বিষাক্ত গাছের আগ্রাসনে গ্রামাঞ্চলে বিপর্যস্ত ফলমূল ও দেশীয় গাছ

মুহাম্মদ এরশাদ : চন্দনাইশ

সোমবার , ২৬ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২৬ পূর্বাহ্ণ
89

রোপণের অল্পদিনে বিক্রি করে লাভের আশায় বিদেশি বিষাক্ত গাছ রোপণের প্রতি মানুষ অধিক হারে ঝুকে পড়ছে। এক সময় আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলের ভিটে-বাড়ির আঙিনায় আম, জাম, কাঁঠাল, লিচুসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলফলাদিসহ দেশীয় অন্যান্য গাছ দেখা গেলেও বর্তমানে অনেকাংশে কমে গেছে। এমনকি নতুন ভিটে-বাড়ির আঙিনায়ও নতুন করে রোপণ করতে দেখা যায়না এসব দেশীয় ফলের চারা। বর্তমানে মানুষ অল্প সময়ে অধিক লাভের লোভে পড়ে বিদেশি ইউক্লিপটাস, আকাশী, পাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিষাক্ত গাছ সৃজন করছে। ফলে একদিকে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ও অন্যদিকে মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি পশু-পাখির খাদ্য সংকট হচ্ছে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী অনেক পশু পাখিও বর্তমানে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সমতল কিংবা পাহাড় সবখানেই এখন সমানতালে আগ্রাসন চলছে বিষাক্ত এসব গাছপালার। অথচ দেশীয় গাছের চেয়ে কোন অংশে আগ্রাসী এসব গাছ লাভজনক নয়। এদিকে বনাঞ্চলে দেশীয় ফলফলাদির গাছ কমে আসায় খাদ্য সংকট হওয়ায় হাতিসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং হামলা করে মানুষের জান মালের ক্ষতি সাধন করছে।
গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ভুলের বশবর্তি হয়ে এসব গাছ রোপণ করলেও পরিবেশ বিনষ্টকারী এসব গাছের ক্ষতিকারক প্রভাবের বিষয়ে তাদেরকে সচেতন করতে উপজেলা কৃষি বিভাগ, বনবিভাগ কিংবা সরকারি কোন দপ্তর থেকে সচেতনতামুলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না। ফলে মানুষ আরো বেপরোয়া হয়ে দেশীয় ফলফলাদির গাছের চারা রোপণের পরিবর্তে বিষাক্ত এসব গাছপালা রোপণে আগ্রহী হয়ে উঠছে। একসময় গ্রামাঞ্চলে পাকপাকালির কিঁচির মিছির শব্দে কোলাহল থাকতো। এসব গাছের ক্ষতিকারক প্রভাবের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে অধিকাংশ পাক-পাকালিও। এছাড়া বিষাক্ত ইউক্লিপটাস গাছ মাটি থেকে অতিরিক্ত পানি শোষণ করার ফলে আশেপাশে অন্য কোন গাছও বেড়ে উঠতে পারে না।
সাম্প্রতিক সময়ে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলার সর্বত্রই চোখে পড়ছে এসব বিষাক্ত গাছের আগ্রাসন। ক্ষতির প্রভাব সম্পর্কে না জেনে মানুষ নির্দ্বিধায় এসব বিষাক্ত গাছের চারা রোপণ করছে। ভিটে-বাড়ি, রাস্তাঘাট, বন-জঙ্গল কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এমনকি অনেকে নতুন জায়গা ক্রয় করে চাষাবাদ বাদ দিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এসব গাছের চারা রোপণ করছে।
এলাকার মানুষের সাথে আলাপ করে জানা যায়, বিষাক্ত ইউক্লিপটাস গাছ রোপণের ৩/৪ বছরের মাথায় গোলাকারে দেড় থেকে ২ ফুট হলে বিক্রি করা যায়। গাছগুলো সোজা হওয়ায় মানুষ কাঁচা ঘর-বাড়ি ও দোকানপাট নির্মাণে এসব গাছ খুঁটি ও ছালের বিম হিসেবে ব্যবহার করে। এ কারণেই অনেকে বাগান করে এসব চারা রোপণ করে থাকে।
উপজেলার বিভিন্ন নার্সারীতেও দেখা যায় যত্ন সহকারে বিষাক্ত ইউক্লিপটাস গাছের চারা বিক্রির আশায় চারা গজিয়ে সারিসারি সাজিয়ে রাখতে।
