বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট ঘিরে অনিশ্চয়তা

নতুন প্রস্তাবে অনীহা চীনের

রতন বড়ুয়া

বৃহস্পতিবার , ১৪ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৩৫ পূর্বাহ্ণ
129

চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ভর করেছে। বিশেষায়িত ইউনিটটি স্থাপনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল প্রশাসনের দেয়া নতুন প্রস্তাবে অনীহা প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সফররত চীনা প্রতিনিধি দল। যার দরুন একশ শয্যার বিশেষায়িত এই ইউনিট ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে প্রকল্পটি নিয়ে হাল ছাড়ছেন না সারাদেশে বার্ন চিকিৎসা সেবা সমপ্রসারণে সমন্বয়কের দায়িত্ব পাওয়া ডা. সামন্ত লাল সেন। চীনা প্রতিনিধি দলের দুই সদস্যকে নিয়ে ফের চট্টগ্রাম আসছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের এই প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। সাথে থাকছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের উর্ধ্বতন কয়েকজন কর্মকর্তাও। আজ (বৃহস্পতিবার) সকালে চমেক হাসপাতাল প্রশাসনের সাথে এ নিয়ে আবারো আলোচনায় বসবেন তাঁরা। ডা. সামন্ত লাল সেন আজাদীকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রসঙ্গত, চীন সরকারের অর্থায়নে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় দফায় চমেক হাসপাতাল পরিদর্শন করে চীনের ৯ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। ওইসময় চীনের প্রতিনিধি দলের সাথে চমেক হাসপাতাল প্রশাসনের বৈঠকে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। মূলত, অবকাঠামো নির্মাণে আগের নির্ধারিত পরিমাপের তুলনায় কম জায়গা প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে চীনা প্রতিনিধি দল এ অনীহা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ঢাকায় গিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাথে বৈঠকে তাঁরা এ অনীহার কথা জানায়।
চীনা প্রতিনিধি দলের অনীহা প্রকাশের বিষয়টি জেনেছেন চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমদ। বিষয়টি নিশ্চিত করে হাসপাতাল পরিচালক আজাদীকে বলেন- আমরা আমাদের যুক্তিগুলো তুলে ধরেছিলাম। কয়েকটি বিষয়ে তাঁরা আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হয়নি। আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো মীমাংসার চেষ্টা চলছে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনে চীন সরকারের সম্মতির কথা জানা যায় আগেই। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল এলাকায় সম্পূর্ণ আলাদা অবকাঠামোতে একশ শয্যার বিশেষায়িত এ ইউনিটটি গড়ে তোলার কথা বলা হয়। বাংলাদেশস্থ চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে গত বছরের ২৮ মার্চ প্রদত্ত এক চিঠিতে এ সম্মতির কথা জানানো হয়। এর আগে বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ আলাদা অবকাঠামোতে চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করে চীন সরকার। আগ্রহ প্রকাশের পর চীনা একটি প্রতিনিধি দল প্রথম দফায় ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চমেক হাসপাতাল এলাকায় সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে। চীন সরকারের ৯ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলকে নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সারাদেশে বার্ন চিকিৎসায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পাওয়া ডা. সামন্ত লাল সেন।
ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তা লিউ চেনের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের দলটিতে ৭ জনই ছিলেন প্রকৌশলী। অপর একজন দোভাষী। প্রথম দফায় হাসপাতালের কনফারেন্স রুমে একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। এতে চট্টগ্রামে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটের অপরিহার্যতা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন ডা. সামন্ত লাল সেন ও চমেক হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন। আর প্রজেক্টরে উপস্থাপনের মাধ্যমে হাসপাতালের বিদ্যমান বার্ন ইউনিটের সমস্যা-সংকটের চিত্র তুলে ধরেন বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের প্রধান ডা. মৃনাল কান্তি দাশ। পরে হাসপাতালের পিছনের অংশে ও গোঁয়াছি বাগান এলাকাসহ বেশ কয়টি স্থান দেখানো হয় দলটিকে। এর মধ্য থেকে হাসপাতালের পিছনের অংশে খালি জায়গায় বিশেষায়িত এ ইউনিট গড়ে তুলতে দলটি আগ্রহ প্রকাশ করে বলে তখন জানিয়েছিলেন ডা. সামন্ত লাল সেন। চীনা দলের আগ্রহ প্রকাশ করা ওই জায়গাটিতেই (হাসপাতালের পিছনের অংশে খালি জায়গায়) আলাদা অবকাঠামোয় বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটটি গড়ে তোলার কথা জানিয়েছিলেন ডা. সামন্ত লাল সেন ও হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জালাল উদ্দিন।
