বিষমুক্ত খাবার চাই

কাজী রুনু বিলকিস

মঙ্গলবার , ২৮ মে, ২০১৯ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
43

রমজান মাসটা মুসলিমদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ মাস। মানুষ সিয়াম পালন করে। ইবাদত বন্দেগী করে দানখয়রাত করে। রমজানের পুরো মাসটাই উৎসবমুখর। বিপণী কেন্দ্রগুলো ঝলমলে হয়ে ওঠে। পোশাক থেকে শুরু করে খাওয়া দাওয়া অর্থাৎ ইফতারের বাহারি সাজে অন্যরকম একটা আমেজ থাকে। সব মিলিয়ে হাজার কোটি টাকার বিপণন। মানুষ কিনছে, মানুষ খাচ্ছে। বের হলেই দেখি রাস্তার মোড়ে মোড়ে শপিংমলে কিংবা বাজারে মৌসুমী ফলের মহাসমারোহ। চোখ জুড়ানো মন ভুলানো যত ফল। পৃথিবীর আর কোথাও জন্মে এদেশের মত ফল? আম খেয়ে ছোটবেলায় আমের আঁটিটা ছুঁড়ে ফেললে দেখতাম কয়দিন পরে আর একটি আম গাছের জন্ম। কত উর্বর আমাদের দেশ। কত সংগ্রাম, কত ত্যাগ, কত রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই দেশ। ভাবতেই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে কেন আমরা এতটাই আত্মবিধ্বংসী হয়ে উঠেছি? নিজের সাথে নিজেরা প্রতারণা করে চলেছি। কেন মানুষের খাবারে বিষ মিশিয়ে নিজের ভাগ্য গড়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছি। এত এত পছন্দের ফলে এত এত বিষ মেখে রেখেছে। শিশু-কিশোর তরুণ প্রৌঢ় বৃদ্ধ আমরা সবাই মিলে সেই হেমলক পান করছি। না করে উপায় কি? কোথা নেই, কোন খাদ্য বিষ মিশিয়ে রাখেনি অসাধু ব্যবসায়ীরা? আমার এক বন্ধু আমার ইনবক্সে একটা ম্যাসেজ পাঠিয়েছে। আমি ম্যাসেজটা পাঠকদের উদ্দেশ্যে সরাসরি তুলে দিলাম।
(১) দুধে : ফরমালিন, (২) গরুর দুধ বৃদ্ধিতে পিটুইটারী গ্ল্যান্ড ইনজেকশন (৩) মাছে ফরমালিন। (৪) শাকসবজিতে কপার সালফেট (৫) আম, লিচু, জাম পাকাতে কারবাইড (৬) আম, লিচু, জাম সংরক্ষণে ফরমালিন (৭) ফল গাছে থাকতেই হরমোন ও কীটনাশক (৮) তরমুজে সিরিঞ্জ দিয়ে দেয় পটাশিয়াম পার ম্যাঙ্গানেট (৯) কলা পাকানো হয় ক্যালসিয়াম কারবাইড (১০) কফি পাউডারে তেঁতুলের বিচির গুড়া (১১) মশলায় ইটের গুড়া (১২) হলুদে লেড ক্রোমেট/লেড আয়োডাইড (১৩) মুড়িকে ধবধবে সাদা ও বড় করতে হাইড্রোজ ও ইউরিয়া (১৪) দীর্ঘক্ষণ মচমচে রাখার জন্য জিলাপি, চানাচুরে পোড়া মবিল। (১৫) আইসক্রিম বিস্কুট সেমাই, নুডলস ও মিষ্টি আকর্ষণীয় করতে কাপড় ও চামড়ায় ব্যবহৃত রং (১৬) ফলের রস তৈরি হয় ক্যামিকেলস দিয়ে। (১৭) বিদেশি মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্য ও ওষুধ ক্যামিকেলস নতুন মেয়াদের স্টিকার। (১৮) চাল চকচকে করতে ইউরিয়া (সূত্র : ইত্তেফাক, পৃষ্ঠা ২ তারিখ ২৬/০৫/২০১৮) (১৯) পিয়াজু ও জিলেপীতে এমোনিয়া। আরও আছে। (১) পানি-২০ লিটার ২ টাকা গ্লাস প্রতি) অধিকাংশই অটোমেশিনে নয় হাতে ঢালা হয়। পারঙাইড দিয়ে নয় নাম মাত্র পানিতে ধোয়া হয়।
খামারের মুরগিতে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম, লেড আর এন্টিবায়েটিক তো আছেই…।
লিস্টটা আরও দীর্ঘ। এরপর ভাবুন আমাদের কি অবস্থা হবে? কেমন করে বেঁচে আছি? আমাদের ভবিষ্যৎ কি?
