বিশ্ব কাঁপবে বিশ্বকাপে

আজ থেকে ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ শুরু

নজরুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ৪:৫০ পূর্বাহ্ণ
182

অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে আজ। রাতে রাশিয়ায় পর্দা উঠছে বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮’র। রাশিয়াসৌদি উদ্বোধনী ম্যাচ দিয়ে ফুটবল বিশ্ব মেতে উঠবে বিশ্বকাপ উত্তেজনায়। একশোর’ও বেশি দেশের ফুটবলপ্রেমীদের পদচারণায় মুখরিত রাশিয়ার ১১টি শহর। প্রিয় দলের সমর্থনে দেশটিতে চলছে দর্শক উন্মাদনা। বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য প্রস্তুত রাশিয়া। লড়াই’র মঞ্চে প্রস্তুত ৩২টি দেশ। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, নেইমার, মো. সালাহ, হ্যারী কেইনদের নৈপুণ্যে আগামী এক মাস মেতে থাকবে বিশ্ব। ফুটবলকে যারা ফুটবল বলে না, বলে সকার সে দেশটিও বিশ্বকাপ আয়োজনের সুযোগ পেয়েছে। আগামী ২০২৬ সালে আরো একবার সকারের দেশ যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত হবে বিশ্বকাপের আরো একটি আসর। ফুটবল যাদের ধ্যান জ্ঞান সে লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ে থেকে যাত্রা শুরু করা বিশ্বকাপ ফুটবল এবার নোঙর করছে রাশিয়ায়। ইউরোপের দেশ হলেও রাশিয়া ফুটবলের জন্য বিখ্যাত নয়। এমনকি ক্রিকেট কিংবা অ্যাথলেটিক্সের জন্যও তেমন প্রসিদ্ধ নয় এই রাশিয়া। দেশটির রাজধানী মস্কোর রেড স্কয়ারের সামনে লেনিনের মুর্তিটা ধারণ করেছে একেবারে চকচকে। যেন আরেকটি বিপ্লবের ডাক দিতে প্রস্তুত হচ্ছেন এই বীরপুরুষ। তবে হ্যাঁ, আজ থেকে আরেকটি বিপ্লব সুচিত হতে যাচ্ছে লেনিনের দেশ রাশিয়ায়। আর সেটি হচ্ছে ফুটবল বিপ্লব। আজ থেকে পুরো একমাস এই ফুটবল যুদ্ধই চলবে রাশিয়ায়। কারণ বিশ্বকাপ নামক সোনার হরিণ পেতে যে বিশ্বের সেরা ৩২টি দল এখন জড়ো হয়েছে রাশিয়ায়। আগামী ১৫ জুলাই সেই মস্কোতেই বেরিয়ে আসবে বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন।

রাশিয়ার ১১টি শহর যেন এখন তাদের পরিচয় ভুলে কেবলই ফুটবলের নগরীতে পরিণত হয়েছে। যেখানে যেদিক চোখ যায় কেবলই ফুটবলের জয়গান। আর হবেনাই বা কেন, বিশ্বকাপ ফুটবলতো আর প্রতিদিন আসেনা। চার বছরে একবার আসে স্বপ্নের সে বিশ্বকাপ। আর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এই বিশ্বকাপ নামক ফুটবলের বিশ্বযুদ্ধ আয়োজনের সুযোগ পায় কোন দেশ। যেমনটি এবার পেয়েছে রাশিয়া। বিশ্বের সবচাইতে বৃহত্তম এই দেশটির এবারের বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন নিয়ে অনেক পরীক্ষা দিতে হয়েছে। তবে সব পরীক্ষায় উত্তীর্ন হয়েছে তারা। আজ বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় রাজধানী মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামের সবুজ চত্ত্বরে স্বাগতিক রাশিয়া এবং এশিয়ার ফুটবল পরাশক্তি সৌদি আরবের মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে পর্দা উঠবে এবারের বিশ্বকাপের। ফুটবলের মহাযুদ্ধ শুরু হবে এই ম্যাচটি দিয়ে। তার আগে আধ ঘণ্টার একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠান রাখা হয়েছে।

এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটাকেও সাজানো হয়েছে ব্যতিক্রম হিসেবে। যেখানে বিশ্বকাপের থিম সং এর সাথে নাচবে প্রায় ছয়শ জিমনেস্টিক্স নৃত্য শিল্পী। থাকবে অপেরা সংগীত। সব মিলিয়ে বেশ চোখ ধাঁধানোই হবে আধ ঘন্টার এই অনুষ্ঠানটি। যে লুজনিকি স্টেডিয়ামে পর্দা উঠছে এবারের বিশ্বকাপের সেই লুজনিকি স্টেডিয়ামেই আগামী ১৫ জুলাই পর্দা নামবে ফাইনালের মধ্য দিয়ে। মাঝখানে একমাস চলবে নিরন্তর লড়াই। যেখানে একে অপরকে ঘায়েল করার সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে তবেই এসেছে রাশিয়ায়।

