বিশ্বকাপের ফেবারিট তত্ত্ব

সৈকত বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ১:০২ অপরাহ্ণ
74

কাল বাদে পরশু ঈদ। ঈদ আনন্দের আগাম সৌরভ এখন বাংলার প্রতিটি পরিবারে। উৎসবপ্রবণ বাঙালির ঈদ উৎসবের সাথে অন্য কোন উৎসবের তুলনা হয় নাকি? তবে এবার ঈদ উৎসবে ভাগ বসাতে এসেছে আরেকটি উৎসব। চার বছরের প্রতীক্ষা পেরিয়ে আজ ফিরেছে ফুটবলের বিশ্বকাপ। যদিও উৎসবের মূল মঞ্চ সুদূর রাশিয়ায়। তারপরও বিশ্বকাপ ফুটবল বলে কথা। তর্কাতীতভাবে সেই উৎসবের ঢেউ সারা বিশ্বকে রাঙিয়ে এসে পড়েছে এই বাঙাল মুলুক্কেও। ক্ষেত্র বিশেষে কোন কোন দেশকে ছাড়িয়ে যায় বাঙালির ফুটবল উন্মাদনা। শুধুমাত্রই দর্শকের ভূমিকায় থাকা বাঙালির ফুটবল রোমাঞ্চ মাত্রাতিরিক্তভাবে জাগ্রত হয় এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে। ফুটবলের পালে হাওয়া লাগিয়ে উড়ু উড়ু হবে বাংলার ফুটবল প্রেমীদের মন। শুধু ফুটবল প্রেমী কেন, ফুটবল বিমুখরাও এই এক মাস মেতে উঠবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, স্পেন করতে করতে। গলা ফাটাবে মেসি, নেইমার, রোনালদোর নাম নিতে নিতে। পতপত করে ভিনদেশি পতাকা উড়াবে ছাঁদে, মাঠে, ঘাটে। কেউ হাসতে হাসতে উল্লাসে মাতবে, কেউ বুকের কোনে জমাট কষ্ট চেপে মুখ বুজে কান্নায় নুয়ে পড়বে। আর শেষ পর্যন্ত ভুলেই যাবে নিজেরা বিশ্বকাপে নিতান্তই দর্শকের ভূমিকায়।

বিশ্বকাপ চলাকালীন সবাই ফুটবল নিয়ে মত্ত হবে স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বকাপের ফেবারিটদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে আরো আগে থেকেই। বিশ্বকাপে নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য এবং দলগুলোর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স দিয়েই বিবেচনা হয় ফেবারিটদের। আর সবসময় এ তত্ত্ব যে ফলে যায় সেটাও কিন্তু নয়। তারপরও থেমে থাকে না আলোচনা। স্কুল, কলেজ, অফিসআদালত, চায়ের দোকান সহ সর্বত্রই তর্ক বিতর্ক। এবারও ব্যতিক্রম নয়। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কারা এগিয়ে থাকছে রাশিয়ায়? ৩২২ কোটি টাকার চ্যাম্পিয়ন মানি সহ সোনার ট্রফি বাগাতে কাদের পাল্লা ভারী? ১৫ জুলাই মস্কোর লুঝকিনি স্টেডিয়ামে কোন দল মাতবে শিরোপা উল্লাসে? আর এটা নিয়ে বিশ্বকাপের নিয়মিত দর্শক বাঙালির ঘুম হারাম। ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন ও আর্জেন্টিনা। টপ ফেবারিট হিসেবে এবার যারা তালিকার উর্ধ্বে। তবে ডাক হর্স হিসেবে পাশার দান উল্টে দেয়ার ক্ষমতা আছে ইংল্যান্ড, বেলজিয়াম, পর্তুগাল, উরুগুয়ে ও ক্রোয়েশিয়ার। বাকী থাকে ইতালি আর হল্যান্ড। এই দু’দেশ শিরোপা পাচ্ছে না এবার। চার বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালি ও তিনবারের ফাইনালিস্ট হল্যান্ড এবার বিশ্বকাপে দর্শকের ভূমিকায়। আর এর বাইরে যদি কোন দেশ ট্রফি বাগিয়ে বিশ্ব সেরার মুকুট অর্জন করতে পারে সেটা হবে চলতি শতাব্দীতে বিশ্ব ফুটবলে সেরা অঘটন। তাই আপাতত অঘটনের চিন্তা দুরে ঠেলে সেরাদের নিয়েই আলোচনা হউক।