একদল অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর বিষাক্ত রাসায়নিক মিশিয়ে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। পাকা টমেটো, আম, কলা, পেঁপে, আনারসের মত উপাদেয় বিভিন্ন ফল ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান দিয়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকানো হচ্ছে। কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকানো কাজে ব্যবহৃত এমন একটি ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্যের নাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড (ইথ্রেল বা ইথোফেন) ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে ফল পাকাচ্ছে। অসাবধানতা ও ভুল পদ্ধতিতে উচ্চমাত্রায় ক্যালসিয়াম কার্বাইড ব্যবহার করে কৃত্রিম উপায়ে পাকানো ফল আর্সেনিক ও ফসফরাস দ্বারা দূষিত হয়ে পড়তে পারে। এবং বিষাক্ত উপাদান দুটি আমাদের শরীরে প্রবেশ করলে স্বাস্থ্যহানি ছাড়া জীবন বিপন্ন হতে পারে। দামে অতি সস্তা বলে ব্যবসায়ীরা ফল পাকানোর কাজে ক্যালসিয়াম কার্বাইডের যথেচ্ছ অপব্যবহার করে থাকে। এক কিলোগ্রাম-কার্বাইডের মূল্য ৭০ থেকে ৮০ টাকা মাত্র। এক কিলোগ্রাম ক্যালসিয়াম কার্বাইড দিয়ে ১০ টন ফল পাকানো যায়।
গাছে সব ফল একসঙ্গে পাকে না বলে ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার জন্য পরিপক্ক-অপরিপক্ক সব ফল বিক্রি করার উদ্দেশ্যে সব একসঙ্গে পেড়ে নিয়ে কৃত্রিম উপায়ে পাকানোর পন্থা গ্রহণ করে। অনেক পছন্দের ফল নানা আশঙ্কায় খাওয়া হয় না। রোজার সময় আমার স্বামীর খুব পছন্দের খাবার সেহেরিতে দুধ-কলা, অথবা আম-দুধ দিয়ে ভাত খাওয়া। ছোটবেলা থেকেই নাকি সে সেহেরিতে এই খাওয়া খেয়ে এসেছে। হয়তো ওর মতো অনেকেরই পছন্দের এই সহজপাচ্য উপাদেয় খাবারটি। কিন্তু দুর্ভাগ্য এখন আর খেতে পারছে না। কেউ কি দেখার নেই? মাঝে মাঝে অভিযান দেখি, জরিমানাও দেখি সবই যেন আইওয়াশ। দেশের চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন কার জন্য? মধ্যম আয়ের দেশ না উন্নত দেশ কি যায় আসে এসব সার্টিফিকেটে? অসুস্থ বিকলাঙ্গ, ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে বেড়ে উঠবে আমাদের শিশুরা, আমরা হাসপাতালবাসী কিংবা পুরো দেশটাই একটা হাসপাতালে পরিণত হবে। কি মূল্য আছে এসবের চারিদিকে মৃত্যুর জাল পাতা দেশে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আগে মানুষ বাঁচান। মানুষ বাঁচলে উন্নয়ন হবে। মাদকের বিরুদ্ধে কঠিন অভিযান অভিনন্দন! মাদক সীমিত একটি শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ। কিন্তু খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে যে রাসায়নিক ইথোফেন মেশানো হচ্ছে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিটি মানুষ। আর পাঁচ বছর পর কোনো সুস্থ মানুষ পাওয়া যাবে না উন্নয়ন দেখার জন্য। ধুকে ধুকে মরবে মানুষ আর মাছের মতো স্থির দৃষ্টিতে দেখবে উন্নয়নের মহাসড়ক ছাড়িয়ে যাচ্ছে সোনার বাংলা। মাদক ব্যবসায়ীর চেয়েও ভয়ংকর এই অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীরা। তাদের আপন-পর বলতে কিছুই নেই। ওরা নিজেরাও মরবে এই বিষে। ওরা হত্যাকারী নয় এই কথা তো বলা যায় না।
জনস্বাস্থ্যের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। একটা সুস্থ জাতিই একটি উন্নত দেশের প্রথম ও প্রধান শর্ত। এমন রমজান মাসে নির্দ্বিধায় একটু ফল, একটু দুধ খেতে না পারার অভিশাপটুকুর জন্য যারা দায়ী তাদের জন্য বরাদ্দ রইল। একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে আমার আর কিইবা করার আছে? নির্দ্বিধায় নিঃসংকোচে সব খাবার খেতে চাই। বিষমুক্ত খাবার চাই, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই। সরকারের কঠোর অবস্থান চাই অসাধু খাদ্য ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে।

x