বীর প্রতীক তারামন বিবি

তারামন বিবি তখনও তাঁর ‘বীর প্রতীক’ খেতাবের কথা জানেন না। দিনটি ছিল ৫ নভেম্বর, ১৯৯৫। পরদিন ৬ নভেম্বর পরিমল পৌঁছুলেন সেখানে। কি দেখলেন তিনি? কাকে দেখলেন? ছেঁড়া শাড়িতে যক্ষাক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা খুক খুক করে কাশছেন এবং ঢেঁকিতে অন্যের ধান ভানছেন। তিনি ছবি তুললেন। পোস্ট অফিসের খামে রিপোর্ট পাঠালেন। কুড়িগ্রামে তখনও কোনও ফ্যাক্স মেশিন ছিল না।

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:০৯ পূর্বাহ্ণ
57

বিজয়ের মাসে কুড়িগ্রামের মাটির তারা তারামন আকাশের তারা হয়ে গেলেন। আমাদের স্বাধীনতা যাঁদের মহান দান তিনি তাঁদেরই একজন।’ দেশের জন্য ৭১’ এর রণাঙ্গনে যাঁরা মরণপণ যুদ্ধ করেছেন এবং আমাদের জন্য বিজয়ের মাস ডিসেম্বর যাঁদের উপহার তিনিও তাঁদেরই একজন। আর বিজয়ের ৪৮ তম ডিসেম্বরে দেশের মাটি শুধু নয় পৃথিবীর মায়া কাটালেন বিজয়িনী তারামন।
১৪ বছরের এক হাড়-জিরজিরে কিশোরীর সাহস ও বীরত্বের গল্প বা তার পেছনে যে গল্প সবটাই যেন রূপকথার গল্প। কুড়িগ্রাম জেলার জঙ্গলাকীর্ণ দুর্গম এক গ্রাম শঙ্কর মাধবপুরের এক দরিদ্র মা কুলসুম বিবি চার-চারটি সন্তানের খাবার জোটাতে হিমসিম খান। ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে দোরে দোরে দাঁড়াতেও হয় তাঁকে। শাক-লতাপাতা, শামুক গুগলি কুড়োনোর বয়স কন্যা তারামনের। একদিন সে গেছে জঙ্গলে কচুমুখী তুলতে। (আশিক মোস্তফার সমকাল, ৮ ডিসেম্বরের লেখা থেকে ধার করা) বাবার বয়সী একজন কাছে এসে জানতে চান সে ভাত রাঁধতে পারে কিনা। পারলে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে চলুক। ওই মানুষটিকে নিয়ে সোজা মায়ের কাছে নিয়ে আসে তারামন। তারপর চলে যায় ক্যাম্পে। সেখানে তারামন কি শুধু ভাত রেঁধেছে? কোন কাজটি তাকে করতে হয় নি বা সে না করেছে? সে তো তখন পোস্ট মাস্টার গল্পের রতন। অস্ত্র পরিষ্কার করতে গিয়ে অস্ত্রের গায়ে হাত বুলাতে বুলাতে ধর্মপিতা হাবিলদার মুহিবের কাছে আবদার জানাতে তার একটুও দ্বিধা সংকোচ হয় না। সে অস্ত্র চালনা শিখবে। শিখেছে। হাতে-কলমে দেখতে দেখতে, চলতে চলতে, যুদ্ধে সামিল হতে-হতে। বাইনোকুলার হাতে তরতর করে শুপারি গাছ বেয়ে উঠে দূরে গানবোটে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ করে দলকে সফল অপারেশনের কৃতিত্বের দাবিদার করেছেন তারামন বিবি। গায়ে মনুষ্যবর্জ্য মেখে পাগলী সেজে রেকি করার এবং মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে ক্যাম্পে খবর পৌঁছে দেবার কৃতিত্বের গল্প তাঁরও আছে।
মাধবশঙ্করের আশে-পাশে সাজাই, কোদাল বাটি, রাজীবপুর মদনের চর, তারাবর, চর নেওয়াজী এবং গাইবান্ধা এলাকায় ঘুরে ঘুরে, কেটে গেল ন’টি মাস। তারামন ফিরে গেছে মায়ের কোলে। তাকে আর কারও মনে রাখার বা খুঁজে পাবার কোনও কারণ ছিল না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রায় সিকি শতাব্দী পরে তাঁকে ফিরে পাওয়া, সে আরেক গল্প।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকে গেছে। ১৯৭২ সালে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের খেতাব প্রদান অনুষ্ঠানে তারামন বিবির অনুপস্থিতি কোনও মহলে কোনও প্রশ্নের উদ্রেক করেনি কেন? বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত দু’জন নারী মুক্তিযোদ্ধার একজন ডা. ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম সেদিন সম্মান গ্রহণ করেছিলেন।
