বিশ্বকাপের আলোচনায়ও ওরা তিন জন

ইন্তেজাম ইমরান

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ১:০৩ অপরাহ্ণ
56

বিশ্ব আসে চার বছর পরপর। আলোচনার ঝড় উঠে বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। জল্পনাকল্পনা চলে কে জিতবে বিশ্বকাপ। কে হবেন সেরা খেলোয়াড়। কার হাতে উঠবে গোল্ডেন বল। কিন্তু এখন যেন সারা বছরই চলে বিশ্বকাপ। কারণ বিশেষ করে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের কারণে বিশ্বের সেরা তারকাদের নাড়ি নক্ষত্র এখন দর্শকদের নখ দর্পণে। ইউরোপের ফুটবল কিংবা সারা বছরের বিশ্ব ফুটবলের কথা আসলেই একটি বিতর্ক চলে আসে। আর তা হলো বিশ্ব ফুটবলে কে সেরা। লিওনেল মেসি নাকি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। এই বিতর্ক অন্তত গত দশ বছর ধরে চলে আসছে। মেসিরোনালদোর এই চিরন্তন বিতর্কে তৃতীয় কেউ খুব কমই এসেছে। তবে গত দুই বছর ধরে এই বিতর্কে যোগ হয়েছে ব্রাজিলীয়ান তারকা নেইমার। তাই বিশ্ব ফুটবলে এখন আলোচনাটা মেসিনেইমার এবং রোনালদোর মধ্যে ঘুরপাক খায়।

কিন্তু বিশ্বকাপ এলেই যেন বিতর্কটা ভিন্ন রূপ নেয়। বিশ্বকাপ মানেই আলোচনায় আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। বিশ্বকাপের গত ২০টি আসরে মাত্র সাতবার শিরোপা জিতেছে আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল। বাকি ১৩টি জিতেছে অন্যরা। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রে ঠিকই আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিল আর সেখানে নিশ্চিতভাবেই আলোচনায় উঠে আসে মেসি এবং নেইমার। বরাবরের মত এবারেও তাই আলোচনা হচ্ছে কে জিতবে বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনা নাকি ব্রাজিল। মেসি নাকি নেইমার। তবে ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের মত এবারের আলোচনায় যুক্ত হচ্ছে আরেকটি নাম। আর সেটি হচ্ছে রোনালদো। বিশ্বকাপে কখনোই রোনালদোর পর্তুগালকে ফেভারিট ধরেনি কেউই। ফলে মেসিনেইমারের দ্বৈরথে কখনোই যুক্ত হয়নি রোনালদোর নাম।

এক সময় পর্তুগালের সোনালী যুগ বলা হতো ফিগোদের আমলকে। কিন্তু সে ফিগোরাই পারেনি পর্তুগালকে বিশ্বকাপ জেতাতে। এমনকি ইউরোপ সেরার ট্রফিটাও পর্তুগালে নিতে পারেননি ফিগোরা। তবে সে ধারায় বদল এনেছে রোনালদো। তার দল এখন ইউরোপ সেরা। যা করে দেখাতে পারেনি দুইবার কোপা আমেরিকা কাপের ফাইনালে গিয়েও মেসির আর্জেন্টিনা কিংবা নেইমারের ব্রাজিল। তাই অনেকেই গণনায় আনছে তাদেরকে বিশ্বকাপের আসরেও। তবে কে জিতবে বিশ্বকাপ সে আলোচনার চাইতে এখন আলোচনায় এসেছে মেসি নেইমারের পাশাপাশি রোনালদোর নামও। বিশ্বকাপ মাতাবে এই তিন জনই। তবে কার হাতে উঠবে শিরোপা সে হিসেবটাও কষছেন অনেকেই। আর সে তালিকায় রোনালদোর পর্তুগালের নাম যোগ হয়েছে এবার।

তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে এখন আলোচনায় বিশ্ব ফুটবলের তিন যুবরাজ মেসিনেইমার এবং রোনালদো। বিশ্বকাপে মেসি এবং রোনালদো অংশ নিচ্ছে চতুর্থ বারের মত। কিন্তু নেইমারের জন্য সেটি দ্বিতীয়বার। যদিও জাতীয় দলের হয়ে তিন জনেরই পারফরম্যান্স প্রায় সমানে সমান। অবশ্য নেইমারের জন্য প্রথম বিশ্বকাপটা মোটেও সুখকর নয়। গত বিশ্বকাপে নিজেদের মাঠের তিক্ত অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই ভুলে যেতে চাইবেন। সে আসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন নেইমার। আর মাঠে ফেরা হয়নি। সেমি ফাইনালে তার দল ৭১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল জার্মানির কাছে। কাজেই সে হতাশা ভুলে এবার নতুন করে শুরু করতে চাইবেন নেইমার সেটা নিশ্চয়ই বলা যায়। একবার মাত্র বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে গোল করেছেন নেইমার ৪টি। যেখানে মেসি কিংবা রোনালদো তিনবার করে অংশ নিয়ে করেছেন যথাক্রমে ৫ এবং ৩ গোল। ২০১৮ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে অবশ্য রোনালদো ছাড়িয়ে বাকি দুজনকে। যেখানে রোনালদো করেছেন ১৫ গোল সেখানে মেসি এবং নেইমার করেছেন যথাক্রমে ৭ এবং ৬ গোল।