চন্দনাইশ, সাতকানিয়াসহ অন্যান্য উপজেলায় চট্টগ্রাম-কঙবাজার মহাসড়কের দু’পাশ জুড়েও সরকারিভাবে সৃজন করা হয়েছে বিদেশি আকাশি, ইউক্লিপটাসসহ অন্যান্য গাছ।
সাতকানিয়ার কালিয়াইশ এলাকার স্কুল শিক্ষক ফরিদুল আলম বলেন, বিষাক্ত গাছে বিশোদ্ধ টাকা আয় হলেও এসব বিষাক্ত গাছ রোপণ করে আমরা নিজেদের অজান্তেই পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছি। তিনি বলেন, এসব গাছের ফলে দেশীয় ফলফলাদির গাছ কমে যাওয়াতে মৌসুমী অনেক দেশীয় ফল খাবারের তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা এখন অনেক দেশীয় ফল চিনে না। অথচ এক সময় মানুষ এসব দেশীয় ফল খেয়েই জীবন ধারণ করতো। মানুষ এসব খেয়েই রোগ প্রতিরোধ করতো।
একই এলাকার মো. জাহিদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, আবদুল আলম, মোরশেদুল করিম মানিকসহ অনেকেই বলেন, ভুলের বশবতি হয়ে ইউক্লিপটাস, আকাশি ও পাইন গাছের মতো ‘আগ্রাসী’ প্রজাতির বিদেশি চারা রোপণ করে দেশীয় পাক-পাকালি, বন্যপ্রাণীসহ বন ক্ষতিগ্রস্থ করছি। যা আমাদের পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। ইউক্লিপটাস জমির জন্যও ক্ষতিকর। আমাদের অবজ্ঞা আর অবহেলায় দেশীয় প্রজাতির ফলজ ও বনজ গাছগুলো হারিয়ে ফেলছি। এমনকি আসবাবপত্র তৈরিতেও বিদেশি প্রজাতির গাছ ব্যবহারে উৎসাহী হয়ে উঠছে মানুষ। তারা বলেন, দেশীয় প্রজাতির আম, জাম, কাঁঠাল, জলপাই, তেঁতুল, আমলকি, জারুল, তেজপাতা, হরিতকি, হিজল, তমাল, অর্জুন, নিম, মেহগনি, সেগুন, সিরিষ, কৃষ্ণচূড়া, শিলকড়ই, শিমুল, বহেড়া, গর্জন, কদম, বট ইত্যাদি বৃক্ষের দিকে নজর দেয়া জরুরি। এসব দেশীয় গাছের প্রতি নজর দিলে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা এবং আমাদের পুষ্টিও নিশ্চিত হবে। তারা বলেন, বিষাক্ত গাছের ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরে গ্রামাঞ্চলের মানুষকে সচেতন করে তুলতে সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রচারণামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলেই রোধ করা সম্ভব এসব বিষাক্ত গাছের আগ্রাসন। পাশাপাশি সাময়িক লাভের আশায় নিজেদের ভবিষ্যত নষ্ট ও পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে এলাকার সচেতন ব্যক্তিদেরও এব্যাপারে এগিয়ে আসা উচিত। উপজেলার বৈলতলী এলাকার পল্লী চিকিৎসক অশোক সুশীল বলেন, একসময় গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠানে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, ডালিম, আঁতাসহ বিভিন্ন ফলফলাদিসহ দেশীয় প্রজাতির গাছের দেখা মিললেও এখন হাতেগোনা কয়েকটি বাড়ির আঙ্গিনায় ছাড়া তেমন দেখা যায়। তিনি বলেন, এসব দেশীয় গাছ যেমন আমাদের ফলের যোগান দেয়, তেমনি অর্থেরও যোগান দেয়।
এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, ডালিম, আঁতাসহ সকল প্রকার দেশীয় ফল শরীরের জন্য খুবই উপকারি। এসব ফল মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীর সুস্থ রাখে। দেশীয় এসব ফল ভেষজ বা ঔষধিগুণে সমৃদ্ধ। আমাদের দেশের প্রায় ৮৮ ভাগ মানুষ ভিটামিন ‘এ’, ৯০ ভাগ মানুষ ভিটামিন ‘সি’ ও ৯৩ ভাগ মানুষ ক্যালসিয়ামের অভাবে ভোগে। আমাদের এ পুষ্টি ঘাটতি পূরণে দেশীয় এসব ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুতরাং সকলের উচিত দেশীয় ফলের চারা রোপণের প্রতি অধিক যত্নবান হওয়া।

x