বিদায়ী বছরের শেষ বেলায় আনন্দের গল্প

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:০০ পূর্বাহ্ণ
32

ধোঁয়া-ধূলোর মিশেলে যে-কুয়াশাটা এ মুহূর্তে দূরের চোখে দেখছি সেটা জীবনানন্দের ধোঁয়াটে, ধারালো, রহস্যের কুয়াশা নয়। এ কুয়াশায় ডুব দিয়ে হাঁটার কথা ভাবাই যায় না। তার চেয়ে বরং শিরীষ-মেহগনির, বাদাম-কদমের ডালের আড়ালে কৃঞ্চপক্ষের না সোনালী, না-রূপালী থালার মতো চাঁদটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে বেশ লাগবে যে-কারও। চাঁদটা চোখের উপর দেখতে না দেখতে শাদা কাগজের চাঁদ হয়ে আকাশের গায়ে সেঁটে যায়। পায়ের নিচে করুণ সোনাপাতির এখন না আছে জেল্লা না পুষ্টি। অথচ হেমন্তের সোনাপাতি পায়ের নিচে কেমন পটকার মতো ফুটে প্রশ্ন করত, মাড়াচ্ছ কেন? আসলে প্রকৃতি কাজ করে যায় তার নিজের নিয়মে। ঋতুভেদে কেউ রিক্ত হয়, কেউ ঋদ্ধ। এ লেখা যখন ছাপার অক্ষরে ফুটবে তখন আর মাত্র একটি দিনের অপেক্ষা। রুদ্ধশ্বাসে ভোটের প্রহর গুণছে সারাদেশ। সেই সঙ্গে পাততাড়ি গুটিয়ে নিচ্ছে ২০১৮; সামনে নতুন বছর ২০১৯। বছরটি শুভ হোক, আনন্দের হোক, কাঙ্ক্ষিত হোক সকলের।
বছরের শেষে, নারী পাতায় আজকের দিনে পুরনো দুঃখ নিয়ে কোনও কথা বলবো না। যাঁরা বলছেন ‘নারী-পুরুষের সমতায় বাংলাদেশের অর্জন রীতিমতো উদযাপনযোগ্য, তাঁদের কথারও কোনও প্রতিবাদ করবো না। আবার যাঁরা এবারের সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে সর্বমোট মাত্র ৩৫ জন নারী প্রার্থীর সংখ্যা নিয়ে হা-হুতাশ করছেন বা যাঁরা এ-সংখ্যাকে রেকর্ড সংখ্যক ৬৮ তে তুলে আত্মপ্রসাদ লাভ করছেন তাঁদের কারও পক্ষেই আজ কথা বলবো না। জানি, ইশতেহার শেষ পর্যন্ত কিছুই নয় বরং মহাজন ভাষ্যের মতো ‘মানুষ প্রতিজ্ঞা করে প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গিয়া হাঁফ ছাড়িয়া বাঁচিবার জন্য’ তবু মিথ্যে করে হলেও নারীর জন্য একটা জিরো টলারেন্সের প্রতিশ্রুতি যে কেউ দিলেন না সে নিয়েও কিছু বলবো না। আজ বরং অন্যকথা বলবো। বলবো ইংরেজি বছরের শেষ দুমাসে পাওয়া দুটি আনন্দের কথা। প্রথমটি হাওয়ায় ভেসে আসা আনন্দ। দ্বিতীয়টি এই নগরীর শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলে চোখের জলে ভাসা আনন্দ।
হাওয়ায় ভেসে আসা আনন্দটি লিট-ফেস্টের; গত ৮ বছরের ধারাবাহিকতায় গত মাসের (নভেম্বর) ৮ থেকে ১০ তারিখের ৩ দিনে যে উৎসবে ১৫টি দেশের ২ শতাধিক বক্তা, চিন্তাবিদ, পারফর্মার মিলে আনন্দ করেছেন, আনন্দ দিয়েছেন। এর বিস্তারিত বিবরণে যাবার ইচ্ছে আমাদের নেই কারণ তার প্রয়োজন নারী পাতায় নেই। আমরা লক্ষ করেছি নারীদের নিয়ে কাজ করার বা কথা বলার একটা প্রয়াস এ অনুষ্ঠানের অন্যতম দিক ছিল। কিছু অধিবেশন ছিল সম্পূর্ণ নারীকেন্দ্রিক। যেমন, ‘নো নোবেল: # মি টু ইন লিটারেচার।’ এখানে আলোচনায় এলেন জুয়ান ডিয়াজ, জনপ্রিয় মার্কিন কথাসাহিত্যিক। এর বিরুদ্ধে ‘হ্যাশট্যাগ মিটু’র মাধ্যমে যৌন হয়রানির অভিযোগ এলে এ বছরের নোবেল পুরস্কারই স্থগিত হয়ে গেল। কি হবে অতঃপর? আরেকটি অধিবেশনের বিষয় ছিল, ‘রেপ বাই কম্যাণ্ড: দ্য আফটারমাথ। ‘# মিটুর যুগে বাঙালি সমাজ ও নারীত্ব ’ অধিবেশনটির গুরুত্ব নামকরণ থেকেই উপলব্ধ হয়। ছিল, উইমেন অ্যাণ্ড উইট’ ও ‘বাংলা সাহিত্য: নারী ও পুরুষ’ শিরোনামের অধিবেশন। ‘দ্য সেইন্টস অব সিন’ অধিবেশনে বাংলা ভাষাভাষী ৮ জন নারীর মুখে শোনা গেল তাদের সুখ-দুঃখ ও সংগ্রামের কথা। নারীর ক্রোধ, ঈর্ষা, লালসা বা নিদেনপক্ষে তার আলস্যের মতো মানবিক প্রবৃত্তিগুলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে ‘পাপ’ বলে গণ্য হয়। আলোচনায় উঠে এসেছে এইসব কথা।
‘গার্লস পাওয়ার’ অধিবেশনে ৩ নারী খেলোয়াড় বলেছেন নানা ধরনের বাধা অতিক্রম করে তাদের এগিয়ে যাওয়ার গল্প। ‘হোয়াট নট টু ওয়্যার’ এর আলোচনার বিষয় সহজেই অনুমেয়। ‘আদি কথা ও নৃ’ অধিবেশনটিতে ভারত ও বাংলাদেশের আদিবাসীদের নিয়ে কথা হয়েছে। গারো কবি মিঠুন রাকসাম বলেন,‘মাতৃতান্ত্রিক যে গারো সমাজে ‘ধর্ষণ’ শব্দটির কোনও অস্তিত্ব ছিলনা আজ সেখানে নিজ নিজ গোত্রের মধ্যেই এ ধরনের নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে।
