বিপজ্জনক হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস

বৃষ্টির পানিতে আবর্জনা ও মলমূত্র মিশে একাকার, ভূমি ধসের আশঙ্কা

রফিকুল ইসলাম, উখিয়া

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ৪:৫৫ পূর্বাহ্ণ
24

টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দেখা দিয়েছে নানা দুর্ভোগ। প্রবল বর্ষণে পাহাড় থেকে মাটি ধসে পড়ছে ক্যাম্পের উপর। এছাড়া বৃষ্টির পানির সাথে ময়লাআবর্জনা ও মলমূত্র মিশে একাকার হয়ে সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়ছে। চরম এই দুর্যোগে সেবা সংস্থাগুলো অনেকটাই নিষ্ক্রিয় বলে অভিযোগ রোহিঙ্গাদের। এতে তাদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা। গতকাল বুধবারও পাহাড় ধসের ঘটনায় চার রোহিঙ্গা গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী মেগাক্যাম্পের ২, ৩ ও ৪নং ক্যাম্পসহ কুতুপালং জি, জি, বালুখালী, তাজনিমার খোলা, বর্মা পাড়া, ময়নাল ঘোনা ও শফিউল্লাহ কাটা ক্যাম্পের ডি২নং ব্লকে ইতোমধ্যে বেশ কিছু পাহাড় ও ভূমি ধসের ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কুতুপালং ও বালুখালীতে ঘরের দেয়াল ও গাছ চাপা পড়ে দুই রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালেও শফিউল্লাহ কাটায় পাহাড় ধসে মরিয়ম খাতুন (৪৫), ছমুদা খাতুন (৩৮), রোকেয়া বেগম (২৮) ও তার তিন বছরের এক শিশু কন্যা গুরুতর আহত হয়েছে। আহতদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গত ৫ দিনে এসব ক্যাম্পে অন্তত শতাধিক রোহিঙ্গা আহত হয়েছে বলে রোহিঙ্গা নেতারা জানিয়েছেন। বালুখালী২ ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা ছব্বির আহমদ মাঝি ও নুরুল ইসলাম মাঝি জানান, পাহাড়ের উপরের চেয়ে ঢালু ও নিচুতে যারা রয়েছে তারা বেশি ঝুঁকিতে। পাহাড় ও ভূমি ধসের আশংকায় অনেকে ঘর ছেড়ে আত্মীয় স্বজনদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। তারা জানান, রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ পাহাড় কেটে তাদের আবাস স্থল বানিয়েছে। বর্তমানে চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে এসব রোহিঙ্গা। এতদিন শোনা যাচ্ছিল এসব ঝুঁকিপূর্ণ রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন ভাবে আবাস স্থলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেখানে তাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু তার কোনো অগ্রগতি নেই।

তবে শরণার্থী ত্রাণ এবং প্রত্যাবাসন বিষয়ক কমিশনার আবুল কালাম গণমাধ্যমকে জানান, বর্ষা মওসুম শুরশুর আগেই স্থানীয় প্রশাসন প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গাকে চিহ্নিত করেছিল যারা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। সে তালিকার উপর ভিত্তি করে গত ১০ জুন পর্যন্ত অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গাকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাকিদেরও সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে বলে জানান তিনি।

উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অন্তত সাত হাজারের বেশি রোহিঙ্গা গত কয়েকদিনের বৃষ্টি ও ধমকা হাওয়ায় আতঙ্কে নিজঘর ছেড়ে আত্মীয় স্বজন ও প্রতিবেশিদের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে। এই অবস্থায় দুর্ভোগ বাড়লেও সেবাসংস্থার কর্মীরা তাদের তেমন কোনো খোঁজখবর নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ রোহিঙ্গাদের।

তবে কিছু কিছু এলাকায় দেখা যায়, বিভিন্ন সংস্থার ত্রাণ কর্মীরা হাঁটু পর্যন্ত পানির ভেতর দিয়ে হেঁটে ক্যাম্পে ঢুকছেন এবং তাদের ত্রাণ কাজ পরিচালনা করছেন। অনেক জায়গায় রোহিঙ্গারা হাঁটু সমান উচ্চতার পানিতে দাঁড়িয়ে ত্রাণের জন্য অপেক্ষা করছে।

রোহিঙ্গা মাঝিরা জানান, কয়েকদিনের বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতায় পাহাড়টিলার কাদা, ময়লা আবর্জনা, মলমূত্র ও নলকূপের পানি একাকার হয়ে দূর্বিসহ পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক ফেডারেশন অব রেড ক্রস এন্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বা আইএফআরসি জরশুরি প্রদ েপ নিতে সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। তাদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, টানা বৃষ্টিপাতের ফলে কী পরিমাণের য় তি হয়েছে তা এখনো নির্ণয় করা যায় নি। তবে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কিছু এলাকা বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এতে ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরে রোহিঙ্গারা কঠিন সংকটের ভেতর দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে। আইএফআরসি কক্সবাজার উপঅফিসের প্রধান সঞ্জীব ক্যাফে জানান, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ভূমি ধসের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। পাশাপাশি পানি বাহিত রোগের ও প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।

বেসরকারি একটি এনজিও’র ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানান, ক্যাম্পে প্রবেশের সড়কগুলো পানির নিচে তলিয়ে গেছে। রাস্তার দু’পাশে শরণার্থীদের অধিকাংশ ঘরে পানি ঢুকেছে। যাদের ঘর পাহাড়ের পাদদেশে, ঢালে কিংবা উপরে তাদের সেখান থেকে সরিয়ে ক্যাম্প এলাকার মধ্যে অবস্থিত ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

এদিকে গতকাল সকাল থেকে কক্সবাজার টেকনাফ সড়কের বিভিন্ন স্থানে সড়কের উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে সাধারণ লোকজন চরম দুর্ভোগে পড়েছে।

x