দেশের প্রতিটি এলাকার মতো রাজীবপুর থানায়ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছিল, ছিলেন সংসদ কমান্ডার। অন্তত ’৭৩ এ প্রকাশিত সরকারি গেজেটে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম ঠিকানাসহ পূর্ণ তালিকা থাকার কথা নিশ্চয়ই ছিল। সত্যিকারের আত্মত্যাগ বা অবদান যে বৃথা যায় না তারামন বিবির খেতাবপ্রাপ্তি সে প্রমাণ বহন করে। কিন্তু কেউ তাঁর খোঁজ নেন নি। তিনি তো বীরাঙ্গনা ছিলেন না। এদেশের সেই ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে কুঁকড়ে থাকা নারীরা তখন পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসে শুনতেন বা শুনতে হতো তাঁদের যে তাঁদের নামের পাশে স্বজনদের কোনও টিকচিহ্ন পড়েনি। অথচ প্রচুর অভিভাবকের ভিড় হতো সেখানে। তবে কি নাম না খুঁজে পাবার স্বস্তির আশায় সেখানে ছুটতেন তাঁরা? ভর্তুকী বা সাহায্যের আশায় অযাচিত আত্মীয়তার সূত্র ধরে কেউ সেখানে যাননি এমনও নয়। কিন্তু বীরাঙ্গানারা সেসব ডাকে সাড়া দেন নি। অনেকে অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া শ্রেয় মনে করেছেন। তারামন খেতাব পেয়েছেন বা নিয়েছেন ২৪ বছর পরে। ততদিনে দেশ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের অবিশ্বাস্য খেলায় মেতেছিল। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সে খেলা শুরু হয়েছিল। তারামনের জীবনেও বয়ে গেছে ঝড়, একের পর এক। দরিদ্র, নিঃস্ব আবদুল মজিদের সঙ্গে তৃতীয়বারের মতো ঘর বেঁধেছেন তিনি। কোলে এসেছে সন্তান। পুত্র-কন্যা নিয়ে অনাহারে, অর্ধাহারে ক্ষয় রোগের শিকার তিনি।
এ গল্পটি শোনাবার জন্য পরিমল মজুমদারের ‘বিশেষ লেখা’টির দ্বারস্থ হচ্ছি। সমকাল ২ ডিসেম্বরের পাতায় পরিমল লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রক্ষমতায় স্বাধীনতা বিরোধীদের প্রভাব তখন প্রবল। মুক্তিযোদ্ধাদের দুর্দিন। মুক্তিযোদ্ধা বলে নিজেকে পরিচয় দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন, অথচ জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করেছিলেন তারা। কেউ অনাহারে, কেউ অর্ধাহারে মারা যাচ্ছেন। কেউ বা করছেন ভিক্ষা। ঠিক এমন দিনে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজের সহযোগী অধ্যাপক বিমলকান্তি দে পরিমল মজুমদারসহ রাজীবপুরে বিভিন্ন জনকে চিঠি লেখেন। তারামনসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান চান তিনি। এরই মধ্যে রাজীবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙের একজন চিকিৎসকের কাছে যক্ষ্মারোগী তারামনের খোঁজ পাওয়া যায়। এ খবরের সূত্র ধরে রাজীবপুর কলেজের সহকারী অধ্যাপক আবদুস সবুর ফারুকী এবং স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান আলীসহ বিমলকান্তি দে স্বয়ং হাজির হন তারামনের বাড়িতে। তারামন বিবি তখনও তাঁর ‘বীর প্রতীক’ খেতাবের কথা জানেন না। দিনটি ছিল ৫ নভেম্বর, ১৯৯৫। পরদিন ৬ নভেম্বর পরিমল পৌঁছুলেন সেখানে। কি দেখলেন তিনি? কাকে দেখলেন? ছেঁড়া শাড়িতে যক্ষাক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা খুক খুক করে কাশছেন এবং ঢেঁকিতে অন্যের ধান ভানছেন। তিনি ছবি তুললেন। পোস্ট অফিসের খামে রিপোর্ট পাঠালেন। কুড়িগ্রামে তখনও কোনও ফ্যাক্স মেশিন ছিল না। ১৪ দিন পরে ২১ নভেম্বর ভোরের কাগজের ‘এই জনপদ’ পাতায় খবরটি ছাপা হয়। শিরোনাম আসে, ‘বীরপ্রতীক খেতাবধারী মহিলা মুক্তিযোদ্ধা তারামনের সন্ধান মিলেছে।’
এ খবর উবিনীগ ও নারীগ্রন্থ প্রবর্তনার ফরিদা আখতারের মনোযোগ শুধু নয় তাঁর মনও কাড়ে। তিনি নিজে ছুটে যান এবং তারামন বিবিকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। এ খবরের সূত্রে বিবিসির তৎকালীন সাংবাদিক আতাউস সামাদ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বীর প্রতীক খেতাবের মেডেল পরিয়ে দেওয়া হয় তাকে। সঙ্গে ২৫ হাজার টাকা। তারামন কিন্তু সেদিন নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন, আমাকে যেমন ডেকে এনে সম্মান করলেন, দেশের সব মুক্তিযোদ্ধাকেও এমন সম্মান দেবেন। দু’বেলা তাঁরা যেন খেতে পান।

