বিশ্ববিদ্যালয় কি কেবল ‘চাকরিজীবী’ তৈরির কারখানা?

মাধব দীপ

মঙ্গলবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩৩ পূর্বাহ্ণ
30

বিশ্ববিদ্যার আলয় হিসেবে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাম্প্রতিক প্রবণতা নিয়ে লেখার জন্য বেশ তাগিদ বোধ করছি বেশ কিছুদিন ধরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চোখের সামনে যা দেখছি আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় যা শিখেছিএই দু’য়ের মধ্যে দূরদূরতম কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাই না মাঝেমাঝে। অথচ আমি তৃপ্তবোধ করি এই ভেবে যেজীবনের সাথে বোঝাপড়া করার মতো সক্ষমতা একদিন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ই আমার মাঝে তৈরি করে দিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হালহকিকত কী? বিশ্ববিদ্যালয় কি তার নিজের অসীম ব্যাপ্তিকে শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরতে পারছে? কী হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে? শিক্ষার্থীরা কী শিখছে? এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভবিষ্যতই বা কীবিশেষ করে এর কলা, মানববিদ্যা, সামাজিক বিজ্ঞান কিংবা ব্যবসায় বিদ্যা শাখার? এ নিয়েই এই লেখার অবতারণা।

প্রকৃতপক্ষে, শিক্ষকতা পেশা অন্য আটদশটি পেশার তুলনায় মহৎ এবং শ্রেষ্ঠতম। বর্তমান সময়ে আমরা মানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কি এই ‘সুগন্ধি’ ছড়ানোর কাজটুকু করতে পারছি? শিক্ষার্থীরা কি তাঁদের শিক্ষকদের সহজেই ‘আইডল’ হিসেবে নিতে পারছেন? নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে মানুষ হওয়ার সঠিক পথ দেখতে পাওয়ার অভাবে শিক্ষার্থীদের মনের ওপর ‘দিশাহারা নাবিক’এর মতো ক্রমাগত চাপ বাড়ছেই? যার ফলে তাঁরা নানাবিধ মানসিক পীড়ার সম্মুখীন হচ্ছে!

আমি মনে করি, শিক্ষার্থী ছাড়া শিক্ষকের কোনো মূল্য নেই। আপনি ‘অনেক বড় কিছু’ হলেন, ব্যক্তিগত উন্নতির ‘চূড়ায়’ উঠে গেলেন কিন্তু কোনো শিক্ষার্থী আপনার মধ্যে শিক্ষকসুলভ কোনো আদর্শ খুঁজে পায়নি। আপনি এমন কিছু করতে পারলেন না যেশিক্ষার্থীরা আপনার ইতিবাচক ভাবমূর্তি মনে গেঁথে রাখবেতবে সেই শিক্ষকজীবনের মূল্য কানাকড়ি নেই। দার্শনিক ওশো বলেছিলেন– ‘the potential of the soil can never become realized in the absence of seeds.’ সুতরাং, যদি শিক্ষার্থীদের আমরা বীজের সাথে তুলনা করি আর বিশ্ববিদ্যালয়কে মাটির সাথে তবে সেই মাটি কতটুকু উর্বর ও সম্ভাবনাময় তা কিন্তু বীজের সফল অঙ্কুরোদগম ছাড়া কোনোভাবেই বোঝা যাবে না। তাহলে আমরা আজ শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ডে কিংবা মূল্যবোধে যে অবক্ষয় দেখছিএর দায় কি শিক্ষার্থীদের একার নিজের? ভাবা জরুরি।

বস্তুত: একজন শিক্ষকই অচেনাঅজানা জীবনের সাথে শিক্ষার্থীর পরিচয় করিয়ে দেন। জানার আনন্দে শিক্ষার্থীদের মনে তখন যে নাচন ওঠে সেই নাচনের শব্দ বাইরের পৃথিবী শুনতে না পেলেও শিক্ষার্থীরা নিজের হৃদয়েই সেই নাচনের অপার্থিব আনন্দ অনুভব করতে পারে। এবং এভাবেই শিক্ষকরা এমন কিছু শিক্ষার্থীর জন্ম দেন যাঁরা সমাজের অন্ধকার দূরীভূত করে।

কিন্তু, শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা উস্‌কে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি ক্লাসের জন্য যে পরিশ্রমের প্রয়োজন হয়, তা কি সবাই করতে প্রস্তুত থাকেন? যে কারণে, ক্লাস না করেও আমরা দেখি বিগত বছরের গতানুগতিক ধাঁচের ‘পুরনো নোট’ যোগাড় করে পড়ে ‘ভালো’ ফলাফল করতে পারছে শিক্ষার্থীরা। সৃজনশীল মানুষ হওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদেরও লক্ষ্য হয়ে ওঠছেকম পরিশ্রমে যে কোন মূল্যে ‘ভালো’ ফলাফল করা। আর সেটি যদি হয় ক্লাস না করে তবে সেই সুবিধা নিতে শিক্ষার্থীরা ছাড়বে কেন?