এ সমস্ত অধিবেশন ছাড়াও আলোচনা, পারফরম্যান্স, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী আনপ্লাকড মিউজিক কনসার্টসহ শতাধিক সেশনে নারীর উপস্থিতি এবং নারীকেন্দ্রিক আলোচনা তো ছিলই। বিশেষভাবে নিজের কথা বলবেন বলে এসেছিলেন নন্দিতা দাশ, মনীষা কৈরালা এবং আন্তর্জাতিক কবিখ্যাতিপ্‌্রাপ্ত ৬ জন নারী। ছিল রোহিঙ্গা নারীদের নিয়ে কথা। ছিল নারী বাউল শিল্পীদের উপস্থিতি।
লিট-ফেস্টের উদ্যোক্তা-আয়োজক এবং আলোচকবৃন্দ বরাবর এবং বারবার সুযোগ পেলেই ‘নারীবাদ’ ইস্যুটি নিয়ে কথা বলেছেন। নারীর কথা বলেছেন। উৎসবের দ্বিতীয় দিনে ‘ব্রেকিং ব্যাড’ অধিবেশনে ক্যান্সারজয়ী মনীষা কৈরালা অনেক কথা বলেন। তিনি বলেছেন, জীবন আসলেই সুন্দর। বলেছেন, স্রষ্টার অপূর্ব উপহার এ জীবন। ক্যান্সারের কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কারণ ক্যান্সার তাঁকে জীবনের মূল্য বুঝতে শিখিয়েছে এবং জীবনের জন্য যুদ্ধ করতে শিখিয়েছে। অতঃপর নতুন করে ফিরে পাওয়া জীবনে যা কিছু তিনি বলেছেন বা বলবেন তার সবই তাঁর ফেলে আসা জীবনের মর্মমূল থেকে উঠে আসা ক্ষোভ, আর্তি ও বেদনা ভিন্ন আর কিছুই নয়। মনীষা বলেন, নারী সফল কি অসফল তার বিচার হবে সে বিয়ে করেছে কি না এই দিয়ে? তিনি বলেন, নারীর ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে বয়স, ওজন এবং তার গায়ের রঙ বেশি গুরুত্বপূর্ণ? কিন্তু কেন? মনীষা দেখেছেন ৬০ বছরের নায়কের সঙ্গে ২০ বছরের নায়িকা দিব্যি মানানসই। কিন্তু নায়িকার ৪০ পেরুলো তো তাকে মায়ের ভূমিকায় যেতে হবে। সেটা না চাইলে একের পর এক অস্ত্রোপচারের ধকল সয়ে যেতে হবে। হ্যাঁ, একজন নারী পরিচালক, এর বাইরে যেতেই পারেন। কিন্তু তাদের সংখ্যা তো অঙ্গুলিমেয় এখনও। ২০ শতাংশেরও কম। হ্যাঁ, নন্দিতা দাশ এদেরই একজন। তবে তিনি তো শুধু পরিচালক নন। তিনি একসঙ্গে অনেককিছু।
ভারতবর্ষের চলচ্চিত্র জগতের রথী-মহারথীদেরই একজন নন্দিতা দাশ। লিট-ফেস্টে তিনি এসেছেন তাঁর দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবি ‘মান্টো’ নিয়ে। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে বানিয়েছিলেন ফিরাক। নন্দিতা ভারতের অসাধারণ অভিনেত্রীদের মধ্যেও অন্যতম একজন। তিনি নারীবাদীও বটে তবে মানবতাবাদের বৃত্তে অনায়াসে যে নারীবাদ নন্দিতার বিচরণ সেখানে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘#মি টু’ কে তিনি কোন্‌্‌ দৃষ্টিতে দেখছেন। তাঁর উত্তরটি ছিল এরকম: পুরুষপ্রধান এ সমাজে নারীর অধিকার কখনও পুরুষের সমান ছিল না। তাই আন্দোলন অনিবার্য হয়েছে। আন্দোলনটা এগুচ্ছেও ভালোভাবেই। তবে এর অপব্যবহার যাতে না হয়। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন এ আন্দোলন প্রকৃত অর্থে কোনও পুরুষের বিরুদ্ধে নয়। ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধেই এ আন্দোলন।
সব ভালো যার শেষ ভালো। আসছি ডিসেম্বরের (২০১৮) শেষবেলায় বিস্তার শিল্পোৎসবের শেষদিনের গল্পে। শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার হলের মায়াবী পর্দায় চোখ পেতে বসে আছি। ছবি আঁকিয়ে জলিকে (দিলারা বেগম জলি বা দিলারা জলি) জানতাম কিন্তু ছবি বানিয়ে জলিকে চিনি না। জানতাম জরায়ু নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনাপ্রসূত কাজ জলি করে যাচ্ছেন অনেকদিন ধরে। এই সেমিনার হলের ওপর তলায় বেশ কয়েক বছর আগে ‘অমরা’র প্রদর্শনী দেখেছিলাম আমরা। আপন দেহের গোপন গভীরে শুধু নয়, আপন সত্তার গহীন গোপনে নারী একটি প্রত্যঙ্গ ধারণ করে যেখানে মানব ভ্রুণ আশ্রয় পায়, খেলা করে। সে শুধু তার সন্তান নয়, সে-ই রক্ষা করে প্রজন্মের ধারাবাহিকতা। সে-ই ধরিত্রীর প্রাণ-প্রদীপ। গভীর মগ্নতায় এসব যখন ভাবছি তখন শাদা পর্দায় কালো অক্ষরে ফুটে উঠেছে কিছু কথা।
যুদ্ধ জরায়ুর বিনাশ চায়। জরায়ু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। যুদ্ধের ওপারে।
যে কথাটি লেখা হয়নি আমি সে কথাটিও মনে মনে পড়ে নিলাম। আর এই জরায়ুর জন্য যুদ্ধ করে নারী। জরায়ুকে সে বাঁচিয়ে রাখে। নিয়ে যায় যুদ্ধের ওপারে। আহা, ছবি শুরু হবার আগেই এমন সব অবশ-বিবশ করা কথা! পর্দায় ফুটে উঠলো শব্দে, সুরে, ছন্দে, তালে দুটি পংক্তি:

