। আমাদের শিশুদের বেড়ে উঠার জায়গাটা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে উঠছে। নানা কারণে তার পুরো পৃথিবী আজ মাবাবা, কম্পিউটারমোবাইলে সীমাবদ্ধ হতে চলেছে। ব্যস্ত মাবাবা। এ+ প্রাপ্তি। সরকারি স্কুলের ভর্তি যুদ্ধ। পড়ালেখা নিয়ে যে পরিমাণ সময় দিতে হয় শিশুদের তাতে পৃথিবী নিয়ে জানার বা প্রকৃতি দেখার সময় তাদের হাতে নাই। দরকার একটি মানসম্মত শিক্ষা কারিকুলাম। দরকার শিক্ষায় বিনিয়োগের টাকার যথাযথ ব্যবহার। দরকার সকল শ্রেণিকে শুধু রেজাল্ট নয়শিক্ষা ও জ্ঞানার্জনে আগ্রহী করে তোলা। তাহলে কেবল এইসব প্রবণতা রোধ হবে।

আমরা সব বাবামায়েরা চাই সন্তানটি হবে সেরা। যে সন্তান বড়দের মানবে, ছোটদের দেখবে। সমাজকে আলোকিত করবে। সন্তানের এইসব দেখে বুকটা অনেক বড় হয়ে যাবে। চাওয়াটা প্রত্যেক পিতামাতার একই রকম। খুবই ক্ষুদ্র। কিন্তু চাওয়ার পদ্ধতিগত ভুলের কারণে আমার এই ছোট্টজীবনে অনেক সন্তানের জীবন শুরুর আগেই শেষ হতে দেখেছি। কারো সন্তান সেরা হয়েছে আর কারোটি অন্ধকারের পথটিকে সেরা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণের গভীরে গেলে দেখা যায় বাবামায়ের ভুল আদরের পরিণতি কারোটি নামী আর কারোটি অজানা। একসময় পিতামাতা, শিক্ষক, বড়ছোট সকলের অনুশাসনে আমরা দেখে শিখেছি। আমরা মেনেছি। আমরা মানতে অনেক সময় বাধ্যও হয়েছি। আজকাল সব যেন অন্যরকম হয়ে গেছে। কেউ আর কাউকে মানতে চায় না। সমাজের প্রতিটি স্থানে কেমন যেন অজানা অস্থিরতা। অজানা ভয়। সকলে সমাজের এইসব অনুশাসনকে এখন সেকেলে বলে তুচ্ছ করে। কিন্তু আজকেরটি?

সন্তানকে ভালবাসার নাম করে আমরা কতই না ভুল করে চলেছি প্রতিদিন। শিক্ষকের প্রতি আচরণে, বড়দের প্রতি আচরণে সবসময় আমরা কেন জানি অনেক অন্যরকম হয়ে গেছি। আর এইসব দেখে শিখছে আগামীর স্বপ্নময় পৃথিবীর সুন্দর মানুষগুলো। সব জায়গায় ক্ষমতার পাগলা ব্যবহার চলছে। সবসময় নিজেকে জাহির করার প্রতিযোগিতায় বড়রা, ছোটরা আমরা সবাই। আমিই সব। এই ধারণা থেকে জন্ম নিচ্ছে হাজারো অস্থিরতা। শিক্ষক এখন আর ছাত্রদের শাসন করতে পারেন না। এজন্য কতিপয় শিক্ষকও কম দায়ী নয়। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর দায় সমাজের বিচ্ছিন্ন সব ঘটনা। সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি। আসুন সবাই মিলে এই অবস্থার উন্নয়নে কাজ করি। আদরের সন্তানটি যেন কোন ভুল পথে পরিচালিত না হয় সেদিকেই আমাদের সকলের যাত্রা শুরু হউক। শিক্ষকের হাতেই দিন মানুষ করার সকল কৌশল। অন্যথায় সে যে পথে যাবে কেউ ঠেকাতে পারবে না। আমার একবন্ধু কয়েকদিন আগে আমার লেখায় মন্তব্য করেছেন এভাবে, ‘আমরা তাদের শৈশব ছিনতাইকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছি।’ এখানে তাদের বলতে আগামী প্রজন্মের কথা তিনি বলেছেন। আসলে তাই। আসুন সবাই মিলে আগামী দিনের বাংলাদেশ আমাদের আদরের সন্তানদের বাঁচাইতাদের শিক্ষাজীবনকে বাঁচাই।

