বিদ্যুৎ চুরি, অপচয় ও সিস্টেম লস রোধ করে সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৫:৫৯ পূর্বাহ্ণ
50

বর্তমান সরকার ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর অঙ্গীকার করেছে। অস্বীকার করার উপায় নেই যে, এ ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এক দশক আগেও বিদ্যুতের জন্য হাহাকার করতে হতো দেশের মানুষকে। গ্রাহকদের সঙ্গে বিদ্যুৎ যেন লুকোচুরি খেলত। প্রতি ঘণ্টা পর পর বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় গ্রাহকদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। সে সময় বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শুধু যে নাগরিক জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তা নয়, থমকে গিয়েছিল কলকারখানার উৎপাদনও। চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহে বিশাল ঘাটতির কারণেই এমনটি হয়েছিল। কিন্তু এক দশক পর ‘শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ স্লোগানে উজ্জীবিত বিদ্যুৎ বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা বিদ্যুৎ খাতের গোটা দৃশ্যপট একেবারে বদলে দিয়েছে। এখন শুধু শহরাঞ্চলই নয়, বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদও। বিদ্যুতের জাদুর ছোঁয়ায় চাঙ্গা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে গত ২৪ এপ্রিল সন্ধ্যায়, ১২ হাজার ৫৭ মেগাওয়াট। এর মাধ্যমে অতীতের সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। এর আগে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল গত বছর ১৯ সেপ্টেম্বর, ১১ হাজার ৬২৩ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সংস্কারে মনোযোগ দেওয়া হয়নি। ফলে উৎপাদনে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটি ও দুর্বলতার কারণে পুরো মাত্রায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারছে না দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। কোথাও বিদ্যুতের ওভারলোডিং হচ্ছে, আবার কোথাও বিদ্যুতের ঘাটতি থাকছে। নগরাঞ্চলে বিদ্যুতের ভোগান্তি কমলেও গ্রামাঞ্চলে কমেনি, বিদ্যুতের আওতারও উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ ঘটেনি। আবার জরাজীর্ণ সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার কারণে মাঝে মধ্যেই ঘটছে দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট। গ্রীষ্মের শুরুতেই অল্প পরিসরে লোডশেডিং শুরু হয়েছে। তবে এখনো সেটা সহনীয় মাত্রায়। কিন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, বিশেষ করে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের বিতরণ এলাকায় এখনো ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, নিরবচ্ছিন্নভাবে সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বিদ্যুৎ খাতে প্রচুর বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ জন্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধিতে উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। এ মুহূর্তে এ খাতে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা গেলে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাবে। সম্প্রতি ভারতের আন্তসীমান্ত বিদ্যুৎ বাণিজ্য নীতিমালা সংশোধন করে প্রতিবেশীদের তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে। এতে বাংলাদেশ আরও সাশ্রয়ী মূল্যে ভারতের বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করতে পারবে। একই সঙ্গে নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে যে আন্তদেশীয় গ্রিডলাইন নির্মাণ করা হবে, তা দিয়ে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ এই দুটি দেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, সঞ্চালন লাইনের সক্ষমতা না থাকায় উৎপাদিত বিদ্যুতের যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে না। ফলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না। সঞ্চালন লাইন সংস্কারে প্রকল্প নেয়া হলেও ধীরগতিতে চলছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমাতে হলে তেলভিত্তিক কুইক রেন্টাল নির্ভরতা কমাতে হবে।
দেশে এককভাবে বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণে জড়িত সরকারি প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)। বলা হচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নত সঞ্চালন এবং বিতরণ ব্যবস্থার জন্য অন্তত ৬০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ অবস্থায় সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়নের পাশাপাশি দূর করতে হবে এ খাতের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও। বিদ্যুৎ চুরি, অপচয় ও সিস্টেম লস রোধ করে সুষ্ঠু সরবরাহ নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগও নিতে হবে। তাই ঘরে ঘরে বিদ্যুতের অঙ্গীকার পূরণ করতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরবরাহ লাইনের উন্নয়ন করা না গেলে ভবিষ্যতে উৎপাদিত বিদ্যুতের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে না। বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি কমাতে পদক্ষেপ নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিষেশজ্ঞরা। দেশে বিদ্যুতের সামগ্রিক সিস্টেম লস কমাতে পারলে সরকারের ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচি সফল হবে নিঃসন্দেহে।

x