জলের আগুনে পুড়ে হয়েছি কমল
কি দিয়ে মুছবো বল আগুনের জল।

অতঃপর পর্দা জুড়ে অপার বিস্ময়, রমা চৌধুরী। ’৭১ এর জননী রমা চৌধুরীকে প্রতীক ধরে নিয়ে জরায়ুযুদ্ধের শিকার এদেশের লক্ষ লক্ষ নারী মুক্তিযোদ্ধাকে স্মরণ করে ছবি নির্মাণ করেছেন দিলারা জলি। তাঁকে সালাম।
পোপাদিয়ার পোড়ো বাড়ির কাছে, তাঁর বাগ-বাগিচা, পাখ-পাখালির কাছে, সুচিক্কন জলপানার আস্তরে বুজে আসা দুঃসহ স্মৃতিবহ সেই পুকুরের কাছে রমা চৌধুরীর বার বার ফিরে আসা, আলাউদ্দিন খোকনের হাত ধরে পিচ ঢালা পথে নগ্নপদে তাঁর জীবন পরিক্রমণ, তাঁর পোষ্যপ্রীতি, তাঁর সন্তানদের স্মৃতি দেখতে দেখতে এবং তাঁর আত্মোন্মোচনের, তাঁর অন্তর্দহনের কথা তাঁরই টুকরো-টাকরা ভাষ্যে শুনতে শুনতে হলভর্তি দর্শকের ঝাপসা চোখের উপর একসময় জ্বলে উঠে ঘরের সবকটা বাতি।
রমা চৌধুরী তাঁর অনির্বাণ জীবনের গল্পে, তাঁর পংক্তিতে, তাঁর বাণীতে তাঁর ভাষ্যে জলির কাজটাকে সহজ করে দিয়েছেন বলবো না, বলবো যে এগিয়ে দিয়েছেন। ২০১৮র শেষবেলায় এমন একটি ছবি বছরের শুরুতে হারানো (৬ মার্চ ২০১৮) ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনীকে মনে করিয়া দিল। মনে করিয়ে দিল সবশেষে হারানো তারামন বিবিকে। আমাদের কৃতজ্ঞতার জলের আগুনে পুড়ে কমল হোক দিলারা জলি। তাঁর জন্য অপার শুভ কামনা।

x