বিপন্ন পাহাড়ি বন : হারিয়ে যাচ্ছে নানা প্রজাতির বন মোরগ-মুরগী

মাহবুব পলাশ : মীরসরাই

সোমবার , ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:৫৬ পূর্বাহ্ণ
100

একদিকে বিপন্ন বনভূমি। অন্যদিকে রিজার্ভ ফরেষ্টও উজাড়। তার উপর শিকারিদের উৎপাতে দিন দিন বিপন্ন মীরসরাইয়ের পাহাড়ী বনাঞ্চলের বৈচিত্রময় আকর্ষনীয় বন্যপ্রাণী বন মোরগ।
কিছু বছর পূর্বে ও মীরসরাই উপজেলার করেরহাটের পাহাড়ে, মীরসরাই- ফটিকছড়ি রোডে, হিঙ্গুলী, ওয়াহেদপুরের পাহাড়ী এলাকাসহ প্রতিটি বনাঞ্চলের জনপদে পাহাড়ী রাস্তার আশেপাশেই কখনো কখনো প্রকাশ্যে ও চলাফেরা করতে উঁকি ঝুঁকি দিয়ে কুহু কুহু ডাক দিতো। অথচ দিনে দিনে প্রতিনিয়তই এই বন মোরগ মুরগীর হাঁক ডাক এর অবশিষ্টাংশও বিলুপ্ত এখন।
বন মোরগ এর জীবন চক্র অনুসন্ধানে জানা গেছে দেখতে দেশীয় মোরগের মতো হলেও আকারে ছোট ও ওজনে অনেক কম। এটি এক গাছ থেকে অন্য গাছে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে উড়ে বেড়ায়। একটি বন মোরগের ওজন সর্বোচ্চ ১ কেজি, আর মুরগীর ওজন ৫০০ গ্রাম থেকে ৭০০ গ্রাম হয়। বন মোরগের মাংস খুবই সু-স্বাদু। বন মোরগের রঙ লাল আর বন মুরগীর রঙ হালকা লাল।বন মুরগী ১০-১২টি ডিম পাড়ে। ডিমগুলো দেখতে দেশীয় মুরগীর ডিমের চেয়ে একটু ছোট। বন মোরগ-মুরগী গহীন অরণ্যে থাকতে পছন্দ করে। এক সময় পাহাড়ে গেলেই দেখা যেতো বন মোরগের ছুটাছুটি। কিন্তু এখন তা একেবারেই দুর্লভ।

জনৈক বন মোরগ শিকারী রূপম ত্রিপুরা জানান, শিকারীরা পোষা মোরগকে নিয়ে বন মোরগের কাছাকাছি নিয়ে বেঁধে রাখেন। পোষা মোরগ ডাক দিলে বন মোরগ মারতে আসে। মারামারির এক পর্যায়ে শিকারী দৌঁড়ে গিয়ে বন মোরগটিকে ধরে ফেলে। কোনো কোনো শিকারী চিকন সুতার কল, ফাঁদ ও জাল দিয়ে একসঙ্গে ৭ থেকে ৮টি মোরগ-মুরগী শিকার করেন। আবার কোনো কোনো শিকারী ধানের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে আবাসস্থলে ছিটিয়ে দেয়। আর এ ধান খেয়ে ছোট-বড় অনেক মোরগ-মুরগী মারা যাওয়ার ৩০ থেকে ৪০ মিনিট আগে জবাই দিতে হয়। অন্যথায় এরা নিজের পায়ের ধারালো নখ দিয়ে গলার রগ ছিড়ে আত্মহত্যা করে।
সূত্র জানায়, শিকারীরা ১টি বন মোরগ বিক্রি করেন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। আর বন মুরগী বিক্রি করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। অনেকে অতিথি আপ্যায়ন অথবা শখ করে খাওয়ার জন্য শিকারীদের আগাম টাকা দিয়ে থাকেন। তবে, একটি পোষা বন মোরগের দাম ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। পরীক্ষা নিরিক্ষায় যে বন মোরগটি বেশি ভালো মনে হয় তার দাম আরও একটু বেশি। অন্য সময়ের চেয়ে শীত মৌসুম বন মোরগ শিকারের উপযুক্ত সময়। এ সময় একটি পোষা বন মোরগ থেকে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করা সম্ভব। পোষা বন মোর কে শিয়াল বা বিড়ালেও আক্রমন করতে পারে না। এরা শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য ভালো যোদ্ধাও । এদের রোগ বালাইও কম হয়। অভিজ্ঞদের মতে, ১০টি দেশীয় মুরগি প্রজননের জন্য একটি মোরগ প্রয়োজন হয়।কিন্তু একটি বন মোরগ ২০টিরও বেশি মুরগিকে প্রজনন দিতে সক্ষম।
এছাড়া এই বন মোরগ লড়াইয়ের ক্ষেত্রে খুবই পটু। একটি বন মোরগের সঙ্গে বড় আকারের দুটি দেশীয় মোরগ লড়াই করে কুপোকাত হয়ে যায়। বন মোরগের পায়ের নখ ও ঠোঁট খুবই ধারালো। লড়াইয়ের সময় বন মোরগ অন্য মোরগকে নখ দিয়ে আঁচড় দেয় এবং ডানা দিয়ে আঘাত করে ধরাশায়ী করে ফেলে। মীরসরাইয়ের বন রেঞ্জ কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জানান এই এলাকার বন মোরগ শিকারের বিষয়টি তিনি জানেন না। তবে, কেউ বন্য প্রাণী শিকার করলে, আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি বলেন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় হরিণ, বনমোরগ, বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ খুব জরুরি। তা না হলে একদিন প্রাণীশূন্য হবে এই এলাকার বনাঞ্চল।’

x