ব্রাজিল : বিশ্বকাপ ফুটবল আর ব্রাজিল; এই দু’ই যেন সমার্থক। ফুটবল ঈশ্বর ব্রাজিলকে দু’ হাত ভরেই দিয়েছে। সোনায় মোড়ানো সব সাফল্য। এ পর্যন্ত সব কটি আসরে অংশ নেয়ার রেকর্ড তাদের। সর্বোচ্চ পাঁচবার বিশ্বসেরা ট্রফিও এই দেশটির। দু’বারের রানার্সআপও তারা। ১৯৬৬ বিশ্বকাপ ছাড়া আর কখনোই গ্রুপ পর্ব থেকেও বাদ পড়েনি। এবার এসেছে ‘হেক্সা’ অর্থাৎ ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের মিশনে। আর এই মিশনেও ফেবারিট তত্ত্বে সবার উপরেই নাম তাদের। যদিও গত বিশ্বকাপে এক চরম লজ্জার ইতিহাস করেছে ব্রাজিলিয়ানরা। সেমিতে জার্মানদের কাছে হজম করেছে সাতসাতটি গোল। পুরো বিশ্ববাসীকে টালমাটাল করে ফেলেছিল সেই ফল। তবে ব্রাজিলের সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের কাছে খেই হারিয়ে যাচ্ছে সেই ক্ষত। ২০১৪ বিশ্বকাপে স্বাগতিক হিসেবে তারা ছিল শিরোপার অন্যতম দাবিদার। সব ঠিকঠাক চললেও সেমিতে গিয়েই পথ হারানো। জার্মানির কাছে বিধস্ত হওয়া। এরপর থেকেই বিশ্ব ফুটবলে নিন্মদিকে পথচলা। তবে বেশিদিন এই ধারা থাকেনি। ফিরেছে ‘জোগো বনিতা’য় মানে জয়ের ধারায়। ক্রমাগত ব্যর্থতায় পথ হারানো দুঙ্গার পরিবর্তে দায়িত্ব বর্তায় অনেকটা অপরিচিত তিতের উপর। আর সেই তিতের অধীনে সর্বশেষ ২০ টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ব্রাজিলের পরাজয় মাত্র একটিতে। ল্যাটিন আমেরিকা থেকে যেখানে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে হয়েছে বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে এসে, সেখানে ব্রাজিল নিশ্চিত করেছে চার ম্যাচ বাকী থাকতেই। তবে তারপরও কিছুটা শংকা ছিল। ব্রাজিলের আকাশে কিছুটা কালো মেঘ ভর করেছিল। একটু অস্বস্তি গলায় হালকা কাটা বাঁধার মত বিধে ছিল। এখন সেটাও ঊধাও। কারণ তাদের স্বপ্নসারথী, বিশ্বফুটবলের নতুন যুবরাজ, নেইমার পুরোপুরি ফিট। মাঠে নেমেছেন এবং গোলও করেছেন বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচে। অপেক্ষা ১৭ জুন সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে মাঠে নামার। আর ফুটবলের সর্বোচ্চ আঙ্গিনায় এসে নেইমার বাকী শিল্পীদের নিয়ে সফলভাবে তুলির শেষ আচড়টা দিতে পারলেই রাশিয়ায় আরেকবার ট্রফি হাতে উল্লাসে মাততে পারে ব্রাজিল।

