বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার

মো. ফারুক ইসলাম

শনিবার , ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ৬:২৯ পূর্বাহ্ণ
118

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার স্বাধীন, সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি দুটি অংশে বিভক্ত ছিলো। পশ্চিমের অংশটি পশ্চিম পাকিস্তান নামে এবং পূর্বের অংশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিতি পেলেও পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার দূরত্ব ছিলো প্রায় বারো শত মাইল। দূরত্বের পরেও ভাষাগত এবং সংষ্কৃতিগতভাবেও ছিলো ভিন্নতা। পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হলেও পশ্চিম পাকিস্তানীরা কোনদিনও পূর্ব পাকিস্তানকে সমান চোখে দেখেনি। শাসক সেজে শোষণের স্টিম রুলার চালিয়েছিল বছরের পর বছর। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী প্রথম আঘাতটা এনেছিল আমাদের মাতৃভাষার উপর। পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৫৬ জনের মুখের ভাষা বাংলা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা উর্দ্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র জনতা। ছাত্রজনতার তীব্র আন্দোলনকে দমানোর জন্য তৎকালীন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে। বাঙালী ছাত্রজনতা পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকদের চোখ রাঙানীকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে রাজপথে মিছিল বের করলে পুলিশ মিছিলে অন্যায়ভাবে গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পুলিশের গুলিতে সেদিন ভাষার জন্য জীবন দিতে হয়েছিল রফিক, জব্বার, সালাম, বরকতসহ নাম না জানা আরো অনেককে।

পাকিস্তানীরা যত বেশি নির্যাতন আর অত্যাচার চালিয়েছিল বাঙালীরা তত বেশি বীরদর্পে এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। পরবতীতে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, ৬৬’র জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭০’র নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা সবই বাঙালীদের অদম্য আন্দোলনের ফসল। কিন্তু পাকিস্তানী শাসকেরা কোন মতেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে রাজি ছিলো না। বরং আলোচনার নামে তালবাহানা শুরু করে সময়ক্ষেপণ করতে থাকে।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীদের দুরভিসন্ধি বুঝতে পেরে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে) স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। তিনি যার যা কিছুু আছে তা নিয়ে সকলকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। তাঁর ভাষণের মধ্যে দিয়ে বাঙালীরা মুক্তির স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে ২৫ মাচর্ রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানী হায়েনারা যখন নিরহ, নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙ্গালীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তখন ২৬ মাচের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে কিন্তু স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিলো। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির জন্য বাংলার দামাল ছেলেরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। পাকিস্তানী সৈন্যরা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেলেও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং স্বাধীনতার ঘোষণাকে বুকে ধারণ করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাংলাদেশের জনগণ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে ৩০ লক্ষ লোক দেশের জন্য শহিদ হন। ২ লক্ষ মাবোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানীরা জেনারেল নিয়াজীর নেতৃত্বে ৯৩ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্ম সমর্পণ করে। তাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বিজয় লাভ করে বিশ্বের বুকে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। বহু ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করে যাচ্ছি আমরা। কিন্তু স্বাধীনতার এতো বছর পরেও পরবর্তী প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে তুলে ধরতে বর্তমান সরকার কাজ করে যাচ্ছেন। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে বাংলাদেশ সরকার প্রতিটি বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপনের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ কর্নারে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য, ছবি, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই, মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের গল্প ফুটে উঠবে। এতে করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশদভাবে জানতে পারবে। সেই সাথে দেশের জন্য নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে উদ্বুদ্ধ হবে।

যুগান্তকারী এই উদ্যোগের ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বাংলাদেশের জন্ম এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানার পাশাপাশি তা বুকে ধারণ করে দেশমাতৃকার সেবা করার জন্য নিজেকে গড়ে তুলবে। এর পাশাপাশি নিজ দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতি তাদের জানার আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে। বর্তমান সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিটি জাতীয় দিবস যথাযোগ্য মযার্দায় পালন বাধ্যতামূলক করেছেন। বর্তমানে সারাদেশে জাতীয় দিবসগুলো যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন হয়ে আসছে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজ বিদ্যালয়ে এসেই বাংলাদেশের ইতিহাস এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে। ইতিমধ্যে দেশের সবগুলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপনের জন্য অধিদপ্তর থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় এব্যাপারে শিক্ষা অফিস থেকে বিষয়টা অবহিতও করা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপনের মাধ্যমে প্রতিটি বিদ্যালয় হবে মুক্তিযুদ্ধের ছোট্ট একটি যাদুঘরের মতো। যেখানে শিক্ষার্থীরা দেখবে, পড়বে, জানবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস। বাংলার সোনার ছেলেদের বীরত্বের ইতিহাস। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, প্রতিটি বিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধ কর্নার স্থাপনের সিদ্ধান্ত সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

x