বিষাক্ত মাছ স্টোন ফিশ

অনিক শুভ

বুধবার , ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:০৩ পূর্বাহ্ণ
48

পৃথিবীতে এমন অনেক কিছুই পাওয়া যাবে যা বিষাক্ত। প্রাণীজগতের এই বিশাল রাজ্যে অনেক বিষাক্ত প্রাণীর দেখা মেলে। শুধু প্রাণীই না, খুবই ক্ষুদ্র উদ্ভিদ থেকে শুরু করে বিশাল উদ্ভিদের পাতা, ডলপালাতেও বিষ পাওয়া যায়। যার বিষক্রিয়ায় অন্যান্য প্রাণীদের মত ঘটতে পারে মানুষেরও মৃত্যু। বিষাক্ত প্রাণীগুলোর মধ্যে অন্যতম হল স্টোন ফিশ বা পাথুরে মাছ।
ঝুহধহপবররফধব পরিবারের অন্তর্ভুক্ত মাছ স্টোন ফিশ নামে পরিচিত। এই জাতীয় মাছ পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত মাছ বলে পরিচিত। তাদের দৈহিক গঠন, রঙ ও স্বভাব চরিত্রের জন্যই এমন নামকরন করা হয়েছে।
স্টোন ফিশ দুই কারণে ভয়ংকর প্রাণীর লিস্টে জায়গা করে নিয়েছে। প্রথমটি হলো, এটি সবচেয়ে বিষাক্ত মাছ। আর দ্বিতীয় কারণ হলো এর পাথুরে আবরন ক্যামোফ্লেজের জন্য খুবই সাংঘাতিক কাজের। স্বাভাবিকভাবে এ আপনাকে কিছুই বলবে না, তবে যদি আপনি তার কুশলাদী জানতে চান তবে এ ও কিন্তু আপনার কুশলাদী জানতে ভুল করবে না! এই সাধু প্রাণীটির বিষের আক্রান্তে টেম্পরারী পঙ্‌গু বা প্যারালাইসড হয়ে যেতে পারেন, আর যদি খুব দ্রুত চিকিৎসা না নেওয়া যায়, তবে যম এসে কিন্তু হ্যালো জানাতে ভুলবে না। অতএব ভুলেও একে পাথর মনে করে এর উপর পা ফেলা যাবে না।
এই মাছের এই অদ্ভুত নামকরণ করা হয়েছে এর এই সাপের মত মাথার কারণে। এই মাছগুলিকে সাধারণত পশ্চিমা দেশে দেখা যায় তবে এশিয়াতে যে একদম দেখা মেলে না তা কিন্তু নয়। এই মাছগুলিকে পশ্চিমা দেশের লোকেরা খুব একটা পছন্দ করে না কেননা এই মাছের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল এরা খুব দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে আর এরা সে পুকুরে বা হ্রদে থাকবে সেখানকার সব ছোট মাছ বা সমপর্যায়ের সব মাছ মেরে ফেলে নিজেদের রাজত্ব কায়েম করবে। আর মনে হয় এদের স্বাদ খুব ভাল না তাই এদের থেকে বড় মাছ এদের আবার শিকারও করে না।
বিজ্ঞানিদের মতে এই মাছ সেখানে পাওয়া যায় সেখানকার যে খাদ্য স্তর রয়েছে তা সম্পূর্ণ ভেংগে ফেলে। এর ফলে খুব তাড়াতাড়ি বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ঐ অঞ্চল থেকে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এই সাপের মাথাওয়ালা মাছ লম্বায় প্রায় তিন ফুটের মত হয়। এদের খাদ্য তালিকায় নেই বলে কোন কথা নেই। জোক, কেঁচো, কৃমি, ব্যাঙ, মাছ এই সব কিছুতেই তার রুচি আছে। আর যখন এদের বংশ বৃদ্ধি করার সময় আসে তখন এরা যা কিছু নড়তে দেখে তাতেই আক্রমণ করে বসে। আর তা মানুষ হলেও কিছু যায় আসে না। সব থেকে মজার বিষয় হচ্ছে এরা পানির বাইরে মানে বাতাসেও হাল্কা পাতলা শ্বাস প্রশ্বাস চালাতে পারে। তাই পানির বাইরে রাখলেও মোটামুটি চার দিন পর্যন্ত বাঁচতে পারে। এছাড়াও কাদার নিচে অনেক দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।
ফ্লোরিডা, ক্যারিবিয়ান ও ইন্দো-প্যাসিফিক উপকূলীয় অঞ্চলে ও তারা বাস করে। এদের কোনো কোনো প্রজাতি নদীতেও বাস করে। বসবাসের নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নেয় পাথুরে জায়গা। এরা সর্বোচ্চ ৩৫ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। এমন ক্ষুদ্র গড়ন এবং ধূসর ও বৈচিত্র্যময় রঙের কারণে এরা অতি সহজেই পাথরের সঙ্গে দেহকে মিশিয়ে রাখতে পারে। এমন অবস্থায় এদেরকে পাথর থেকে আলাদা করা খুবই কঠিন। ফলে এদের দ্বারা যে কোনো প্রাণী সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এই প্রাণীর শরীরে ছড়ানো ছিটানো রয়েছে বিষাক্ত কাঁটা এবং এই বিষাক্ত কাঁটা হাঙ্গর ও অন্যান্য লুন্ঠনকারী,অনিষ্টকারী প্রাণীর হাত থেকে তাকে রক্ষা করে। এদের পিঠে অবস্থিত সূচের মতো কাঁটাগুলোর গোড়ায় থাকে এক ধরনের বিষাক্ত গ্রন্থি। এরা সাধারণত কাউকে আক্রমণ করে না। বিরক্তবোধ করলে পিঠের কাটা খাড়া করে পাথরের সঙ্গে নিজেকে আড়াল করে রাখে।
কোনো ব্যক্তি চলাচলের সময় এদের পিঠে পা রাখলেই এদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। পিঠে চাপ পড়লে গ্রন্থি থেকে নিউরোটঙিন নামক বিষ নিঃসরণ হয়। এ বিষে আক্রান্ত মানুষ প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করে এবং কিছু সময়ের মধ্যেই শরীরের কোষগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে ধীরে ধীরে এক সময় প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়।
এই কাঁটার আঘাতে নিউরোটক্সিন নামক বিষের কারণে ভিকটিমের হৃৎপিণ্ডের কার্যক্ষমতা লোপ পায় এবং শরীর দ্রুত নিস্তেজ হয়ে আসে। আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হলে তাকে আর বাঁচানো যায় না।
স্টোন ফিস এতটাই বিষাক্ত যে, মানুষ আক্রান্ত হলে মাত্র দু’ঘণ্টার মধ্যেই তার মৃত্যু হতে পারে। এর বিষের বিষক্রিয়া এতটাই তীব্র যে, আক্রান্ত ব্যক্তি যন্ত্রণাদায় দেহের অঙ্গ কেটে ফেলতে চায়।

x