আর্জেন্টিনা : বর্তমান ফুটবল র‌্যাংকিংয়ে ৫ম স্থানের দল আর্জেন্টিনা। তবে এবার এতটুকু আশাও তাদের কাছে কেউ করত না, যদি না মেসি নামের এক ভিনগ্রহের ফুটবলার এই দলটিতে না থাকত। ফুটবল যেমন মেসিকে দু’হাত ভরে দিয়েছে, তদ্রুপ মেসিও ফুটবল দুনিয়াকে কম দেখাননি। সারা বিশ্বের ফুটবল দর্শকদের মোহবিষ্ট করে রেখেছে মেসির পায়ের জাদু। ক্লাব ফুটবলে মেসি যা করেন বা করে দেখান তাতে খেলা শেষে অনেকেই আপনমনে চিমটি কাটেন। আর ভাবেনযা দেখলাম ঠিক দেখলাম তো। আর্জেন্টিনাব্রাজিলের জন্য মানুষ যেমন হাসেকাঁদে, তদ্রুপ মেসির জন্যও মানুষ কাঁদে। গত বিশ্বকাপের ফাইনালের হারের পর মানুষ যতটা না আর্জেন্টিনার জন্য কেঁদেছে তার চাইতে বেশি কষ্ট পেয়েছে মেসির জন্য। এই একটা খেলোয়াড়ের খেলোয়াড়ী জীবনে অর্জন বলতে বাকী নেই আর কিছুই। মেসিকে নিয়ে বলতে বা লিখতে গেলে তার শেষ কোথায় হবে সেটার কোন নিশ্চয়তাই নেই। কিন্তু দেশের হয়ে মেসিকে কিছু দিতে বিধাতা যেন বড়ই কৃপন। গেল বিশ্বকাপের স্মৃতিতো এখনো তরতাজা। এর বাইরে কোপা আমেরিকা অর্থাৎ ল্যাটিন আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে সর্বশেষ দু’বার রানার্সআপ। অর্থাৎ দেশের হয়ে বৈশ্বিক কোন শিরোপার স্বপ্ন এখনো অধরা। গত কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্যর্থ হওয়ার পর অভিমানে দল থেকেই অবসরই নিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোটি কোটি দর্শকের ভালবাসার টানে আবার ফিরে এসেছেন মাঠে। শুধু ফিরেননি, দলকে এবারের বিশ্বকাপে এনেছেন মেসিই। বাছাইপর্বের শেষ ম্যাচে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় ইকুয়েডরের বিপক্ষে হ্যাট্রিক করে দলকে রাশিয়ার টিকেট এনে দিয়েছেন ঈশ্বর প্রদত্ত এই অনন্য প্রতিভা। সেদিন একটু এদিক ওদিক হলেই, অন্যান্য ম্যাচগুলোর ফলাফল অন্যরকম হলে আজ ফুটবলের সেরা মঞ্চে দর্শক হয়েই থাকতে হত মেসিকে। সেটা হত আরেক ট্র্যাজেডি।

