বিষোদগার নয়, ঐক্য চান মাহতাব

মহিউদ্দিনের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন, কর্মী সমর্থকদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময়

আজাদী প্রতিবেদন

মঙ্গলবার , ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৩:১৪ পূর্বাহ্ণ
859

মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার পর মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে দলের বিভিন্নস্তরের নেতাকর্মীরা গতকাল তার বাসভবনে গিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এ সময় মাহতাব উদ্দিন পারস্পরিক বিষোদগার না করতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘সামনে খুব কঠিন সময় আসছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নিজেরা নিজেদের বিরুদ্ধে বিষোদগার না করে একে অপরের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে আগামী নির্বাচনে তার মনোনীত প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে।’ গতকাল নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ড, থানা পর্যায়ের দলীয় নেতাকর্মী এবং সাংস্কৃতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের সংগঠনের নেতাকর্মীরা পল্টন রোডস্থ বাসভবনে মাহতাব উদ্দিনের সাথে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি চট্টগ্রামের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন, আগামী দিনে চট্টগ্রামবাসীকে একটি সুন্দর নগরী ও সুস্থধারার রাজনীতি উপহার দেয়ার অঙ্গীকার করে বলেন, ‘দেশ ও জাতির সংকট উত্তরণে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকরা বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রবর্তী বাহিনী। শান্তি, কল্যাণ ও প্রগতির ধারাকে বহমান রাখতে তাদেরকে লড়াইসংগ্রাম ও সামনের কাতারে সামিল হতে হবে। নাশকতার অপরাজনীতির বিরুদ্ধে উদ্দীপনামূলক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পাড়া মহল্লায় দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার এখন সময় এসেছে।’ প্রসঙ্গত, নগর রাজনীতিতে এক সময় অত্যন্ত পরিচিত ছিল চট্টেশ্বরীর মোড়স্থ পল্টন রোড। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক এবং বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর জহুর আহমদ চৌধুরীর বাসভবন এখানে। গতকাল আবারোও সেই বাড়িটিসহ আশপাশের পুরো এলাকা সকাল থেকেই নগর আওয়ামীলীগ ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের পদচারণায় সরগরম হয়ে ওঠে। প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর ছেলে মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করায় তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর জন্য নগর আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা সেখানে ভিড় করেন। জহুর আহমদ চৌধুরীর পরিবারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সখ্য দীর্ঘদিনের। জহুর আহমদ চৌধুরীর বড় ছেলে সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। দ্বিতীয় ছেলে মাহতাব নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে।

প্রসঙ্গত, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী গত ১৪ ডিসেম্বর রাতে মৃত্যুবরণ করলে মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি পদটি শূন্য হয়।

এর ১০ দিনের মধ্যে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার দলের প্রেসিডিয়াম সভায় এক নম্বর সহ সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়ার নিদের্শ দেন।

দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি আজাদীকে বলেন, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী সবাইকে নিয়ে কাজ করেছেন। আমিও চেষ্টা করবো দলের সবাইকে নিয়ে কাজ করে দলকে সুসংগঠিত করতে। আমাদের মধ্যে কোন বিভেদবৈরিতা থাকবে না। নগর আওয়ামীলীগের আমরা সবাই এক এবং অভিন্ন হৃদয়ের মতো কাজ করবো।’

গতকাল ভারপ্রাপ্ত সভাপতির সঙ্গে তার পল্টন রোডের বাসভবনে দেখা করতে যান দলের সহসভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী, সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সুনীল সরকার, নগর কমিটির উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য সফর আলী ও শেখ মাহমুদ ইছহাক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এম এ রশিদ, সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য মশিউর রহমান চৌধুরী, মাহবুবুল হক মিয়া, উপদপ্তর সম্পাদক শহিদুল আলম। এসময় তারা ভারপ্রাপ্ত সভাপতিকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান।

এদিকে মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে নগর আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করায় এক প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনের সহসভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী আজাদীকে জানান, ‘মহিউদ্দিন চৌধুরী তো মহিউদ্দিন চৌধুরীই, তার মতো লিডারশিপতো আর আসবে না। তারপরও আমাদেরকে দলের স্বার্থে কাজ করতে হবে। নাছির (সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন) ও মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী একসাথে কাজ করলে ভালো রেজাল্ট আসবে। লিডারশিপ তো আকাশ থেকে আসবে না। এটা তৈরি করতে হবে। সামনে নির্বাচন। আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন থেকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীজহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র। তিনি দলকে গুছিয়ে আনতে পারবেন।’

