বিপিসি থেকে ফার্নেস তেল কিনছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো

বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধিতে বিপিসির ক্ষতি

আজাদী প্রতিবেদন

বুধবার , ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ at ৩:৩৫ পূর্বাহ্ণ
109

বিশ্ববাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় ফার্নেস তেল আমদানি কমিয়ে দিয়েছে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো। এর পরিবর্তে তারা বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) থেকে কম দামে তেল কিনতে তৎপর হয়ে পড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ধারিত মূল্যেই জ্বালানি আমদানি করে বিপিসি। ফলে বিক্রয় বাড়লেও লোকসান করছে বিপিসি। সবচেয়ে বেশি লোকসান করছে ফার্নেস তেলে। প্রতি লিটারে তা ৯ থেকে ১২ টাকা। এদিকে মূল্য বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় সমন্বয়ের জন্য বিপিসি
মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। তবে চিঠির বিষয় কর্মকর্তাদের কেউ স্বীকার করেননি।
বিপিসির পরিচালক (মার্কেটিং) মীর আলী রেজা আজাদীকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কয়েক মাস ধরে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ফার্নেস ওয়েল আমদানি কম করছে। দাম বেশি হওয়ার পরও সরকারের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বিপিসিকে ফার্নেস ওয়েলসহ অন্যান্য জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়। সরকারের সাথে চুক্তি অনুযায়ী বিপিসিকে এই আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এতে করে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো বর্তমানে বাইরে থেকে আমদানি না করে বিপিসির কাছ থেকে তেল কেনার জন্য ঝুঁকে পড়েছে। আপাতত বিপিসির ওপর এ নিয়ে তেমন চাপ নেই। তবে সামনে কী হয় তা বলা যাচ্ছে না। তাদের বলেছি, আমাদের সাথে যে কয়টি বিদ্যুৎ কোম্পানির চুক্তি আছে, সেগুলোতে আগে ফার্নেস ওয়েল সরবরাহ করা হবে। বাকি যেটুকু থাকবে, পরে যেসব কোম্পানির সাথে চুক্তি নেই সেগুলোতে সরবরাহ করা হবে।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলেন, একই সময় ডলারের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে করে বর্তমানে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সকল জ্বালানি আমদানিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে লস করছে বিপিসি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লস হচ্ছে ফার্নেস তেল আমদানিতে। বাইরে থেকে বেশি দামে আমদানি করে কম মূল্যে বাজারে বিক্রি করছে।
সূত্র জানিয়েছে, চুক্তিপত্র অনুযায়ী বিপিসি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর জন্য সাধারণত ফার্নেস তেল আমদানি করে। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যে এসব জ্বালানি আমদানি করে। গত জুন মাসে প্রতি টন ফার্নেস অয়েলের দাম ছিল ২৮০ থেকে ৩শ মার্কিন ডলার। নভেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮০ মার্কিন ডলারে। দাম বৃদ্ধি এখনো অব্যাহত আছে। এতে করে বিপিসির আমদানি ব্যয় বেড়েছে।
বিপিসি সূত্রে জানা যায়, দেশীয় বাজারে প্রতি লিটার ফার্নেস তেল বর্তমানে ৪২ টাকা করে বিক্রয় করছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে করে আমদানি ব্যয়ের সাথে বিক্রয় মূল্যের বড় পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে ফার্নেস তেল বাবদ প্রতি লিটারে ৯ থেকে ১২ টাকা করে লোকসান হচ্ছে। এছাড়া ডিজেল ও কেরোসিন আমদানিতেও দুই টাকার মতো লস হচ্ছে। এই দাম বৃদ্ধি ওঠানামার মধ্যে আছে।
বিপিসির হিসাবে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ফার্নেস তেল আমদানিতে বিপিসির ব্যয় হয়েছিল ৮৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উপরে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫ লাখ ২১ হাজার ১৯৮ মেট্রিক টন ফার্নেস তেল আমদানিতে ব্যয় হয় ১৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের (১ হাজার ২৪০ কোটি টাকা) উপরে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে সরকার ২০১২ সাল থেকে বেসরকারি রেন্টাল ও কুইক রেন্টালগুলোকে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ফার্নেস তেল আমদানির সুযোগ দেয়। এছাড়া তেল আমদানি করলে ৯ শতাংশ সার্ভিস চার্জ প্রদানের সুবিধা দেওয়া হয়। এতে বেসরকারি কোম্পানিগুলো আমদানিকারকের মাধ্যমে তেল আমদানি করে আসছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, বেসরকারি কোম্পানিগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধায় ফার্নেস তেল আমদানির সুবিধা পাওয়ার পর ইচ্ছেমতো আমদানি করেছে। এ সময় তাদের কোনো পাত্তাই ছিল না। এসব আমদানির হিসাবও বিপিসিকে দেওয়া হত না। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ায় তারা আমদানি কমিয়ে আমাদের কাছ থেকে ফার্নেস তেল কিনতে মরিয়া হয়ে পড়েছে। আমরাও তাদের দিতে বাধ্য হচ্ছি। না হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাধাগ্রস্ত করাসহ নানা দায় আমাদের ওপর পড়বে।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো ১৭ লাখ মেট্রিক টন ফার্নেস তেল আমদানি করেছে। একই অর্থবছর বিপিসি ৭ লাখ মেট্রিক টন ফার্নেস ওয়েল বিক্রি করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন ফার্নেস অয়েল এসেছে বিপিসির আমদানিকৃত ক্রুড অয়েল পরিশোধনের মাধ্যমে। বাকি ফার্নেস অয়েল বিপিসি নিজে আমদানি করেছে।

x