এবার নিয়ে সতেরতম বারের মত বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলটির প্রতি বাঙালির আবেগ, ভালোবাসা খোদ আর্জেন্টাইনরাও কল্পনা করতে পারবেন না। ম্যারোডোনা নামের এক ফুটবল জাদুকরের কারনেই বাংলার মানুষের আর্জেন্টাইন প্রীতি। অনেকটা জাদুর মত করেই বাঙালিকে মোহবিষ্ট করে ফেলেছেন ম্যারাডোনা। যেই ভ্রম এখনো কাটেইনি, উল্টো বেড়ে চলেছে দিনকে দিন। কিন্তু তার প্রতিদান পাচ্ছে কই? সেই যে ৮৬ তে চ্যাম্পিয়ন হল, এরপর ৯০ তে এবং গতবার রানার্সআপ। এর বাইরে প্রতিবারই চরম ব্যর্থ। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল যেখানে পাঁচবার শিরোপা ঘরে তুলেছে, সেখানে আর্জেন্টিনার ঘরে শিরোপা মাত্র দুটি। তাও একবার ম্যারোডোনা জাদুতে। এবার কি পারবেন মেসি বাঙালির ভালোবাসার প্রতিদান দিতে? হয়তো পারবেন, নয়তো পারবেন না। আশান্বিত হওয়ার মত লোকের সংখ্যা কম। বিশ্বাস শুধুমাত্র মেসির উপরই। এই আর্জেন্টিনা দলটিতে ইতিহাস বদলানোর ক্ষমতা মেসির একারই। সাথে অবশ্য অ্যাগুয়েরো, হিগুয়াইন, মাসচেরানো, রোহো, ডি মারিয়া এবং হালের সাড়া জাগানো পাওলো দিবালা আছেন। কিন্তু তাদের উপর আর কয়জনেরই বা ভরসা। ক্লাব ফুটবলে বড় বড় নাম হলেও জাতীয় দলে অংশগ্রহনটাই সাড়। এছাড়া গোলবারে আস্থা রাখার মত সার্জি রোমেরোর খেলতে না পারাটা আর্জেন্টিনার জন্য বড় ধাক্কা। তারপরও একজন মেসি আছে বলেই আর্জেন্টিনাকে নিয়ে বাজি ধরা যায়, স্বপ্ন দেখা যায়। হয়তো ফুটবল ঈশ্বর চান, মেসিকে খেলোয়াড়ি জীবনের শেষ পর্যায়ে সর্বোচ্চ উপহারটুকু দিবেন। যাতে অমরত্বটা নিশ্চিত হয়। আর যদি তা না হয়, বিশ্বকাপ ফুটবলটা চির আক্ষেপই হয়ে থাকবে তার জন্যে। তাই এবার ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটানোর আশায় শেষবারের মত আস্থা রাখুন, চোখ রাখুন আর্জেন্টিনার উপর, মেসির উপর।

জার্মানি : বাঙালির ভালবাসা ব্রাজিলআর্জেন্টিনার প্রতি যতটুকু, তার ধারে কাছেও নেই জার্মানরা। হয়তো হিটলারের কারণে। হিটলারকে ঘৃণা করতে গিয়ে জার্মানদের পছন্দ না করা। তবে গত কয়েকটি বিশ্বকাপের পর কিছুটা পাল্টাচ্ছে এ চিত্র। এখন ব্রাজিলআর্জেন্টিনার মত জার্মান পতাকাও শোভা পায় বাংলার আকাশে বাতাসে। অবশ্য বাঙালির ভালবাসায় কি আসে যায় তাদের! ব্রাজিলের পর বিশ্বকাপ ফুটবলে আরেক সফল দল জার্মানি। এবার সহ ১৯ বারের মত বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে তারা। আর শিরোপা সুবাস নিয়েছে ৪ বার। সমান ৪ বারের রানার্সআপও তারা। সবচেয়ে বড় পরিচয়বর্তমান চ্যাম্পিয়ন জার্মানি। গেলবার ফুটবল স্বর্গ মারাকানায় আর্জেন্টাইদের কাদিয়ে শিরোপা জয় করেছে ফিলিম লামের দল।

ফুটবল মাঠে জার্মানদের পরিচয় হচ্ছে একদল যন্ত্র শ্রমিক। নিবিড় নিরবচ্ছিন্নভাবে তারা অনবরত কাজ করে যায় খেলার মাঠে। এজন্য তাদের কোন দরকার পড়ে না পেলেম্যারাডোনা কিংবা হালে মেসিরোনালদোনেইমারের মত অমিত প্রতিভার। তবে এখন এই যান্ত্রিক ফুটবলাররা ফুটবল শিল্পটাও রপ্ত করে নিয়েছেন ভালমতেই। শিল্প আর যন্ত্রের মিশ্রন এখন জার্মান ফুটবল। আর তাই ২০০২ তে রানার্সআপ, ২০০৬ আর ২০১০ এ তৃতীয় এবং গেলবার বিশ্বসেরা। এবারও জার্মানরা দাবীদার সেরা হওয়ার। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবল র‌্যাংকিংএ প্রথম স্থানেই তাদের অবস্থান। এছাড়া বাছাইপর্বের ১০ ম্যাচে সবকটিতেই জয়। ২০১৬ ইউরো ফুটবলে সেমিতে ফ্রান্সের কাছে হারলেও সর্বশেষ কনফেডারেশন কাপের শিরোপা বিশ্বসেরাদের আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া লাগাতে যথেস্ট। মেঙিকো, সুইডেন এবং দক্ষিণ কোরিয়াকে নিয়ে প্রথম পর্ব তাদের।

