বিদায় খসরু ভাই শেষ দেখা হলো না

শৈবাল চৌধুরী

মঙ্গলবার , ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৯:৩২ পূর্বাহ্ণ
112

খসরু ভাই অনেকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। ঢাকায় বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল তাঁর। একটু সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন। কথা ছিল ২২ তারিখ বিকেলে দেখতে যাবো তাঁকে। কিন্তু সে সুযোগ আর দিলেন না তিনি। বুক ভরা অনেক অভিমান নিয়ে চলে গেলেন ১৯ ফেব্রুয়ারি দুপুর একটায়। অনেক দুঃখ, অনেক কষ্ট, অনেক অপমান, অনেক অবহেলা তিনি সয়েছেন কেবল সিনেমার জন্যে। বলা ভালো সুস্থ সুন্দর সিনেমার জন্য। যে মানুষটি আমাদের সিনেমা দেখতে শিখিয়েছেন। সিনেমা পড়তে শিখিয়েছেন। সিনেমা লিখতে শিখিয়েছেন। এবং সিনেমা বানাতেও উদ্বুদ্ধ করেছেন।
এদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের সূচনা কে বা কারা করেছিলেন এটা নিয়ে খানিক ভিন্নমত অনেকের থাকলেও, এটা সকলে স্বীকার করেন মুহম্মদ খসরু এদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের পথিকৃৎ। কেউ বলেছেন চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ। আর নানা অবদানের কারণে তিনি কিংবদন্তীও বটেন এদেশের সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে।
মেজাজী মানুষটি খিস্তি খেউড় করে কথা বলতেন। আমরা বলতাম ‘খসরু ভাইয়ের অমৃতবাণী, কেউ কেউ বেহেশতী বাণীও বলতেন। তবে যারা তাঁর কাছে পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছেন তাঁরা এর মর্ম বুঝেছেন। তাঁর এসব কথাবার্তা আপাত দৃষ্টিতে অসৌজন্যমূলক মনে হতো অনেকের কাছে। অনেকেই তাঁকে এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু যারা তাঁর সংসর্গে ছিলেন তারা এসব কথাবার্তা থেকে নিজেদের গাইডেন্স খুঁজে পেতেন ঠিক।
আমার সঙ্গে মুহম্মদ খসরুর যোগাযোগ ১৯৮৩ সালের দিকে চলচ্চিত্র সংসদ করার সুবাদে। সে সময় তো আর মোবাইল ফোন ছিল না। ঢাকা গেলে দেখা হতো। আর যোগাযোগ হতো চিঠিপত্রে। কালে ভদ্রে ল্যান্ডফোনে কথা হতো। সব সময় সেই খিস্তি খেউড় দিয়ে শুরু। চিঠিপত্রেও। কিন্তু খানিক পরেই মমতা মাখা কথাবার্তা। প্রথম প্রথম একটু বিরক্ত লাগলেও পরে খুব উপভোগ করতাম তাঁর অমৃতভাষণ। বরং কোনোদিন যদি এসব না বলতেন তখন ভাবতাম শরীর খারাপ নয়তো। এটা বললে স্বমূর্তি ধারণ করে হেসে উঠতেন। পরে যখন মোবাইল ফোন এলো, কথা বলতেন অবিরত। কত প্রসংগ, কত বিষয়। চলচ্চিত্রের লোক হলেও শিল্প সাহিত্যের সকল বিষয়ে অসাধারণ বুৎপত্তি ছিল এই পণ্ডিত মানুষটির।
ঘর সংসার করেননি। শিল্পের সেবায়, বিশেষ করে চলচ্চিত্রের সুস্থতার বিকাশে কাটিয়ে দিলেন সারাটা জীবন। স্পষ্টবাদিতা যাকে আমরা সাধারণভাবে ঠোঁটকাটা বলি, এই গুণ বা দোষের কারণে অনেকের কাছে বিরাগভাজন হলেও সকলেই এই মানুষটিকে মান্য করে গেছেন। সামনে ও দূর থেকে সম্মান করে গেছেন। তেমনিভাবে অবহেলা, অপমান, দুঃখও পেয়েছেন অনেকের কাছ থেকে। পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষে। মারা যাবার পরও দেখলাম কেউ কেউ তাঁকে ‘পাগলা খসরু’ বলে সম্বোধন করেছেন ফেসবুকে! কিন্তু মুহম্মদ খসরুর যেখানে থাকবার সেখানেই থাকবেন। কেবল এদেশের সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলন ও চর্চার পথিকৃৎ হয়ে নয়, এদেশের সুস্থ সংস্কৃতি চর্চায় একজন অভিভাবক হয়ে। তিনি যাঁদের নিয়ে ১৯৬৩ সালে এদেশের চলচ্চিত্র সংসদ চর্চার সূচনা করেছিলেন তাঁরা ছিলেন শিল্প সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রধানতম ব্যক্তি। পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি গঠনের মধ্য দিয়ে এদেশের চলচ্চিত্রে সুস্থ বাতাবরণের সূচনা সে ১৯৬৩ সালে। সে বাতাবরণের ফলে এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে গড়ে উঠেছিল একটি সুস্থ ও সৎ নির্মাণের ধারা।
