বিনিয়োগ সম্পর্কিত সবধরনের দাপ্তরিক ঝামেলা কমাতে হবে

শুক্রবার , ১০ মে, ২০১৯ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
24

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৩৬১ কোটি ৩৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৬৮ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলছে, এটাই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিদেশি বিনিয়োগ।
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছিল প্রায় ২১৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৮ শতাংশ কম। এ বছর বিদেশি বিনিয়োগ এক লাফে ১৪৬ কোটি ডলার বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে এই প্রথম বাংলাদেশ এক বছরে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ পেল। এত দিন বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ অনেক কম ছিল। সমপর্যায়ের অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিল। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার (আঙ্কটাড) ২০১৮ সালের বৈশ্বিক বিনিয়োগ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মিয়ানমার ৪৩০ কোটি, ইথিওপিয়া ৩৬০ কোটি ও কম্বোডিয়া ২৮০ কোটি ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ পেয়েছিল। বাংলাদেশে এসেছিল ২১৫ কোটি ডলারের বিনিয়োগ।
সাবেক সচিব এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনকালে প্রাইভেট সেক্টরের ওপর পাবলিক সেক্টরের প্রাধান্য ও নিয়ন্ত্রণ বলবৎ ছিল, দ্বিতীয়ার্ধে শিল্প উদ্যোগে পাবলিক সেক্টরের নিয়ন্ত্রণ শিথিল এবং আধিপত্য হ্রাস পেতে থাকে। ১৯৮০-৮১ সালে সরকার প্রাইভেট সেক্টরের উন্নয়ন লক্ষ্যে নয়া শিল্পনীতিতে কিছু মৌল পরিবর্তন আনেন। উল্লেখ্য, এ সময় ১৯৮০ সালেই ফরেন ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এন্ড প্রটেকশন এ্যাক্ট জারি হয়। বাংলাদেশ এঙপোর্ট প্রসেসিং জোনস অথরিটি (বেপজা) এ্যাক্টও পাস হয় একই সময়। এতদসত্ত্বেও পুরো আশির দশকে বিদেশি বিনিয়োগ তেমন আসেনি বাংলাদেশে। পুরো দশকে ইপিজেডের বাইরে বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধিত হয় মাত্র ৪০৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সত্তর ও আশির দশকে অর্থনৈতিক সাহায্য হিসেবে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ ও অনুদান এসেছে মূলত পাবলিক সেক্টরের জন্য। প্রাইভেট সেক্টরের পুঁজির প্রয়োজনীয়তা ও তার চাহিদা সৃষ্টি হয় আশির দশকের শেষ ভাগে। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রাইভেট সেক্টরের বিকাশ শুরু হলে এবং বিদেশি পুঁজি প্রবেশের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সুযোগ-সুবিধার সমাহার ঘটানোর নীতিমালা ঘোষিত হলে, বিনিয়োগ বোর্ড এ্যাক্ট, ১৯৮৯ বলে প্রতিষ্ঠিত পোষক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ বোর্ডের (বর্তমানের বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি- সংক্ষেপে বিডা) কার্যক্রম শুরু হলে বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ প্রবাহের পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ও বাজার অর্থনীতির অবগাহনে বাংলাদেশ সিক্ত হলে, এশীয় উন্নয়ন দেশগুলো বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব ও দূরপ্রাচ্যের দেশগুলোর উন্নয়নের নতুন ধারা সূচিত হলে (যা এশিয়ান মিরাকল নামে খ্যাত) বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগ গন্তব্য বা ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিভাত হয়।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল ইসলাম মনে করেন, সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে শিগগিরই বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আরো বাড়বে। তিনি বলেছেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সরকার কাজ করছে। বিশ্বব্যাংকের সহজে ব্যবসা সূচকে বাংলাদেশের যে ঘাটতি রয়েছে, তা দ্রুত পূরণের চেষ্টা চলছে। এক দরজায় সেবা বা ওয়ান স্টপ সার্ভিস দেওয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগ পরিবেশ ভালো। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার বাড়ছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার মজুত বেড়েছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি সহনীয়। এমনকি নির্বাচনের বছরেও অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি দেখা যায়নি। দেশে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ বিরাজ করছে। তিনি বলেন, নিরাপদ বিনিয়োগের জন্য জনশক্তি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি প্রভৃতি খাতের ব্যাপক উন্নয়নের ফলে বাংলাদেশ প্রাতিষ্ঠানিক মুনাফার দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
আমরা হয়তো অনেক বেশি বিদেশি বিনিয়োগ চাই। তবে বিনিয়োগ আসার পর সেই বিনিয়োগ থেকে ব্যবসা করার পথগুলো যদি স্বচ্ছ ও সহজ না হয়, তাহলে সেই বিনিয়োগ এলেও থাকবে না। কেননা বিদেশিরা কোনো অর্থনীতিতে ঝুঁকি নেওয়ার আগে অনেক কিছু দেখে। তারা দেখে, যে পণ্য বা সেবা তারা উৎপাদন বা সৃষ্টি করবে তার বাজার কোথায়। বাজার যদি শুধু বাংলাদেশ হয়, তাহলে তারা ভাববে সেই বাজারের আকার কত। তারা এ-ও দেখে, বাংলাদেশের বাজার ধরতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ না করে প্রতিবেশী কোনো দেশে বিনিয়োগ করে সেই পণ্য বাংলাদেশে বেচলে তাদের আরো সুবিধা হয় কি না। এসব বিবেচনায় নিয়ে তারা বিনিয়োগ করবে কি না, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। তাই বিনিয়োগ সম্পর্কিত সবধরনের দাপ্তরিক ও দুর্নীতিগত ঝামেলা থেকে আমাদের মুক্ত থাকতে হবে।

x