বিশ্বকাপ শুরুর অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে হিসেব নিকেষ। কার ঘরে যাবে এবারের বিশ্বকাপ। আধুনিক এই বিশ্বেও গনক কিংবা জ্যোতিষির কাছে গিয়ে ভবিষ্যদ্বানি করা হচ্ছে বিশ্বকাপের মত বাস্তবতার এক লড়াই নিয়ে। দুনিয়ার এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে আজ সবাই ফুটবল জ্বরে আক্রান্ত। ইউরোপ থেকে এশিয়া কিংবা আফ্রিকা থেকে লাতিন আমেরিকা সর্বত্র যেন ফুটবলের ঢেউ। ইউরোপ থেকে লাতিনের দল আবার লাতিন থেকে ইউরোপের দল অনেকটা ছোঁ মেরে বিশ্বকাপ নিয়ে এসেছে। তাই এবারে কারা নিয়ে যাবে সোনালী সে কাপটি সে হিসেব চলছে গ্রামের চায়ের দোকান থেকে একেবারে রাজ প্রাসাদ পর্যন্ত।

সবকটি বিশ্বকাপে খেলা ব্রাজিল কি আরো একবার এই ট্রফিটা জিতে নিজেদের সবার উপরে নিয়ে যাবে, নাকি জার্মানি আরেকটি শিরোপা জিতে ছুঁয়ে ফেলবে ব্রাজিলকে। আর্জেন্টিনার ৩২ বছরের অপেক্ষা শেষ হবে নাকি ফরাসিরা জিদানের পর আরেকবার বিপ্লব ঘটাবে সেসব নিয়ে ভাবছে সবাই। ফুটবলের বিশ্বকাপ মানে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। বিশ্ব যেন এই দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম পর্ব থেকে বিদায় নিক কিংবা ফাইনাল পর্যন্ত থাকুক। আর মাঝখানে যারা রয়েছে তাদেরকে বলতে হবে বিশ্বকাপের সংখ্যালঘু। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন কিংবা ইংল্যান্ড। এই দলগুলো মাঝে মধ্যে ছোবল মেরেছে বিশ্বকাপের উপর। দীর্ঘ তিন যুগ পর এবার বিশ্বকাপে নেই ইতালি। টোটাল ফুটবলের জনক নেদারল্যান্ডও পারেনি বিশ্বকাপের টিকিট কাটতে। ফলে লাতিন দুই দেশের বিপরীতে এবারে রয়েছে ইউরোপের চার পরাশক্তি। অবশ্য এই চার দলের সাথে এবারে হিসেবে আনা হচ্ছে ফুটবলের আরেক রাজপুত্র ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগালকে।

লড়াইয়ের ময়দানটা যেন ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও বিশ্বকাপ মানে ইউরোপের টোটাল ফুটবল আর লাতিনের শৈল্পিক ফুটবলের চিরন্তন লড়াই। সে লড়াইয়ের আবহ থেকে খুব কমই বের হয়ে আসতে পেরেছে বিশ্বকাপ। এবারের রাশিয়া বিশ্বকাপেও সে গন্ডির বাইরে যাবেনা বলে মনে করছেন ফুটবল বোদ্ধারা। যদিও আফ্রিকান ফুটবলের নতুন তুর্কি মোহাম্মদ সালাহর কারণে দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া মিশরকে হিসেবের মধ্যে রাখতে চাইছেন অনেকে। তবে মিশর কিংবা ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকার বাইরের কোন দেশ শিরোপা জেতাটাকে চূড়ান্ত রকমের অঘটন হিসেবে দেখছেন ফুটবল বোদ্ধারা। আর তেমন কোন অঘটন রাশিয়ার বিশ্বকাপে নাও দেখা যেতে পারে। যদিও বলা হচ্ছে এবারের বিশ্বকাপে ফেভারিটের তালিকাটা একটু লম্বা। ৬৬ সালের পর আর বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ নিতে না পারা ইংলিশরা রয়েছে একেবারে ভুভু হয়ে। আর্জেন্টিনা যেমন চায় ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে, তেমনি জার্মানরা চাইছে ব্রাজলিকে ছুঁয়ে ফেলতে। আবার ব্রাজিলের চাওয়া একেবারে নিজেদের ধরা ছোঁয়ার বাইরে নিয়ে যাওয়া। স্পেন, ফ্রান্স চাই দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ ট্রফির বেদি মূলে দ্বিতীয়বার নিজেদের নাম অংকিত করতে। আবার এসবের বাইরেও কেউ কেউ চাইছে বিশ্‌্বকাপে একটি অঘটন ঘটাতে। সব মিলিয়ে একেবারে কারেন্ট জালের মত সমীকরনকে সামনে রেখে যাত্রা শুরু হচ্ছে এবারের ফুটবল বিশ্বযুদ্ধের। যার শেষ পরিণতি দেখার জন্য আপাতত অপেক্ষা ১৫ জুলাই পর্যন্ত। আর ততদিন বিশ্বের কয়েক কোটি চোখ নিবদ্ধ থাকবে রাশিয়ার ১২টি স্টেডিয়ামে।

x