নানান কারণে বাংলাদেশে আজ চলচ্চিত্র সংসদ চর্চায় অনেকটা ভাটা পড়েছে সন্দেহ নেই। তবে এ চর্চা বন্ধ হয়ে যায়নি। সৎভাবে বলতে গেলে এদেশের সামগ্রিক শিল্প সংস্কৃতি চর্চায় তখন মন্দাক্রান্ত অবস্থা। চলচ্চিত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে মুহম্মদ খসরুর দেখানো পথে এখনো অনেক সৎ চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি কর্মী কাজ করে চলেছেন। তাঁর শুরু করা সেই আন্দোলন আজ ৫৬ বছর পরেও অটুট রয়েছে এবং প্রজন্মান্তরে তিনি স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তবে সুস্থ চলচ্চিত্র আন্দোলনের বর্তমান সংগীন সময়ে তাঁর প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিহার্য। মাথার উপর অভিভাবকের ছায়া দিয়ে যাচ্ছিলেন অন্তরালে থেকেও। আমরা হারালাম আমাদের সেই অভিভাবককে।
১৯৭০ এর দশকের শেষ দিকে হাসান আজিজুল হকের গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন খসরু ভাই। শেষ পর্যন্ত আর করে উঠতে পারেননি। সুস্থ চলচ্চিত্র চর্চায় প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তিনি রেখে গেছেন আরেক অনন্য ভূমিকা। তাঁর সম্পাদিত ধ্রুপদী ও চলচ্চিত্র পত্র বাংলা চলচ্চিত্র সাহিত্যের অসাধারণ সম্পদ। ধ্রুপদী ও চলচ্চিত্রপত্রের একেকটি সংখ্যা যেন একেকটি চলচ্চিত্র পাঠশালা, আমাদের শিখিয়েছে চলচ্চিত্র দেখতে, বুঝতে, শিখতে, পড়তে এবং লিখতে।
খসরু ভাই ঋত্বিককুমার ঘটকের প্রিয় অনুরাগী ছিলেন। তিতাস একটি নদীর নামের নির্মাণে সরাসরি সংযুক্ত না থাকলেও একনিষ্ঠভাবে সে সময় ঋত্বিকের সঙ্গে ছিলেন। সে সময়ে তিনি ধ্রুপদীর জন্যে ঋত্বিকের যে অসামান্য সাক্ষাৎকারটি নেন, সেটি আজ ঋত্বিকচর্চায় অপরিহার্য একটি উপকরণ। রাজেন তরফদারে পালংক চলচ্চিত্রের সহকারী পরিচালক ছিলেন তিনি। রাজেন তরফদারেরও একটি বিস্তারিত সাক্ষাৎকার তিনি নিয়েছিলেন ধ্রুপদীর জন্যে। এটিও একটি অসাধারণ কাজ খসরু ভাইয়ের।
১৯৯০ সালে কলকাতায় অনুষ্ঠিত ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে খসরু ভাইয়ের সঙ্গে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। নিজের চোখে দেখেছিলাম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের চলচ্চিত্র নির্মাতা ও কর্মীদের কাছে কত প্রিয় ও শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন তিনি। অনেক বিদেশী চলচ্চিত্রকারের সঙ্গেও তাঁর আন্তরিকতা চাক্ষুষ করেছি তখন। প্রতিদিন সকালে তিনি ঠিক করে দিতেন কোন কোন ছবি দেখবো। কোন বইটা কিনবো এবং কার কার সাথে কথা বলবো (চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব) সে বিষয়েও তিনি পরামর্শ দিতেন। এই নির্ভরশীলতা আমার অটুট ছিল তাঁর উপর বরাবর। আমাদের চট্টগ্রামের প্রকাশনাগুলোর (লুক থ্রু, নিউ ওয়েভ) খুবই প্রশংসা করতেন। ধ্রুপদীতে লেখার সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি আমাকে ষষ্ঠ সংকলনে ২০০৬ সালে যা আমার লেখক জীবনের একটি বড় প্রাপ্তি, ধ্রুপদীর সপ্তম সংখ্যা যেটিকে তিনি শেষ সংখ্যা বলে অভিহিত করেছিলেন, সেটিতেও আমি লেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। সেটি এখনো প্রকাশিত হয়নি। কাজ চলছিল সমগ্র ধ্রুপদীর অখণ্ড সংকলন প্রকাশেরও। অসমাপ্ত কাজগুলো আর শেষ হবে কিনা কে জানে?
মুহম্মদ খসরু এদেশের সৎ ও সুস্থ চলচ্চিত্রের জগতে স্বয়ংসমৃদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান। যে প্রতিষ্ঠানের সততা, দায়বদ্ধতা, অবিচল চলচ্চিত্রনুরাগ, নির্ভীকতা এবং আন্তরিকতা এদেশের চলচ্চিত্র চর্চার ক্ষেত্রেই শুধু নয় সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন। এদেশে চলচ্চিত্র সংসদ চর্চা যতদিন টিকে থাকবে মুহাম্মদ খসরুর নাম ও অবদান অবশ্যই উচ্চারিত হবে পরম শ্রদ্ধার সাথে।

x