ওই সময় হাসপাতাল পরিচালক বলেন, হাসপাতালের পিছনের অংশে আলাদা ভবন গড়ে তোলা হলেও সেটি বিদ্যমান ভবনের সাথে ব্রিজ আকারে সংযুক্ত করার সুযোগ থাকছে। রোগীর অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন পড়লে সেটিও সহজ হবে। সবমিলিয়ে বর্তমান ভবনের সাথে লাগোয়া এই জায়গাটি-ই সবচেয়ে সুবিধাজনক বলে আমরাও মনে করছি।
এদিকে, পূর্বে নির্ধারিত ওই জায়গাতেই বার্ন ইউনিটটি গড়ে তোলার কথা বলেছেন হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন আহমদ। তবে জায়গা সংকটের কারণে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটের পাশাপাশি একই জায়গায় আলাদা বিশেষায়িত ক্যান্সার ইউনিটও স্থাপন করতে চায় হাসপাতাল প্রশাসন। এর ফলে অবকাঠামো নির্মাণে আগের তুলনায় জায়গার পরিমান কম পাবে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট। যার কারণে এ বিষয়ে সম্মত হতে পারেনি চীনা দলটি। তাঁরা এ নিয়ে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে চীনা দলটি উদ্বিগ্ন জানিয়ে চমেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান ডা. মৃনাল কান্তি দাশ বলেন- তাঁরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার আবারো এসব বিষয়ে আলোচনা হবে বলেও জানান তিনি। জানতে চাইলে হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিায়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দীন আহমেদ বলছেন, আমাদের নতুন করে ৫০০ শয্যার একটি ভবন করতে হচ্ছে। তাছাড়া বার্ন ইউনিটের পাশাপাশি আলাদা ক্যান্সার ইউনিট, আলাদা রেডিওলজি এন্ড ইমেজিং বিভাগও করতে হবে। কিন্তু ভবন নির্মাণের উপযোগী জায়গার সংকট রয়েছে। তাই আমরা চিন্তা করেছি টুকরো টুকরো ভবনে না করে একই জায়গায় বহুতল ভবন নির্মাণ করতে পারলে জায়গার সাশ্রয় হবে। আর বহুতল ভবন করতে পারলে একই ভবনে একাধিক ইউনিট করা যাবে। সার্বিক ভাবে বিবেচনা করে আমরা প্রস্তাবনা দিয়েছিলাম। কিন্তু তাঁরা আপত্তি জানিয়েছে। এখন তাঁরা আবার আসছে। অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে আবারো আলোচনা হবে।
ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, আমার খুব ইচ্ছে চট্টগ্রামে দ্রুত একটি বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট (আইসিইউ সহ) নির্মাণ হোক। যাতে চট্টগ্রামের মানুষও রাজধানী ঢাকার মতো চিকিৎসা সুবিধা পায়। একটু আশঙ্কাজনক হলেই যাতে আর ঢাকায় ছুটতে না হয়। এটি করতে প্রথমে এডিবিকে অর্থ সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তাব করেছিলাম। তারা সম্মতও হয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সরে যায়। এরপর চীন সরকারের কাছে সহায়তা চাওয়া হয়। তারা সম্মত হয়েছে। চীনা একটি প্রতিনিধি দল এসে প্রথমে জায়গাও পরির্দশন করে গেছে। তাদের সাথে কথা বলে তখনই জানতে পেরেছি- টাকা ফ্যাক্টর নয়। এটি করতে টাকা যা লাগে তাঁরা দিতে প্রস্তুত। সম্পূর্ণই অনুদান হিসেবে। এই টাকা আর ফেরত দিতে হবে না। তাঁরা আমাদের জন্য বড় কিছুই করতে চায়।
ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সব কিছুই তাঁরা (চীন সরকার) করবে। আগুনে পোড়া রোগীদের বিশেষায়িত ও উন্নত চিকিৎসায় আইসিইউ সহ সব ধরণের সুবিধা সম্বলিত একশ শয্যার প্রতিষ্ঠানটি হবে স্বয়ং সম্পূর্ণ। এটি হলে আগুনে পোড়া রোগীদের চট্টগ্রাম থেকে আর ঢাকায় ছুটতে হবে না। উন্নত চিকিৎসার অভাবে অল্পতেই আর মৃত্যু পথের যাত্রীও হতে হবে না এখানকার (চট্টগ্রামের) আগুনে পোড়া রোগীদের।
প্রথম দফায় পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দলটি দেশে গিয়ে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নিকট রিপোর্ট দিয়েছেন। এর প্রেক্ষিতে চীন সরকারের সম্মতির কথা আমরা জানতে পেরেছি। পরে আনুষ্ঠানিক চুক্তির লক্ষ্যে ড্রাফট চূড়ান্ত করা হয়। এখন আরো একটি চীনা প্রতিনিধি দল বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। তাঁরা সমপ্রতি চমেক হাসপাতাল পরিদর্শন করেছে। ঢাকায় ফিরে তাঁরা মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাথে বৈঠক করেছে। হাসপাতালের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে কয়েকটি বিষয়ে অখুশির কথা তাঁরা জানিয়েছে। আমরা তাদের বুঝানোর চেষ্টা করছি। বৃহস্পতিবার হাসপাতাল প্রশাসনের সাথে এ নিয়ে আবারো বৈঠক হবে। আলোচনায় পজিটিভ কিছু বেরিয়ে আসবে বলেও আশা প্রকাশ করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ডা. সামন্ত লাল সেন।
এদিকে, প্রথম দফায় ২০১৬ সালে চমেক হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনে সম্মতি জানিয়ে চীনা দূতাবাসের পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হয় গত বছরের (২০১৮ সালের) ২৮ মার্চ। চীনা দূতাবাসের প্রদত্ত চিঠির বিষয়টি পরে (গতবছরের ৪ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠির মাধ্যমে অবহিত করে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১৬ এপ্রিল এ বিষয়ে মতামত প্রদানে স্বাস্থ্য অধিদফতরকে নির্দেশনা দেয়। আর স্বাস্থ্য অধিদফতর এ সংক্রান্ত নির্দেশনাটি স্বাস্থ্য অধিদফতরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক, চমেক হাসপাতালের পরিচালক ও ডা. সামন্ত লাল সেন বরাবর পাঠায় ১৮ এপ্রিল।

- Advertistment -