বিশাল আকারের পেঙ্গুইন

রেজাউল করিম

বুধবার , ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:১৮ পূর্বাহ্ণ
48

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ হয়ে মানুষ গড়ে তুলেছে সভ্যতা। সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করার স্বভাব শুধু মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রাণিকুলেও এ রীতি প্রচলিত। ‘পাখিরা চায় আকাশের নীল/ কবিতা চায় ছন্দের মিল…’। পাখিরাও দলবদ্ধভাবে থাকতে চায়। তাদেরও আছে বাচ্চার প্রতি ভালোবাসা, আদর-যত্ন।
অ্যান্টার্কটিকার নাম সবার জানা। বরফে ঢাকা মহাদেশ এটি। পৃথিবীতে সাতটি মহাদেশ রয়েছে। এটিও একটি মহাদেশ। এ মহাদেশ এরকম নয়। এই মহাদেশের কোনো দেশ নেই। আবার স্থায়ী বাসিন্দাও নেই। এটার মালিকানাও কারও দখলে নেই। গরমকালে এখানে ৪ হাজারের মতো পযর্টক আসে এবং শীতকালে এক হাজারের নিচে নামে। শীতকালে এখানে তাপমাত্রা নামে মাইনাস ৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে। এই মহাদেশ দক্ষিণ গোলার্ধের অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলে অ্যান্টার্কটিক চক্রের দক্ষিণে দক্ষিণ মহাসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার পর ১,৪০,০০,০০০ বর্গকিলোমিটার বিশিষ্ট এই মহাদেশ বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম মহাদেশ। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ অপেক্ষা এটি প্রায় দ্বিগুণ আকৃতিবিশিষ্ট। এই মহাদেশের ৯৮ শতাংশ গড়ে ১.৯ কিলোমিটার পুরু বরফে ঢাকা।
কোনো স্থায়ী বাসিন্দা না থাকলেও বছরজুড়ে ১,০০০ থেকে ৫,০০০ মানুষ এই মহাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন গবেষণা কেন্দ্রে অবস্থান করেন। প্রবল শৈত্যের সাথে লড়াই করতে সক্ষম উদ্ভিদ ও প্রাণীই এ মহাদেশে টিকে থাকতে সক্ষম, যার মধ্যে রয়েছে পেঙ্গুইন, সিল, নেমাটোড, টার্ডিগ্রেড, মাইট, বিভিন্ন প্রকার শৈবাল এবং অন্যান্য মাইক্রোঅর্গানিজম এবং তুন্দ্রা উদ্ভিদসমূহ।
পেঙ্গুইন হচ্ছে অ্যান্টার্কটিকার রাণী। সাঁতার কাটায় পেঙ্গুইনরা বেশ পটু। প্রতি ঘণ্টায় এরা প্রায় ৩০ মাইল পর্যন্ত সাঁতার কাটতে পারে। আবার সাঁতারের পাশাপাশি এরা ভালো ড্রাইভও দিতে পারে। সাঁতারের সময় সামনের পা দুটি ব্যবহার করে এবং পা দুটি দিয়ে দিক পরিবর্তন করে থাকে। একটানা ২০ মিনিট পানিতে ডুব দিয়ে থাকা এদের কাছে তেমন কঠিন কোনো কিছু নয়। পেঙ্গুইনের দেহের উপরিভাগটা কালো বা ধূসর এবং নিচের দিকটা ধবধবে সাদা। দাঁড়িয়ে থাকা একটি পেঙ্গুইনকে কোটপরা কোনো ভদ্রলোকের মতো দেখায়। এজন্য আমরা বলি ‘কোটপরা ভদ্রলোক’। দক্ষিণ মেরুর তীব্র শীতল পানি অথবা ঠাণ্ডা বাতাস থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য এদের দেহে ছোট ছোট উজ্জ্বল পালকের মতো আবরণ থাকে। এ আবরণ তাপ শরীর থেকে বাইরে বা বাইরে থেকে শরীরে ঢুকতে বাধা দেয়। এ অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘তাপ পরিবাহী’ অবস্থা বলে। এদের গায়ের চামড়ার নিচে দুই ইঞ্চির মতো পুরু চবির্র স্তর থাকে। এজন্য এরা এই জমে থাকা চর্বি থেকে শক্তি বা ক্যালরি গ্রহণ করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ না খেয়ে থাকতে পারে। এরা একা থাকতে পারে না, দলবদ্ধ হয়ে থাকে। এমনকি পানিতে নামার সময়েও এরা একা বের হয় না। অনেক সময় সুযোগসন্ধানী লেপার্ড সি এদের আক্রমণ করে। এ কারণে এরা সবর্দা সতর্ক থাকে। পানিতে ঝাঁপ দেয়ার আগে পেঙ্গুইনরা সবাই মিলে পরামর্শ করে। একজনকে সবার আগে ঝাঁপ দেয়ার জন্য নিবার্চন করা হয়। পরে বাকিরা একত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
পেঙ্গুইন ও অ্যান্টার্কটিকা এতকিছুর অবতারণার কারণ হচ্ছে-সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডে মানুষের সমান পেঙ্গুইনের জীবাশ্মের খোঁজ পাওয়া গেছে। বিশাল আকারের এই পেঙ্গুইনের উচ্চতা ১ দশমিক ৬ মিটার (৫ ফুট ৩ ইঞ্চি) এবং ওজন প্রায় ৮০ কেজি। বর্তমান সময়ের পেঙ্গুইনের চেয়ে এগুলো অন্তত চার গুণ বেশি ভারি ও ৪০ সেন্টিমিটার বেশি লম্বা। গত বছর এক অপেশাদার অনুসন্ধানী এই পেঙ্গুইনের পায়ের হাড়ের খোঁজ পান। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর অস্ট্রেলিয়ার জীবাশ্ম গবেষণাবিষয়ক জার্নাল ‘অ্যালসিরিঙ্গা’য় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে এ সংক্রান্ত গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। গবেষকরা জানান, ৬৬ থেকে ৫৬ মিলিয়ন বছর আগে নিউজিল্যান্ডের উপকূলে ‘ক্রসভালিয়া ওয়াইপারেনসিস’ নামের এ ধরনের পেঙ্গুইনের অস্তিত্ব ছিল। ক্যান্টারবারি মিউজিয়ামের জ্যেষ্ঠ তত্ত্বাবধায়ক পল স্কফিল্ড জানান, ওই সময় ডাইনোসর ও অতিকায় সামুদ্রিক সরীসৃপের বিলুপ্তি ঘটায় এসব অতিকায় পেঙ্গুইনের আবির্ভাব ঘটে থাকতে পারে। ওই সময় নিউজিল্যান্ডের তাপমাত্রাও তাদের টিকে থাকার জন্য যথাযথ ছিল। এই এলাকায় পাওয়া পেঙ্গুইনগুলো পলিওসিন যুগের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঙ্গুইন। তবে পরে এগুলো কেন বিলুপ্ত হয়ে যায় তা স্পষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সিল ও দাঁতাল তিমির মতো অন্যান্য সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারাই এর বিলুপ্তির কারণ। নিউজিল্যান্ডে অতিকায় কোনো পাখির জীবাশ্ম খুঁজে পাওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগেও ৩.৬ মিটার উচ্চতার মোয়া পাখি এবং তিন মিটার লম্বা ডানাবিশিষ্ট এক ধরনের ঈগলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল দেশটিতে। তবে অ্যান্টার্কটিকার রাণী-রহস্য এখানে শেষ নয়।

x