জার্মানদের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রথাগত তারকা প্রথায় নির্ভর না করা। লোথার ম্যাথিউস, ইয়ুগেন ক্লিন্সম্যান, মিরোস্লাভ ক্লোসারা সবাই বিশ্বকাপ ফুটবলে ইতিহাস সৃষ্টি করলেও দলে ওয়ান ম্যান শো হয়ে যাননি। গত বিশ্বকাপের কথাই ধরুন না। ক্লোসা, মুলার, গোমেজ থাকার পরও ফাইনালে গোল করে দলকে শিরোপা পাইয়ে দেন বদলী নামা মারিও গোটশে। অথচ সেই গোটশেই এবার নেই। আছেন টমাস মুলার, মারিও গোমেজরা। সাথে টনি ক্রুম, জশুয়া কিমিচ, মেসুত ওজিল, জেরোম বোয়াংটে, স্যামি খেদিরাদের মত পরীক্ষিতরা আছেন। আর গোলবারে গেলবারের আস্থা নয়ার সুস্থ হয়ে উঠেছেন এবং প্রস্তুতি ম্যাচে খেলেছেন। বিকল্প হিসেবে বার্সেলোনার আন্দ্রে টেল স্টেগারও প্রস্তুত। জার্মান গোলবারে সময়ের সেরা দুই গোলরক্ষক। তবে তাদের বড় শক্তি কোচ জোয়াকিম লো। টানা তৃতীয়বারের মত বিশ্বকাপে যাচ্ছেন কোচ হিসেবে। রেকর্ডের অংশীদার হয়ে। ২০০২ও ছিলেন ক্লিন্সম্যানের সহকারী হিসেবে। তাই জার্মান দলটির সবচেয়ে বড় শক্তি লো। কারণ এই দলটির নাড়ী নক্ষত্র সবই জানা তার। এখন অপেক্ষা কতদুর যেতে পারেন রাশিয়ায়। তবে এ মুহুর্তে কিছুটা দুশ্চিন্তা প্রস্তুতি ম্যাচে হেরে যাওয়া। অবশ্য মূল পর্বে জার্মানরা অন্য ধাচের। বাজী ধরাই যায় তাদের নিয়ে।

ফ্রান্স : ইতিহাস আর ঐতিহ্যে কোনভাবেই ব্রাজিল আর জার্মানদের সমকক্ষ নয়। এবারের আসর সহ সর্বমোট ১৫ টি আসরে অংশ নিয়ে বিশ্বসেরার তকমা পেয়েছে একবারই। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে স্বাগতিক হয়ে। এরপর ২০০৬ সালে আরেকবার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। কিন্তু পারেনি। আর সেটা বিশ্বকাপের ইতিহাসে আরেকটি অদ্ভুতুড়ে ঘটনার জন্ম দিয়েই। এ প্রজন্মের অনেক দর্শকই যার স্বাক্ষী। পুরনো কথা, তারপরও বলছি। আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের কথাই বলি। জিনেদাইন জিদান নামক এক ফুটবল জাদুকরের জাদুর উপর ভর করেই সেবার স্বাগতিকরা ইতিহাস সৃষ্টি করেছিল। ফাইনালে জিদানের দু’দুটি গোলই ব্রাজিলকে ছিটকে দেয় শিরোপা থেকে। আর সেই জিজুর (ফরাসীরা আদর করে ডাকে ‘জিজু’) সামান্য একটু হটকারিতায় কাছে গিয়েও দ্বিতীয়বার শিরোপাবঞ্চিত ফ্রান্স। ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জির ফাঁদে পা দিয়ে মাথা গরম করে মাতেরাজ্জিকে ঢুস মেরে বসেন জিদান । আর ফলাফল লাল কার্ড। সেদিন জিজু যদি শেষ পর্যন্ত মাঠে থাকতে পারতেন তাহলে হয়তো অন্যভাবেও লেখা হতে পারত বিশ্বকাপের ইতিহাস। আরেকটা শিরোপা জিতে আরও বর্নিল করতে পারতেন ক্যারিয়ার।

