বিয়ে বাড়ির খানা যখন খুশি তখন

‘বীর চট্টলা’: ইট পাথরের ভবনে গ্রামীণ ছোঁয়ার এক রেস্তোরাঁ

আজাদী প্রতিবেদন

শুক্রবার , ৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ
147

চোখ রাখতে যেন হোঁচট খেলাম। ‘পানের বাট্টা’ হা হা হা। চমৎকার নাম। এত সুন্দর নাম না হলে কী আর জমে! কিন্তু জমার যেমন অনেক কিছু বাকি আছে তেমনি আমার হোঁচট খাওয়ারও। বেড়ার ঘর মনে করে আলতো করে দরজা ঠেলতে গিয়ে টের পেলাম যে, না ভুল হয়ে গেছে। ঘরটি বেড়ার নয়; আদল দেয়া হয়েছে মাত্র। শহরের প্রাণকেন্দ্রে ইট পাথরের একটি ভবনকে এমন নান্দনিক একটি আবহ দেয়ার বুদ্ধি শুধু ব্যবসা দিয়ে হয় না। আন্তরিকতা লাগে, সাথে সৃজনশীলতাও। বলছিলাম ‘বীর চট্টলা’ বিয়ে বাড়ির কথা। জামালখান মোড়ে এমন নান্দনিক একটি রেস্তোরাঁ হতে পারে তা যেন কারো ভাবনাতেই ছিল না।

শীত আস্তে আস্তে জমতে শুরু করেছে চট্টগ্রামে। পরিবেশটাই যেন একটু জমিয়ে খাওয়া দাওয়ার। তাই হিম হিম ঠাণ্ডা গায়ে মাখতে মাখতে হাজির হলাম ‘বীর চট্টলা’তে। বিয়ের খাওয়া দাওয়ার জমজমাট আয়োজন নিয়ে সম্প্রতি চালু হওয়া রেস্তোরাঁটি ইতোমধ্যে নগরবাসীর দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। বীর চট্টলার দরজা ঠেলতে গিয়েই নান্দনিকতার শুরু! চৌকাঠ পেরিয়ে ভিতরে পা রাখতেই জমজমাট অবস্থা। যেন সত্যি সত্যি বিয়ে বাড়ি। সোফা সেট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। যেমনটি রাখা হয় বিয়ে বাড়িতে। সেন্টার টেবিলের উপর হলুদ পেঁয়াজ মরিচের মতো নানা আয়োজন। এত চমৎকার সাজসজ্জা সত্যি সত্যি বিয়ে বাড়িকেও যেন হার মানিয়েছে। দেয়াল জুড়ে নানা বর্ণমালা। গ্রামীণ জনপদ থেকে তুলে আনা নানা বাংলা শব্দ, যেগুলো হারিয়ে যেতে বসেছিল। হলুদ মরিচের সাজসজ্জা পার হওয়ার আগেই ভিতরে উঁকি মারলাম। না জায়গা নেই। বিয়ে বাড়ির মতো সোফাতে কিছুক্ষণ বসার পরামর্শ দিলেন ওয়েটার। সোফাতে বসে অনেকেই জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ বসলাম। মনে হলো, অলস বসে না থেকে রেস্টুরেন্টটি ঘুরে দেখি। বসবাসের ঘরের মতো ছোট্ট ছোট্ট ঘরেও যে এভাবে রেস্টুরেন্ট করা যায় সেই ধারণাও মনে হয় চট্টগ্রামে প্রথম। একটি বেড রুমে কয়েকটি চেয়ার টেবিল পেতে দিয়ে খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। জমজমাটভাবে খাওয়া দাওয়া চলছে। গাছের ছায়ায় বসেও খাওয়ার ব্যবস্থা। ভর চাঁদনি রাতে খোলা আকাশের নিচে বসে এমন ভুরিভোজ কল্পনাও করা যায় না। রোমান্টিক সব আয়োজন পুরো রেস্টুরেন্টে। দেয়ালে বুক সেলফ। আর সেল্ফটি তৈরি করা হয়েছে ‘বই’ এবং ‘পড়’ শব্দের আদলে। সত্যি, এমন সৃষ্টিশীল আয়োজন আগে চট্টগ্রামে দেখা যায় নি।

প্রতিটি রুমে তৈরি করা হয়েছে বিয়ে বাড়ির আবহ। গ্রামীণ আদল। গ্রামীণ ঐতিহ্য যেন তুলে আনা হয়েছে। ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে রেস্তোরাঁর পরতে পরতে। সেই পুরানো দিনের বেতার। যেটির নব ঘুরিয়ে স্টেশন ধরা হতো। সেই পুরানো টেলিফোন। যেটিতে নম্বরের খোপে অঙ্গুল ঢুকিয়ে ঘুরাতে হতো কাঙ্খিত নম্বর। বন্ধুর টেলিফোনে মন না বসলেও বীর চট্টলার বিয়ে বাড়ির খাবারে সবার মন মজে আছে। মজার মজার কবিতার লাইন, হারানো দিনের গান সবই যেন অতীত স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল। রেস্তোরাঁর বয়বেয়ারারা ব্যস্ত ধুমায়িত পোলাও এবং কাচ্চি পরিবেশনে। সত্যিকারের এক বিয়ে বাড়ির আবহ চারপাশে। জমজমাট সব খাবার দাবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে বর কনেহীন সকলে যেন এক বিয়ে বাড়ির অতিথি।

খাবার দাবারের ব্যবস্থা দেখে চোখ কপালে উঠার উপক্রম। এত এত আয়োজন। ক্রয় ক্ষমতার নাগালের মধ্যে সব খাবারই পাওয়া যাচ্ছে বিয়ে বাড়িতে। যখন খুশি তখন। মাত্র ২৬০ টাকায় কাচ্চি বিরিয়ানি। প্লেট ভর্তি কাচ্চি। একজনের জন্য একটু বেশিই বলে মনে হচ্ছিল। খাসির রেজালা, ডিম কোরমা, চিকেন জালি কাবাব, মুরগীর রোস্ট থেকে শুরু করে কী নেই বিয়ে বাড়িতে? আমড়ার আচার নিয়ে অনেকটা কাড়াকাড়ি চলছিল একটি টেবিলে। চেটেপুটে খাওয়া চলছিল টেবিলে টেবিলে। জর্দা ভাত, বোরহানিসহ পাওয়া যাচ্ছিল মজাদার সব খাবার। মিন্ট লেমন বা ধুমায়িত কফিতেও না ছিল না কারো। রেস্তোরাঁ থেকে বেরুতেই ‘পানের বাট্টা’। যেখানে রকমারি মশলাদার মিষ্টি পান বিক্রি করা হচ্ছিল। দোকানটির সামনে রীতিমতো ভীড় লেগে রয়েছে। অনেকগুলো হাত বিক্রেতাদের দিকে। শখের বশেই পান খাবেন সবাই! সবকিছু মিলে জামাল খান মোড়ের বীর চট্টলা সত্যিকারের বিয়ে বাড়ির আমেজ নিয়ে একেবারে ভিন্নমাত্রার একটি রেস্তোরাঁ চালু করেছে।

x