নঈম উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘দলের সভানেত্রী গঠনতন্ত্র মোতাবেক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করেছেন। প্রেসিডিয়ামের সভায় অনেকেই মহানগর কমিটি ভেঙে দিতে বলেছেন। কিন্তু নেত্রী বলেছেন ‘এখন মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্ব দেয়া হোক। পরে দেখা যাবে’। এখনএই মুহূর্তে নতুন কমিটি করলে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এই কারণে সভানেত্রী দলের প্রেসিডিয়ামের সভায় বিষয়টি আলোচনা করে দলের এক নম্বর সহ সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন।’

নগর আওয়ামীলীগের সহসভাপতি সাবেক মন্ত্রী ডা. আফছারুল আমীন এমপি এ প্রসঙ্গে আজাদীকে বলেন, ‘জন্মিলে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাই বলে কি সংগঠন কিংবা কাজ থেমে থাকবে? মহিউদ্দিন চৌধুরী দীর্ঘদিন নগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ছিলেন, নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি মারা গেছেন। এখন প্রধানমন্ত্রী গঠনতন্ত্র মোতাবেক দলের সিনিয়র সহসভাপতিকে দায়িত্ব দিয়েছেনএতে ব্যত্যয় কিছু ঘটেনি।’ আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে মহানগর আওয়ামীলীগকে কিভাবে গুছানো হবে জানতে চাইলে ডা. আফছারুল আমীন বলেন, ‘নির্বাচন এবং সংগঠন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক পরিচালিত হবে। গঠনতন্ত্রে আছে দলে কার কি দায়িত্ব, যার যার দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করলে সংগঠনের কার্যক্রম ঠিকভাবেই চলবে।’ তিনি অতীতে মহানগর আওয়ামীলীগ যেভাবেই চলেছে ভবিষ্যতেও সেইভাবে চলবে বলে জানান।

এ ব্যাপারে নগর আওয়ামীলীগের অপর সহসভাপতি অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী আজাদীকে জানান, ‘যদি কেউ মনে করেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর শূণ্যতা পূরণ করবে এটা সম্ভব নয়। মহানগর আওয়ামীলীগ চট্টগ্রামের রাজনীতির প্রাণ। রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। মহানগর আওয়ামীলীগে যারা নেতা হবেন তাদের সব দিক দিয়ে সকল সেক্টরে গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। এই মহানগরীতে বন্দর রয়েছে, এয়ারপোর্ট রয়েছে, কাস্টমস রয়েছে। রয়েছে রেলওয়ে, তেলগ্যাসসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। মহিউদ্দিন ভাই সবাইকে নিয়ে কাজ করতেন। মাহতাব ভাইকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখন উনি (মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী) যদি সবাইকে নিয়ে কাজ করেন তাহলে আগামী নির্বাচনে মহানগরীতে সুফল পাওয়া যাবে।’

মহিউদ্দিন চৌধুরীর শোকসভা: এদিকে গতকাল বিকেলে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ আয়োজিত এক শোকসভা জহুর আহমদ চৌধুরীর দামপাড়াস্থ বাড়ির সম্মুখে পল্টন রোডে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চট্টলবীর মহিউদ্দিন চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচর জহুর আহমদ চৌধুরীর যোগ্য কর্মী হয়ে গড়ে উঠেছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের অসাধারণ একজন নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। দেশপ্রেম ও চট্টগ্রামের প্রতি ভালোবাসা তাকে অনন্য মর্যাদায় সমাসীন করেছে।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গচট্টগ্রামের আহ্বায়ক ও জহুর আহমদ চৌধুরীর পুত্র জসিম উদ্দিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারবর্গ চট্টগ্রামের সমন্বয়কারী উত্তম কুমার বড়ুয়ার সঞ্চালনায় এতে আরো উপস্থিত ছিলেন নগর আ.লীগের সহসভাপতি নঈম উদ্দিন চৌধুরী, রেজাউল করিম চৌধুরী, সফর আলী, মুক্তিযোদ্ধা মো. ইউনুছ, মুক্তিযোদ্ধা মো. জাহাঙ্গীর চৌধুরী (সিএনসি), মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোজাফ্‌ফর আহম্মদ, শেখ মো. ইসহাক, সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত মেয়র নিছার আহম্মদ মঞ্জু, মুক্তিযোদ্ধা শফি বাঙালি, আবু সাঈদ সর্দার, মুক্তিযোদ্ধা সাইদুল হক, মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম, মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম, সাইফুদ্দিন খালেদ বাহার, সাবেক কাউন্সিলর রেহানা বেগম রানু, কাউন্সিলর মো. আসলাম, সাবেক কাউন্সিলর মো. আসলাম, সাবেক কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন, সাবেক কাউন্সিলর আবু তাহের, মুক্তিযোদ্ধা মাহফুজ।

x