বিনিয়োগের কর্মকৌশল নিয়ে ভাবতে হবে

বৃহস্পতিবার , ১২ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ
31

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেন, একটি দেশকে ধনী হতে গেলে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং দক্ষ মানবসম্পদের অভাবে সমৃদ্ধির দৌড়ে পিছিয়ে পড়ে অনেক দেশ। যে কোনো দেশকে ধনী করার উপায়ের অন্যতম দাওয়াইগুলোর মধ্যে রয়েছেজনগণের বিনিয়োগের নিরাপত্তা, দেশীয় শিল্প বিকাশে প্রণোদনা, সুসংহত অর্থনৈতিক উন্নয়নে সুশাসন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ। সুসংহত বিনিয়োগ পরিকল্পনা একটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির রক্ষাকবচ। উন্নত বিশ্বে জনগণের সঞ্চয়কে ব্যাংকে অলস জমা করে রাখতে দেয়া হয় না। জনগণের সঞ্চিত অর্থ লাভজনক খাতে বিনিয়োগ করা সেসব দেশে বাধ্যতামূলক। তবে সেসব দেশের সরকার জনগণের বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করে। আমাদের দেশে এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। সুসংহত অবকাঠামো আর নিরাপত্তার অভাবে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে জনগণের আগ্রহ থাকে না।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন জনগণকে ঘিরে। জনগণের কর্মক্ষমতা ও সীমিত সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করে উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। আমরা ইতোমধ্যেই একটি সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এ পর্যায়ে বেসরকারি কিংবা বৈদেশিক বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে পারলে উন্নয়ন হবে টেকসই। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থাকলে উন্নয়নের অন্যক্ষেত্রগুলোর দিকে মনোযোগী হওয়া সম্ভব। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে সরকার শুল্কমুক্ত বাণিজ্য, শুল্ক নির্দিষ্টকরণ এবং বিভিন্ন পণ্যের রপ্তানি সুবিধা বাড়াচ্ছে, সুষম শিল্প কাঠামো ও নীতির প্রণয়নে দৃষ্টি দিয়েছে।

কোনো দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। এ বিনিয়োগ দেশ কিংবা দেশের বাইরে থেকে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার খুবই আগ্রহী ও আন্তরিক। কেননা দেশিবিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘শেখ হাসিনা বিশেষ উদ্যোগ’ হিসেবে বিনিয়োগ বিকাশকে ব্র্যান্ডিং কর্মসূচির আওতায় নেয়া হয়েছে। ব্র্যান্ডিং হলো অনেক কিছু থেকে সুনির্দিষ্ট একটা কিছুকে মানুষের মাঝে পরিচিত করে তোলা। জিনিসের গুণগত মান সুনিপুণভাবে সেবাগ্রহীতার কাছে তুলে ধরাই ব্র্যান্ডিংয়ের মূল কাজ। বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনাগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারলে বিদেশিরা এ দেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে আগ্রহী হবে, দেশি উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে উৎসাহিত হবে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময়। ১৯৯৩ সাল থেকে এদেশে বিদেশি বিনিয়োগসহ প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দ্রুত বাড়তে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৬ থেকে ’৯৯ পর্যন্ত নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয় ৪২৫টি। বর্তমানে যেসব খাতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বেশি ঘটছে সেগুলোর মধ্যে আছে তৈরি পোশাক, বস্ত্রশিল্প, রসায়ন, কাগজ, যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশ, মুদ্রণ, প্যাকেজিং, প্লাস্টিক সামগ্রী, ধাতব সামগ্রী, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বৈদ্যুতিক দ্রব্যাদি, ঔষধ শিল্প ইত্যাদি। তেল ও গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিযোগাযোগ, সিমেন্ট, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, হাসপাতাল ও ক্লিনিকএসব খাতেও সামপ্রতিককালে বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ শুধু বেসরকারি উদ্যোগ নয়, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় বিভিন্নমুখী প্রস্তাবের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। কারণ বৈদেশিক বিনিয়োগ দেশের আমদানি ব্যয় কমাতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের প্লাস্টিক, কাপড়, চামড়া, কৃষির কাঁচামাল, পাট, হিমায়িত খাদ্য (ইলিশ, চিংড়ি), কুটির ও ক্ষুদ্রশিল্প, কাগজ, শুটকি, পর্যটন ছাড়াও রাসায়নিক ও সফটওয়্যারের মতো নানান শিল্পে বৈদেশিক অথবা বেসরকারি বিনিয়োগ আরও বাড়াতে হবে।

বলা হয়ে থাকে, যদি কোনো দেশ উচ্চহারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে চায় তাহলে সে দেশে অবশ্যই বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কারণ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং সরকারের শিল্পবান্ধব ভূমিকার মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। আমাদের দেশের বাস্তবতায় যে পরিমাণ বিনিয়োগ হওয়া উচিত, সে তুলনায় বিনিয়োগ অনেক কম। বস্তুত দেশের অর্থনীতিতে যে পরিমাণ অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় হয়, বিনিয়োগের পরিমাণ সে হারকেও ছুঁতে পারেনি। তাই আমাদের দেশে বিনিয়োগের কর্মকৌশল নিয়ে ভাবতে হবে। বেসরকারি খাতে শিল্প উদ্যোগকে শুধু উৎসাহিত করলেই চলবে না, বেসরকারি উদ্যোগ কিভাবে সফলতা পেতে পারে সে বিষয়েও দিকনির্দেশনা থাকতে হবে। অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারিবেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই।

x