অনেক বড় চিন্তা থেকেই শিক্ষকতার মত এমন সুন্দর পেশাকে বেছে নিয়েছিলাম। লোভ লালসার দিকে নয়প্রকৃত মূল্যবোধ শিখানোর জন্যই এসেছিলাম। অর্থের মোহ কোন কালেই ছিল না। তৈরিও করেছিলাম হাজারো প্রকৃত শিক্ষার্থী। যারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইদানিং বাবামা আর অভিভাবক হতে পারেন না। সব সময় বাবামা থেকে যান। যার কারণে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছি। তবুও হতাশ নই। আশা নিয়েই বেঁচে থাকাটাও বড় সার্থকতা। আমি আশা নিয়ে বাঁচতে চাই

এমন এক সংকুচিত পৃথিবীর মানুষরা আগামী দিনের দেশেরবিশ্বের নায়কের ভূমিকা কিভাবে নিবে একথা ভাবতেই মনে হয় একটা ভঙ্গুর পৃথিবীর মুখোমুখি আমাদের হতে হবে সহসা। তবুও হতাশ না হয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণায় সামনে তাকাতে চাই। শিশু শিক্ষার এই জায়গাটা সবার কাছে সব সময় অপরিস্কার। আমরা যখন পড়তাম তখনও ৯ম শ্রেণিতে গিয়ে অভিভাবক পড়ার চাপ দিতেন। এখন পড়া নয় প্রশ্নপত্র, সাজেশন, গাইড ও প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে কিনা অভিভাবক তা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। আর এইসকল কাজের সাথে যুক্ত শিক্ষক, শিক্ষার সাথে যুক্ত ব্যক্তিগণ। সন্তানদের সাথে যে প্রতারণা অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার সাথে জড়িতরা করে চলেছেন তার পরিণতি কি? এই পরিণতির বা শেষ কোথায়। প্লিজ এবার এইসব থামান। অত্যাচার বন্ধ করে প্রতিবছর নতুন ধরনের কারিকুলাম চালু না করে একটা সুন্দর জায়গায় আসুন। প্রাইমারীতে ঢুকে পড়া প্রশ্নফাঁসকারী সকল শ্রেণির জন্য মন থেকে অভিশাপ দিই। হেদায়েত কামনা করি। কারণ আমি অক্ষম। কাকে বলব। কেউ মনোব্যথার কারণ বুঝবে না।

সংসদে নামমাত্র যে বিরোধীদল রয়েছে তাঁরা কোন বিষয়ে কথা না বললেও প্রশ্ন ফাঁস নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন। দেশের অনেক অশুভ সংবাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে এই খবরটি অনেকের কাছে অনেক শুভ মনে হলেও আমি খুশী হতে পারিনি। একটি পরীক্ষা শুধু একটি জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যায় না। জাতির মেধাবী সন্তান থাকতে হয়। কিন্তু বিরোধীদলের নেতা একটি প্রশ্ন করেছেন, সেটি ছিল আমার কাছে অনেক গ্রহণযোগ্য ও সুন্দর মনে হয়েছে। কথাটি ছিল, ‘আমরা কার হাতে দেশটি দিয়ে যাব?’ চমৎকার? অসাধারণ বোধ। আমাদের পরিচ্ছন্ন শিক্ষামন্ত্রী এবার অবাক করা বিষয়ও ফাঁস করেছেন। তিনি বলেছেন আপনারা ঘুষ খান তবে…….??

কোন কোন সাংসদ আবার এই কথাটিতেও দারুণ অখুশী হয়ে মন্ত্রীর পদত্যাগ চেয়েছেন। তবে মনে রাখবেন এভাবে বেশিদিন চললে আসলে আগামী প্রজন্ম সত্যি অন্ধকারে চলে যাবে। আসুন প্রজন্মকে বাঁচান। ঐ অন্ধকারের মানুষ গুলোকে বলি তথাকথিত এ+ এর পেছনে দৌঁড়ালেও জাতি অন্ধকারে চলে যাবে। জাতিকে বাঁচানোর জন্য সকলের শুভবুদ্ধি দরকার। শুধু মন্ত্রী একা নয়প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে জাতিকে বাঁচানোর। এরশাদ আমলে শ্লোগান ছিল, ভোট হয়েছে যেভাবে পরীক্ষা দেব সেভাবে। এখনও কি তাই বলব। ভোট কেন্দ্র যাব না, কিন্তু এমপিপ্রধানমন্ত্রী হবই। পরীক্ষা হলে যাব না+দিতে হবেই। হায়রে সোনার বাংলাদেশ। আমি চিৎকার করে কাঁদিতে চাহিয়া করিতে পারিনি চিৎকার; বুকের ব্যথা বুকে চাপায়ে নিজেকে দিয়েছি ধিক্কার। ক্ষমা কর সন্তানরা।

x