অথচ এর পরিণাম কিন্তু ভোগ করতে হচ্ছে এই সমাজ, দেশ ও জাতিকে। যে কারণেশিক্ষিত জনগোষ্ঠী বাড়ছে কিন্তু সত্যিকার মানুষ তৈরি হচ্ছে না। মানুষেমানুষে তাই ব্যবধানও কমছে না। বরং বাড়ছে আত্মকেন্দ্রিকতা, জনবিচ্ছিন্নতা আর ভোগবাদিতা। শিক্ষকতা ‘মহান পেশা’এই অভিধাটি কেবলই ‘কাগুজে অভিধা’ হয়ে উঠছেযা ‘বুলি’ হিসেবেই কেবল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

পরিণতিতে, দিনদিন সামাজিক শ্রেণিপেশার স্তরবিন্যাসজনিত কাঠামো দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হচ্ছে। যেখানে মানুষ হওয়ার চেয়ে কিংবা মানবিক মূল্যবোধ ধারণ করার চেয়ে যেকোনো উপায়ে স্রেফ চাকুরি পাওয়াটাকেই বড় করে দেখা হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এখন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোমানুষ তৈরির চেয়ে চাকরিজীবী তৈরির ‘কারখানায়’ পরিণত হচ্ছে। ফলে, গতানুগতিক অচলায়তনকে আর ভাঙা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, অসাম্প্রদায়িক চেতনাবিরোধী মনোভাব, আত্মকেন্দ্রিক মানসিকতা, কূপমণ্ডুকতা ইত্যাদিরও ডালপালাও গজাচ্ছে একই কারণে। আর এসব কারণে দিনদিন নষ্ট হচ্ছে শিক্ষকছাত্রের সম্পর্ক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকশিক্ষার্থী একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন! কখনোকখনো নানাবিধ মানসিক চাপ সইতে না পেরে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে। হরহামেশা এই ধরনের ‘চাপের’ খবর পত্রপত্রিকায় উঠে আসছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দেখা দিচ্ছে ছাত্র অসন্তোষ ও অন্যান্য অরাজকতা। নিকট অতীতে ‘ছাত্র অসন্তোষ’এর কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল হতেও দেখা গেছে বহুবার। ছাত্ররাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, শিক্ষকরাজনীতির লেজুরবৃত্তি স্বভাব এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরির জন্য বড় দাগে দায়ী। আমরা শুনতে পাচ্ছিচাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে– ‘দক্ষ জনবল পাচ্ছি না।’ আর বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা বেকার যুবসম্প্রদায় বলছে– ‘পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র নাই।’ এমনি করেই চোখের সামনে শিক্ষক খুন হচ্ছেনসিংহভাগ শিক্ষার্থীরা ভাবলেশহীন হয়ে থাকেন আবার শিক্ষার্থীরা খুন হলে সিংহভাগ শিক্ষকরাও নির্বিকার হয়ে থাকেন। বিষয়গুলোর কার্যকারণ নিয়ে গবেষণা হওয়া দরকার।

মাঝে মাঝে ভাবিবিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কয়টা ক্লাস এখন হয় যা শিক্ষার্থীদের মনে নতুন প্রাণশক্তির সঞ্চার করে? কয়টা এমন ক্লাস শিক্ষার্থীদের জীবনে আসে যা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ববীক্ষণকেন্দ্র হিসেবে ভাবতে শিক্ষার্থীরা উস্‌কানি পায়? কয়টা ক্লাস হতাশাগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সামনে বেঁচে থাকার অনেকগুলো পথ খুলে দেয়? ভাবিকোনো একজন শিক্ষকের শ্রেণিকক্ষও যদি ওই ‘আত্মহত্যা উন্মুখ’ শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী টান দিতে পারতো তবে কি তাঁরা আত্মহত্যা করতো? আজকাল কয়টি ক্লাশ নিয়ে শিক্ষক নিজে তৃপ্তির ঢেকুর তুলেআবার কখন ক্লাস নেবেনসেই প্রতীক্ষায় থাকেন? “পরদিন ‘অমুক’ স্যারের ক্লাশ করতেই হবেযতই কাজ থাকুক” মনেমনে অমন ভাবনা নিয়ে কয়জন শিক্ষার্থী আজকাল ঘুমোতে যান? আর কতগুলো ক্লাস হয় প্রাণহীন এবং কেবল পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে উপস্থিতির হার বাড়ানোর জন্যে? কয়টি ক্লাশ হয় শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণহীন? বিষয়গুলো নিয়েও যথেষ্ট আলোচনা এবং কথা হওয়া দরকার।