সে যাই হোক, জিদান পরবর্তী ফ্রান্স একেবারেই সাদামাঠা দল হয়ে যায়। বর্তমানে পরিস্থিতি অন্যরকম। ১৯৯৮ এ অধিনায়ক হিসেবে শিরোপা জেতা দিদিয়ের দেশম এখন দলটির কোচ। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে মাত্র একটি ম্যাচেই হেরেছে তারা। দীর্ঘদিন ধরে দলটিকে এক সুতোয় গেঁথে রাখার কাজটি বেশ সফলভাবেই করছেন দেশম। পেয়েছেন সময়ের একঝাঁক সেরা ফুটবলারদের। গোল পোস্ট, রক্ষণ, মাঝমাঠ ও আক্রমণভাগ সব জায়গাতেই প্রতিভাবান ও তর্কাতীতভাবে বিশ্বসেরারা আছেন দেশমের হাতে। ২০১৬ ইউরোতে ফাইনালে পর্তুগালের কাছে হারলেও জিদান পরবর্তী প্রজন্ম জানান দিয়েছিল তাদের আগমনীবার্তা। নামগুলো উল্লেখ না করলেই নয়। আক্রমণভাগে আছেনগ্রিজম্যান, এমবাপ্পে, জিরুদ, দেম্বেলে। কাকে রেখে কাকে নামাবেন কোচ! নিশ্চিতভাবে মধুর সমস্যায় পড়বেন দেশম। এই আক্রমণভাগ আছে বলেই তিনি সাহস করেছেন করিম বেনজেমার মত খেলোয়াড়কে বাদ দিতে। মাঝমাঠে কিছুদিনের জন্য হলেও বিশ্বের সবচেয়ে দামী ফুটবলার ম্যানেচেস্টারের পল পগবা, চেলসির কান্তে, মোনাকের লেমারের সাথে রক্ষণে আছেন রিয়ালের ভারানে, বার্সার উমতিতি, পিএসজির কুরজাওয়া ও ম্যান সিটির বেঞ্জামিন আর গোলবারে অভিজ্ঞ হুগো লরেস। অর্থাৎ সেরা একাদশেই বিশ্বের সব সেরারা। গ্রুপে তাদের প্রতিপক্ষ পেরু, ডেনমার্ক ও অস্ট্রেলিয়া।

স্পেন : ফরাসীদের মত একবারই তাদের বিশ্বজয়। সেটা ২০১০ সালে। এই আসরটি ছাড়া বিশ্বকাপে তাদের তেমন কোন সাফল্য নেই। সর্বোচ্চ দৌঁড় ছিল কোয়াটার ফাইনাল পর্যন্ত। এবার ভিন্ন ফর্মেই বিশ্বকাপে জায়গা পেয়েছে। প্রবল প্রতাপে বাছাইপর্বে কোন ম্যাচ না হেরে শতভাগ সাফল্য নিয়ে মূল পর্বে স্পেন। আরও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছেএবার ইতালি মূল পর্বে আসতে পারেনি পরাক্রমশালী স্পেনের কারনেই। কারণ বাছাইপর্বে ইতালী আর স্পেন ছিল একই গ্রুপে। মাস দুয়েক আগে আর্জেন্টিনার মত দলকে প্রস্তুতি ম্যাচে ৬ গোলে হারিয়েছে স্পেন। তাই এই দুর্ধর্ষ ফর্মের স্পেনের মুখোমুখি হতে ভয় পাবেন যে কোন দলই। সর্বশেষ কয়েকটি আসরেও স্পেন ছিল ফেবারিটের তালিকায়। কিন্তু ২০১০ সালের শিরোপা জয়ের পরেরবার ২০১৪ তে প্রথম পর্বেই বাদ পড়ে তারা। তাই স্পেন নিয়ে বাজি ধরাটা একটু ঝুকিরও বটে।

