বীর চট্টলা মূকাভিনয় উৎসব ২০১৯

তামিমা সুলতানা

বৃহস্পতিবার , ১৪ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ
11

মূকাভিনয়ের রাজধানী চট্টগ্রাম, এটা একটা স্বীকৃত সত্য আজ বাংলাদেশে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের মূকাভিনয় চর্চায় সমূহ যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও কার্যক্রমের যাত্রা হয় এই চট্টগ্রাম থেকে। এরই ধারাবাহিকতায় প্লাটফর্ম মনোমাইম বাংলাদেশের যাত্রার শুরু। একক মূক-প্রযোজনা বা মনোমাইম মূকাভিনয়ের একটি শক্তিশালী ধারা। দীর্ঘদিন ধরে এ ধারায় চর্চা চালিয়ে আসা বাংলাদেশের চারজন প্রতিষ্ঠিত মূকাভিনেতার প্রযোজনা প্রদর্শনের মাধ্যমে প্লাটফর্ম মনোমাইম বাংলাদেশ এর কার্যক্রম শুরু হল। গত ১ ও ২ মার্চ চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বীরচট্টলা মূকাভিনয় উৎসব ২০১৯’শীর্ষক দুই দিনব্যাপি এই আয়োজনে একক মূকাভিনয় প্রদর্শনের পাশাপাশি দেশের দু’জন নারী মূকাভিনেতাকে সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে প্লাটফর্ম মনোমাইম বাংলাদেশের পক্ষে। যারা দীর্ঘ দিন যাবৎ নানা প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের মূকাভিনয় চর্চা করে আসছেন, তারা হলেন চট্টগ্রামের অনাদিকল্পের সাদিয়া আফরীন এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশানের মৌসুমি মৌ। বর্তমানে অনেক নারীই এই শিল্পচর্চায় আগ্রহী হয়ে আসছেন। এই সম্মাননা তাদেরকে নিয়মিতভাবে মূকাভিনয় চর্চায় অনুপ্রাণিত করবে বলে আয়োজকরা বিশ্বাস করেন।
সম্মাননা প্রাপ্তি প্রসঙ্গে সাদিয়া বলেন, ২০১১ থেকে মূকাভিনয় শুরু করে এখন পর্যন্ত যে পরিশ্রম করেছি তার স্বীকৃতি কাজের মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়ে বহুবার পেলেও এই সম্মাননা সেই স্বীকৃতিকে পূর্ণতা দিয়েছে। পাশাপাশি মূকাভিনয় নিয়ে কাজের আগ্রহ ও দায়বোধ বাড়িয়ে দিয়েছে। মূকাভিনয় নিয়ে যে আকাঙ্ক্ষা ও পরিকল্পনাগুলো আমার আগে হয়নি তা আজকের পর থেকে আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে নতুন করে ভাবাবে। প্লাটফর্ম মনোমাইম বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা আমাকে মূল্যায়ন করার জন্য।সম্মাননা প্রাপ্তি প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, সম্মাননা প্রাপ্তির যে আনন্দ তা কখনোই শব্দচয়ন বা কথায় ব্যক্ত করা যায় না। মূকাভিনয় আমার প্যাশন আমার ভালোবাসা আমার স্বপ্নের জায়গা। আমি মনে করি মূকাভিনয়ে আমার যাত্রা কেবল শুরু। এখনও বহুদূর যেতে হবে। এই সম্মাননা প্রাপ্তি আমার দায়িত্ব আরো বাড়িয়ে দিলো। বীর চট্টলা’র মূকাভিনয় উৎসবের আয়োজক প্লাটফর্ম মনোমাইমের প্রতি অগাধ কৃতজ্ঞতা আমাকে এই সম্মানে ভূষিত করার জন্য।
দুই দিন ব্যাপি এই আয়োজনে বাংলাদেশের প্রথমসারির চার জন মূকাভিনেতা তাদের একক মূকাভিনয় প্রদর্শন করার কথা থাকলেও জেন্টলম্যান প্যান্টোমাইমের রাজ ঘোষ ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে উৎসবে উপস্থিত হতে পারেন নি। মূকাভিনয় পরিবেশন করেছেন প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের রিজোয়ান রাজন, অনাদিকল্পের মাসউদুর রহমান ও দ্য ম্যামার এর মূকাভিনেতা শহিদুর বশর মুরাদ। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের শিল্পচর্চায় প্রতিষ্ঠিত এবং বাংলাদেশের মূকাভিনয় চর্চায় খুব গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