আমি মনে করিএকজন শিক্ষক কতটুকু জানেন তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে তিনি যা জানেন তা কত ভালভাবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেনসেটা। কিন্তু তারও চেয়ে বড় কথা হচ্ছে তিনি যা জানেন তার কতটা তিনি মানেনসেটা। কারণ, শিক্ষার্থীরা সেটাই অনুসরণ বা অনুকরণ করেশিক্ষকরা যা করেনযা বলেন তা নয়। অর্থাৎ একজন শিক্ষক হচ্ছেন তাযা তিনি করেনযা বলেন তা তিনি নাও হতে পারেন। আমি স্নাতকোত্তর শেষ করা এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম– ‘কী করছো?’ সে উত্তরে বলেছিল– ‘আপাতত কিছুই করছি না।’ ‘কী করতে চাও’ পাল্টা এমন প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছিল– ‘কী করবো, এখনো ঠিক করি নাই।’ একই স্তরের আরেক শিক্ষার্থীকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে উত্তর দিয়েছিলো– ‘কিছু করছি না, তবে কিছু একটা করা উচিত, স্যার।’ খেয়াল করলে দেখা যাবেওই দুই শিক্ষার্থীরই বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পাঠ চুকানো হয়ে গেছে। কিন্তু, এখনো তাঁরা ঠিকই করেনিকী করবেকোন্‌ পেশায় যাবেকোনদিকে সে থিতু হবে।

অথচ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে অবস্থায়ই এই ‘জব্‌ পারপাস’টি স্পষ্ট হওয়ার কথা ছিল। যদি বিষয়টি তখন সুরাহা হতো তবে ওই লক্ষ্য ধরে ওই শিক্ষার্থীদ্বয় সামনের দিকে এগুতে পারতো। কিন্তু সেই কাজটি হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকানোর পরও। উপরের দুইজন শিক্ষার্থীদের মতো অবস্থা যে অসংখ্য শিক্ষার্থীদের সে তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কারণে, আমরা দেখিএদেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী তাঁদের পড়াশোনা শেষে এমন চাকরি করছেনযা তাঁরা নিজেরাই পছন্দ করে না। তাহলে সেই চাকরির প্রতি তাঁদের ভালোবাসা, আন্তরিকতা জন্মাবে কীভাবে? বিশেষ করে এইদেশের সরকারি চাকরিজীবীদেরভালোবাসার এই সংকট আছে বলে আমি মনে করি। যে কারণে বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠান দিনকে দিন ‘জনবিচ্ছিন্ন’ সেবাকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। তাহলে, এই দায় কার? এর ব্যর্থতা কার? শিক্ষাগুরুর কাজ যে অন্ধকার মনে আলো জ্বালানো অর্থাৎ মার্গ দর্শন করা সেই মোটিভেশনের জায়গায় কি আমরা শিক্ষকরা কড়া নাড়তে পারছি?

আবার মূল্যবোধের অবক্ষয় কিংবা নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে বাঁক নিচ্ছে এই ছাত্রসমাজের বিশাল একটা অংশ। আর্থিক লেনদেন বা রাজনৈতিক ‘মামাচাচা’ ব্যবহার করে যে কোনো উপায়ে চাকরি বাগানোর চেষ্টাএরই প্রমাণ। এবং এই পথ অনুসরণ করে একবার সেই চাকরি পেয়ে গেলে সেই শিক্ষার্থীর পক্ষে কি আদর্শবান মানুষ হিসেবে টিকে থাকার তাগিদ মনে বড় বেশি জায়গা করে নিতে পারে? অনৈতিকতার স্রোতে গা ভাসিয়ে সে যখন নগদ ‘সুখ’ লাভে অভ্যস্ত হয়ে যায় সেই জীবনের মোহ কাটিয়ে ওঠা তখন পরবর্তী জীবনে আর সম্ভব হয়ে ওঠে কি? আর হলেও কতটা?

তবে হ্যাঁ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সিক্রেট’ এটাই যেএখনও বহু পরিশ্রমী শিক্ষক রয়েছেন এদেশের বিশ্ববিদ্যালগুলোতে। তাঁরা বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে চিন্তা করে চলেছেন। বদৌলতে তাঁদের গলায় একটি ফুলের মালা না জুটলেও তাঁদের আনন্দ এখানেই যে বিশ্ববিদ্যালয়কে তাঁরা ‘স্লো পয়জনিং’এর হাত থেকে রক্ষা করে চলেছেন। সেইসব শিক্ষকদের সংস্পর্শে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী এখনো তাঁদের নিজনিজ জীবনের বঞ্চনার ইতিহাসকে পদদলিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাথা উঁচু করে চলেছে। সেইসব শিক্ষকদের কারণেই এখনো ভাষা পায় শিক্ষার্থীদের অনুচ্চারিত স্বপ্নগুলো, ডানা মেলে তাঁদের অসম্ভবকে সম্ভব করার ইচ্ছেগুলো। আমি তাঁদের স্যালুট জানাই।

শিক্ষার্থীদের যে কোনো ক্ষয় তো বটেই, বিশ্ববিদ্যালয়কেও ক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখেন তাঁরা। আলোকিত সমাজ, রাষ্ট্র এমনকি সভ্য পৃথিবীর হৃদয়ে তাই শিক্ষকরা বসবাস করেন। এই হৃদযন্ত্রে শিক্ষকরা সক্রিয় না হলে সভ্যতার পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় যে কেবল ‘চাকরিজীবী’ তৈরির কারখানা নয় বরং সত্যিকারের মানুষ তৈরির সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক বিদ্যাপীঠএ সত্য ভুলে গেলে আমাদের চলবে কি?

x