২০০৬ সালে একই আসরে বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল মেসি এবং রোনালদোর। কিন্তু সফল হতে পারেননি দুজনই। মেসিতো খেলারই সুযোগ পাননি। তবে পরের দুই আসরে এই দুই তারকা ছিলেন দলের নিয়মিত সদস্য।। কিন্তু ভাগ্যের সিকি ছিড়েনি একবারও। বিশ্বকাপ জেতার অপেক্ষাটা দীর্ঘ হয়েছে। গত আসরে দলকে ফাইনালে নিয়ে গিয়েও মেসি জিততে পারেনি বিশ্বকাপ। সেই ১৯৮৬ সালের পর বিশ্বকাপ জেতার প্রহরটা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে আর্জেন্টিনার জন্য। তবে মেসি ক্লাব ফুটবলের সবকিছু জিতলেও জাতীয় দলের হয়ে এখনো বড় কোন ট্রফি জিততে না পারার আক্ষেপটা গুছানোর এটাই সেরা সময়।

জাতীয় দলের হয়ে খেলার অভিজ্ঞতাটা অবশ্য সবচাইতে বেশি রোনালদোর। দেশের জার্সিতে ১৪৯টি ম্যাট খেলেছেন এই পর্তুগিজ রাজপুত্র। যেখানে তার গোল ৮১টি। দ্বিতীয় স্থানে থাকা মেসি খেলেছেন দেশের জার্সিতে ১২৪টি ম্যাচ। যেখানে তার গোল ৬৪টি। এই দুজনের তুলনায় পিছিয়ে থাকা নেইমার ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে খেলেছেন ৮৪টি ম্যাচ। যেখানে তার গোল ৫৪টি। কাজেই লড়াইটা বেশ সমানে সমান। ক্লাব ফুটবলে তিনজন খেলেছেন একে অপরের বিপরীতে। মেসি আর রোনালদোতো ক্লাব ফুটবলে একে অপরের চির প্রতিদ্বন্দ্বী। আর নেইমার কয় বছর মেসির সাথে খেললেও তিনিও এখন মেসির প্রতিদ্বন্দ্বী। যদিও মেসি আর নেইমার এই লিগে খেলছেননা।

তবে বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে এই তিন তারকা একে অপরের মুখোমুখি হচ্ছেনা। তিন দল রয়েছে তিন গ্রুপে। তবে ক্রমশ প্রথম পর্ব পেরিয়ে উপরের দিকে উঠে এলে হয়তো এই তিন তারকা কারো না কারো মুখোমুখি হয়ে যেতেই পারে। তখন কে জিতবে সে আলোচনা অব। এখনই হচ্ছে না। তবে এখনকার আলোচনা হচ্ছে এই তিন বিশ্বসেরা তারকার মধ্যে কার হাতে উঠবে এবারের বিশ্বকাপ। আর্জেন্টিনার ৩২ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটাতে মেসি যেমন সবচাইতে বড় ভরসার নাম তেমনি প্রথমবারের মত ইউরোপ সেরার মুকুট জেতানো রোনালদো পর্তুগালের জন্য সবচাইতে বড় ভরসা। যদিও গ্রুপ পর্বে তাদের মুখোমুিখ হতে হবে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনের। অপরদিকে গ্রুপ পর্বে আর্জেন্টিনাকে মুখোমুখি হতে হবে দুই সেরা দল নাইজেরিয়া এবং ক্রোয়েশিয়ার। এদিকে ২০০২ সালের পর আর বিশ্বকাপ জিততে না পারা ব্রাজিলও চাইছে তাদের বড় তারকা নেইমারের হাত ধরে আবার তাদের ১৬ বছরের শিরোপা খরা কাটাতে। গ্রুপ ব্রাজিল অবশ্য কিছুটা সহজ গ্রুপে পড়েছে। যেখানে তাদের সাথে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া এবং কোস্টারিকা। কাজেই নেইমারের দল সহজেই নক আউট পর্বে যাচ্ছে সেটা এক রকম নিশ্চিত। তবে পরের কাজ গুলো কতটা সহজে করতে পারে নেইমারের ব্রাজিল সেটা এখন দেখার অপেক্ষা। বিশ্বকাপ কে জিতবে এবার। সে আলোচনা চলছে এবং চলবে বিশ্বকাপের শেষ দিন পর্যন্ত। লাতিন আমেরিকার কোন দেশ নাকি ইউরোপের কোন সুপার পাওয়ার। তবে এসবকে ছাড়িয়ে এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম আলোচনায় রয়েছে বিশ্ব ফুটবলের তিন সেরা তারকা মেসিনেইমার এবং রোনালদো। এই তিন তারকার মধ্যে। কারো হাতে উঠবে বিশ্বকাপ তেমনটি ভাবার মানুষেরও অভাব নেই এই মুহূর্তে। তবে বলা যায় বিশ্বকাপের ৩২ দলের লড়াইয়ের মাঝেও তিন তারকার লড়াইটা চোখে ভিন্নভাবে।

x