উৎসবে প্রথম দিন মূকাভিনয় পরিবেশন করেন মূকাভিনয় শিল্পী রিজোয়ান রাজন। তিনি তার সাইলেন্স ইম্পসিবল প্রযোজনা থেকে চারটি নক্সা মূকাভিনয় উপস্থাপন করেন। নক্সা মূকাভিনয়গুলো হলো কিলার, স্টোন, লিচু চোর ও দ্য ম্যাজিশিয়ান। আত্মবিশ্বাসের সাথে রিজোয়ান তার মূকাভিনয়গুলো পরিবেশন করেন। দ্য ম্যাজিশিয়ান পরিবেশনার সময় শিল্পীর সাথে দর্শকের সেতু বন্ধন রচনা হয়। ম্যাজিশিয়ানের কর্মকাণ্ডে দর্শকরা সরাসরি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। রিজোয়ানের অপর পরিবেশনাগুলোও দর্শক শ্রোতারা সানন্দচিত্তে গ্রহণ করে।
শেষ দিন মাসউদুর রহমান ও শহিদুল বশর মুরাদ এর মূকাভিনয় প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে উৎসবের যবনিকা ঘটে। এদিন মাসউদুর রহমান তার হ্যাপি মোমেন্টস প্রযোজনা থেকে তিনটি নক্সা মূকাভিনয় পরিবেশন করেন। মূকাভিনয়গুলো হলো- নটি বয়, ব্লাইন্ড বেগার ও হাঙরি সিংগার। জীবন থেকে উঠে আসা গল্পগুলো খুব সহজেই দর্শক হৃদয় ছুঁয়ে যায়। বিশেষ করে ব্লাইন্ড বেগার মূকাভিনয়টি এতটাই দৃশ্যমান অভিনয় হয়েছে যে শিল্পী মাসউদুর রহমান প্রকৃত অর্থেই চরিত্রের মানুষটি হয়ে মঞ্চে বিচরণ করছিলেন গল্পের সময়টি জুড়ে। হাঙরি সিংগার মূকাভিনয়ে একজন শিল্পীর মানবিকতা প্রকাশ পেয়েছে যা বর্তমান সমাজে দৃষ্টান্ত হতে পারে। প্রকৃত শিল্পীরা সব সময় অপরের কল্যাণেই সুখ অনুভব করে।
এদিনের সর্বশেষ প্রযোজনা নৈঃশব্দের গর্জনে শহিদুল বশর মুরাদ আন্দোলিত করে তোলে সকলকে। মুরাদ তিনটি নক্সা মূকাভিনয় উপহার দেয় দর্শক স্রোতাদের। মূকাভিনয়গুলো হলো দম্ভের বারোমাস, অতন্দ্র প্রহরী এবং ক্রিকেট। মুরাদের মূকাভিনয়ে হলভর্তি দর্শক আন্দোলিত হয়ে ওঠে। দর্শকের মনে শিহরণ জাগে। বিশেষ করে অতন্ত্র প্রহরী মূকাভিনয়ে সীমান্ত রক্ষীর ভূমিকায় তার অনবদ্য অভিনয় মনে রাখার মত। দম্ভের বারোমাস মূকাভিনয়ে বাঘ, হরিণ, মাছি এই ত্রয়ী ভূমিকায় মুরাদের আঙ্গিকাভিনয় অনুভূতির চূড়ান্ত মাত্রা স্পর্শ করে। প্রতিভা আর তারুণ্যের সমন্বয়ে মুরাদ বাংলাদেশের মূকাভিনয়ে একটি উজ্জ্বল নাম।
বীর চট্টলা মূকাভিনয় উৎসবে বাংলাদেশের তিন প্রতিষ্ঠিত মূকাভিনয় শিল্পীর অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে প্লাটফর্ম মনোমাইম বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলো মাত্র। দেশব্যাপী এই ধারা চলমান থাকলে মূকাভিনয়ের সঠিক উপস্থাপন সম্পর্কে যেমন আগ্রহীরা জানতে পারবে একই সাথে শিল্পটিও সাধারণের নিত্য হয়ে ওঠবে আশা করা যায়। চট্টগ্রামের মূকাভিনয়ের বিশেষত্ব নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নাই। শুধু এটুকুই বলি একদিন বিশ্ব দেখবে বাংলাদেশের মূকাভিনয়।
দু’দিনব্যাপী এই উৎসবের উদ্বোধন করেন তরুণ শিল্পোদ্দ্যোক্তা ও বারকোড রেস্তোরাঁ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা মনজুরুল হক। তিনি মূকাভিনয়ের প্রসারে বীর চট্টলা মূকাভিনয় উৎসবের মত একটি আয়োজনের দায়িত্ব নিতে চান প্রতি বছর। প্রধান অতিথি আলোকিত কাউন্সিলর জনাব শৈবাল দাশ সুমন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ইতিবাচক হিসাবে উল্লেখ করে বলেন মূকাভিনয়ের প্রসারে উন্মুক্ত জায়গায় প্রদর্শনী করতে হবে। জনগণের কাছে যেতে হবে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে আমি প্রস্তুত। দু’দিন ব্যাপী এই আয়োজনের সঞ্চালনায় ছিলেন বাচিক ও মূকাভিনয়শিল্পী মেজবাহ চৌধুরী।

- Advertistment -