বিসিপির আর্থিক ব্যবস্থাপনাও আসছে অটোমেশনের আওতায়

৮ দিনেই আদায় হবে বিক্রিত তেলের অর্থ

ইকবাল হোসেন

শনিবার , ১৮ মে, ২০১৯ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ
59

দীর্ঘদিন পর অটোমেশনের আওতায় আসছে বিসিপির আর্থিক ব্যবস্থাপনা। আগে জ্বালানি বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিক্রিত তেলের বকেয়া অর্থ আদায়ে সময় লাগত এক থেকে ৬ মাস। অটোমেশন হলে ৮ দিনের মধ্যেই বকেয়া আদায় হবে। এতে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানটি আর্থিকভাবে লাভবান হবে বলে মনে করছেন বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সূত্রে জানা যায়, ১৯৭৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করে বিপিসি। ক্রুড ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানি করে দেশের চাহিদা মেটানোর কাজ করে রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি। ক্রুড অয়েল ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে পরিশোধিত করা হয়। এরপর বিপিসির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লি., যমুনা অয়েল কোম্পানি লি., মেঘনা পেট্রোলিয়াম লি. এবং স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির (এসএওসিএল) মাধ্যমে বিপণন করা হয়। অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো জ্বালানি বিক্রয়ের পর বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে এক মাসের ক্রেডিট লিমিট (ডিপো থেকে সরবরাহ নেওয়ার এক মাসের মধ্যে) ধার্য ছিল। কিন্তু ওই ক্রেডিট লিমিটেডের মধ্যে কখনোই বিল পরিশোধ করত না অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে, আর্থিক ব্যবস্থাপনা অটোমেশনের আওতায় আনা হলে আট দিনের মধ্যে বিপিপির মূল ব্যাংক হিসেবে জ্বালানি বিক্রির টাকা জমা হয়ে যাবে।
বিপিসি সূত্র জানায়, যেখানে এক মাসের মধ্যে বিল পরিশোধের নিয়ম ছিল, সেখানে ৫-৬ মাস পর্যন্ত বিলম্ব করা হতো। এতে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হতো বিপিসি। তবে, গত মার্চ মাসে চার অঙ্গ প্রতিষ্ঠান থেকে বকেয়ার পুরো অর্থ আদায় করে বিপিসি। আদায়কৃত অর্থের পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা।
বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বিপিসি বছরে প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিকটন জ্বালানি বিক্রয় করে। এতে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত খাতের জ্বালানি বিক্রি থেকে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা আয় করে রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠানটি। নিয়ম অনুযায়ী, নিজেদের অর্থে ঋণপত্র খুলে বিদেশ থেকে এসব জ্বালানি আমদানি করে বিপিসি। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেশি থাকলে বিপিসিকে ভর্তুকি মূল্যে তেল দিতে হয়। সরকারি নির্দেশে ভর্তুকি দিলেও লোকসানের দায় বহন করতে হয় বিপিসিকেই। কিন্তু অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো বাকিতে জ্বালানি কিনে বিক্রি করলে নিয়মমাফিক মুনাফা জমা হয় হিসেবের ঘরে। বর্তমানে এই আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে অটোমেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিপিসি। ইতোমধ্যে অনলাইন অটোমেশন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সিএনএস বিডির (কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম লি.) সাথে প্রাথমিক পর্যায়ের চুক্তিও সই করেছে। অটোমেশনের করণীয় নির্ধারণ করতে বিপিসির সাথে সিএনএস বিডির একাধিক বৈঠকও হয়েছে। অটোমেশনের আওতায় এলে ডিপোতে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসেবে ডিলারদের জমাকৃত পে-অর্ডার কিংবা ডিডি নগদায়ন হওয়ার পর অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর কমার্শিয়াল চার্জ বাদে বিক্রিত জ্বালানির মূল্য ৮ দিনের মধ্যে বিপিসির হিসেবে জমা হয়ে যাবে।
বর্তমানে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ে, বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ), বাংলাদেশ ব্রিজ অথরিটি, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি লি. (বিটিসিএল), পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) অনলাইন অটোমেশন সেবা দিয়ে আসছে সিএনএস বিডি।
বিপিসির কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান প্রচলিত নিয়মে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিলারদের মাধ্যমে জ্বালানি বিক্রয় করে থাকে। ডিলাররা পে-অর্ডার অথবা ডিডির (ডিমান্ড ড্রাফট) মাধ্যমে ডিপোতে বিল পরিশোধের মাধ্যমে জ্বালানি সংগ্রহ করেন। বর্তমানে ডিলারদের জমা দেওয়া পে-অর্ডার ও ডিডি সংশ্লিষ্ট অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসেবে জমা হয়। পরে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলো বিপিসিকে পরিশোধ করে। এতে বিপিসির বিল পেতে ১-৬ মাস পর্যন্ত সময়ক্ষেপণ হয়। অটোমেশন হলে বিল আদায়ের সময় ৮ দিনে নেমে আসবে। তবে, ৮ দিনের ওই সময়টাকে শুভঙ্করের ফাঁকি বলে মনে করছেন অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ডিপোতে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর (পদ্মা, মেঘনা, যমুনা) হিসেবে ডিলারদের বিল নগদায়ন হওয়ার পর বিপিসির হিসেবে অর্থ জমা হতে ৮ দিন সময় লাগার কথা নয়। যেহেতু অটোমেশন প্রক্রিয়া সেহেতু সাথে সাথে কিংবা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জ্বালানির মূল্য বিপিসির মূল হিসেবে জমা হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ব্যাংকগুলোর সাথে অটোমেশন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সমঝোতার ভিত্তিতে ৮ দিন লিমিট দেওয়া হচ্ছে। এই আট দিন লিমিটের কারণে বছরে কোটি কোটি টাকা ব্যাংক সুদ গচ্চা যাবে বিপিসির।
তবে, বিষয়টি মানতে নারাজ বিপিসির পরিচালক (অর্থ) মো. আলতাফ হোসেন চৌধুরী। আগে যেখানে ১-৬ মাস সময় লাগত, সেখানে ৮ দিনে নেমে এলে বিপিসি আর্থিকভাবে বড় ধরনের লাভবান হবে বলে মনে করেন তিনি। তিনি দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘আগে মাসের পর মাস হাজার হাজার কোটি টাকা অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসেবে পড়ে থাকত। এতে বিপিসির আয় অনেক কম হতো। অটোমেশনের আওতায় আনা হলে সেই সুযোগ থাকবে না। অটোমেশন সেবা দেওয়ার জন্য সিএনএস বিডির সাথে আমাদের কথা চলছে। রাষ্ট্রীয় অনেক প্রতিষ্ঠানে তারা আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনলাইন অটোমেশন সেবা দিয়ে আসছে।’
তিনি বলেন, ‘সিএনএস-বিডি বেশ কয়েকটি ব্যাংকের তালিকা দিয়েছে। আমরা যেসব ব্যাংক অনুমোদন করব, সেগুলোর সাথেই আমাদের আর্থিক লেনদেন হবে। এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ থাকবে না।’

x