অবশ্য বাজি ধরার মত যথেষ্ট উপদান রয়েছে দলটির। যেটা পরিষ্কার হবে খেলোয়াড় তালিকায় চোখ বোলালেই। ডেভিড ডি গিয়া, সার্জি র‌্যামোস, জেরার্ড পিকে, সার্জি বুসকেটস, জর্ডি আলবা, দানি কারভাহাল, আন্দ্রে ইনিয়েস্তা, মার্কো অ্যাসেনসিও, ইসকো, মোরাতা, ডেভিড সিলভা, ডিয়েগো কস্তা। আর এই দল নিয়ে শিরোপা না পাওয়া মানেই ব্যর্থতা। র‌্যামোস, পিকে, সিলভা, ইনিয়েস্তা ও কস্তাদের মত সোনালী প্রজন্মের কাছে এটাই হতে পারে আরেকবার বিশ্বকাপ জয়ের সর্বশেষ সুযোগ। এবার শুরুটাও হচ্ছে পর্তুগালের মত দলের বিপক্ষে খেলা দিয়েই। অবশ্য সেটা তাদের চাইতেও পর্তুগীজদের জন্যই যথেষ্ট ভয়ের। আর স্পেন যদি এ বাঁধা নির্বিঘ্নে অতিক্রম করতে পারে, গ্রুপের বাকী দুই দলমরক্কো আর ইরান কোন বাঁধা হওয়ার কথা নয়। দুর্দান্ত ছন্দের এই স্পেন যদি পুরো আসরে ছন্দ ধরে রাখতে পারে শিরোপা জয় কঠিন হওয়ার কথা নয়।

এতো গেল বিশ্বকাপের সেরাদের সেরা নিয়েই কথা। এদের বাইরে হিসাব উল্টানোর ক্ষমতা আছে বেশ কয়েকটা দেশের। যাদের মধ্যে সবার উপরে আসবে পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, উরুগুয়ে ও বেলজিয়ামের কথা। মাত্র ষষ্ঠবারের মত বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া পর্তুগীজদের সেরা সাফল্য ১৯৬৬ তে তৃতীয় এবং ২০০৬ এ চতুর্থ হওয়া। তবে এ দলটিকে হিসাবে রাখতে হয় রোনালদো নামের পর্তুগীজ যুবরাজের কারণে। এই বিশ্বে বর্তমান সময়ে মেসির সাথে টেক্কা দিয়ে ফুটবল থেকে সব সাফল্য অর্জন করেছেন অদম্য রোনালদো। বর্তমান ফুটবল বিশ্বকে যদি দুই ভাগ হয়, তার একপাশে থাকবেন মেসি আর অন্যপাশে রোনালদো। লড়াকু মানসকিতা যার চরিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য। পরাজয়ের মানসিকতা তার কাছে বড়ই বেমানান। এবার বাছাইপর্বে বেশদাপট ছিল পুর্তগালের। আর সর্বশেষ ইউরো কাপে ইউরোপ সেরা তারাই। টেক্কা দিয়েছে জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মত বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। তাই শেষবারের মত বিশ্বকাপে অংশ নিতে যাওয়া রোনালদো এবার আরেকবার মরণকামড় দিতে চাইবে বাকী দলগুলোকে। এই পথে সঙ্গী পাচ্ছেন সময়ের দুই সেরা ফুটবলার এসি মিলানের আন্দ্রে সিলভা ও ম্যানচেস্টার সিটির বার্নাদো সিলভাকে। যাদের উপর খুব আস্থা রোনালদোর নিজেরও। তবে কাজটা কঠিন হবে শুরু থেকেই। কারণ দ্বিতীয় দিনেই প্রথম ম্যাচে স্পেনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে রোনালদোকে।