ততদিনে সকলে জেনে গেছেন ভোরের কাগজের সম্পাদক মতিউর রহমানের উদ্যোগে তহবিল গঠন করা হচ্ছে তারামন বিবির জন্য।প্রায় আড়াই লক্ষ টাকায় তাঁর মাথা গোঁজার ঠাই এবং কিছু জমি-জিরেত হয়েছে। পরিমল মজুমদারের ‘বিশেষ লেখা’ থেকে কিছু কথা শোনালাম। এবারে সে বছর তৎকালীন ‘দৈনিক বাংলার’ ফিচার পাতা থেকে রফিকুল ইসলাম রতনের ‘মহিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান স্বীকার না করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে’। শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে খানিকটা উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখেছেন ‘তাঁর (তারামন বিবির) এই কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ১৯ ডিসেম্বর তাঁর গলায় নিজহাতে পরিয়ে দেন বীরপ্রতীক পদক। সরকারি খরচে তাঁর চিকিৎসার জন্য নির্দেশ দেন। নিজ বেতনের টাকায় তারামনের ছেলে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালানোর ঘোষণা করেন। নিজ তহবিল থেকে ২৫ হাজার টাকা প্রদানের কথা ঘোষণা করেন। হস্তান্তর করেন মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের দেয়া ২৫ হাজার টাকার চেক। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি আমাদের নারী সমাজের গর্ব।’ তারামন বলেন, ‘যুদ্ধ কইরা দ্যাশটা আইনা দিছি, দ্যাশটারে আপনারা ধইরা রাইখেন।’
আমরা জানি না তারামন বিবি যথাযথ চিকিৎসা পেয়েছিলেন কিনা। একাধিকবার তাঁকে সিএমএইচে চিকিৎসাধীন থাকার বা রাখার কথা শুনেছি। মাত্র ৬২ বছর বয়সে সিওপিডি রোগের শিকার থেকেই যেতে হয়েছে তাকে। তাঁর সন্তানেরা লেখাপড়া শিখেছে কিনা তাও জানা নেই আমাদের। মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্রকে আবেদন জানাতে শুনেছি যাতে মাকে দেওয়া সাহায্য তাদের ক্ষেত্রেও চালিয়ে যাওয়া হয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি আর নেই। তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাতে গিয়ে সৈয়দ আবুল মকসুদ লিখেছেন “তিনি যদি একাত্তরের ডিসেম্বরে মারা যেতেন, লাখ লাখ শহীদের মতো আমরা তাঁর নাম জানতাম না। বেঁচে থাকলেও জানতাম না যদি তিনি ‘বীর প্রতীক’ খেতাব না পেতেন। এমনকি খেতাব পাওয়ার পরেও তিনি থাকতেন অজ্ঞাত, যদি না মিডিয়া তাঁকে খুঁজে বের করত। তারামন বিবিকে কুড়িগ্রামের একটি জনসভায় সৈয়দ আবুল মকসুদ (বিশিষ্ট ব্যাংকার খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদসহ) পেয়েছিলেন। শ্রোতাদর্শক সারি থেকে তাঁরা তাঁকে মঞ্চে তুলে নেন। কিছু বলার জন্য অনুরোধ করা হলে তারামন বিবি আঞ্চলিক বাংলায় তাঁর পরিষ্কার উপলব্ধি ব্যক্ত করেছিলেন। সৈয়দ মকসুদ লিখেছেন ‘তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতায় দলীয় রাজনীতি ছিল না। ব্যক্তি-বন্দনা, গোত্র-বন্দনা ছিল না। নিজের কৃতিত্বের কথা ছিল না। দেশ সম্পর্কে তাঁর যে অনুভূতি, তার প্রকাশ ছিল সাবলীল। বোঝা গেল, খ্যাতি তাঁর মধ্যে প্রবল আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।’

x