১৯৬৬ সালের একবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। এরপর থেকে আর তেমন কোন সাফল্য নেই দলটির। এবারও তাদের নিয়ে তেমন মাতামাতি নেই। কারণ সর্বশেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টগুলোর ব্যর্থতা। অবশ্য বাছাইপর্বে বেশ দাপুটেই ছিল দলটি। সেরা তারকা বলতে ইংলিশ লিগে টটেনহামের হয়ে মাঠ মাতানো হারি কেন। তারুণ্যনির্ভর এই দলটির কোচ গ্যারেথ সাউথগেট। তবে কঠিন প্রতিপক্ষ পাচ্ছে ইংল্যান্ড। গ্রুপ পর্বেই দেখা হবে প্রতিভাবান খেলোয়াড়ে ভরপুর বেলজিয়ামের। ভিনসেন্ট কোম্পাানি, এলেন হ্যাজার্ড, ডি ব্রুইনা, কোর্তোয়া, ভারমিলেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে বেলজিয়ামের দৌড় প্রথম রাউন্ড বা দ্বিতীয় রাউন্ড পর্যন্ত। সেরা ফলাফল ১৯৮৬ তে চতুর্থ হওয়া। এবার এই সোনালী প্রজন্মকে নিয়ে স্বপ্ন দেখছে বেলজিয়ামের মানুষ। এছাড়া বাছাইয়ে প্রতিপক্ষকে দুমড়ে মুচড়ে দেওয়া সব জয় তাদের।

তুলনায় উরুগুয়ের ইতিহাস বেশ উজ্জ্বল। বিশ্বকাপের প্রথম আসরে এবং ১৯৫০ এ ইতিহাস সৃষ্টি করে সেসময়ের পরাক্রমশালী ব্রাজিলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন তারা। মাঝখানে বিবর্ণ। এখন আবার আলো ছড়াচ্ছেন বিশ্ব ফুটবলে। বাছাইপর্বে ব্রাজিলের পরই যাদের অবস্থান। ২০১০ এ চতুর্থ হয়েছিল তারা। এবারও ভাল কিছু করতে প্রত্যয়ী। তবে শর্ত একটাই। জ্বলে উঠতে হবে বর্তমান বিশ্বের দুই সেরা স্ট্রাইকার লুইস সুয়ারেজ ও এডিনসন কাভানি। এই জুটি এবারের বিশ্বকাপের সেরা স্ট্রাইকিং জুটি। নিজেদের দিনে প্রতিপক্ষকে ছন্নছাড়া করে দেয়ার ক্ষমতা তাদের। কোচ অস্কার তাবারেজ এ নিয়ে টানা তৃতীয়বার উরুগুয়ের সাথে। স্বাগতিক রাশিয়া, মিশর ও সৌদি আরবকে নিয়ে গড়া গ্রুপ পর্ব এই দলটির সহজেই পেরোনোর কথা। এছাড়া রাশিয়া বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দারুণ খেলা সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, ল্যাটিন আমেরিকার কলম্বিয়া, ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডের দল বলে পরিচিত পাওয়া মেক্সিকো কিছু একটা করে বসলে সেটা হবে সেরা অঘটন। বাকী দলগুলোকে নিয়ে বাজি না ধরলেও চলে। তবে সেই ঝুঁকিতে যাওয়ার দরকার কি! উপভোগ করুন বিশ্বের সেরা ৩২ দলের অংশ নেওয়া পুরো টুর্নামেন্টটাই। উৎসবে মাতুন পুরো মাস জুড়ে। নিশ্চিত থাকুন ঠকবেন না। হয়তো আপনার প্রিয় দল বা টপ ফেবারিট দলটি শিরোপা জিততে পারেনি। তাতে কি? কোন না কোন পরাশক্তিতোর দেখা তো মিলবেই।

x