বিজ্ঞাপনে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা

দুর্নীতি বন্ধে জরুরি পারিবারিক শিক্ষা

আয়শা আদৃতা

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ১০:১৭ পূর্বাহ্ণ
18

আজ কথা বলব, কিছু জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনের প্রচার নিয়ে। বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্রে প্রতিদিন একাধিক সরকারি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়, জনগণকে বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করতে প্রচার করা হয় এসব বিজ্ঞাপন। জঙ্গিবাদ বিরোধী, বাল্য বিয়ে সম্পর্কে, গুজব হতে সাবধান থাকতে, সততা বিষয়ে স্কুল শিক্ষার্থীদের সচেতনতা তৈরি, প্রতারক ও দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারানো, বিদেশ যাওয়ার প্রলোভনে যুবকদের সর্বশান্ত করা, গ্রাম আদালত বিষয়ে প্রচারণা, এরকম আরো নানা বিষয়ে প্রচারিত হয় বিজ্ঞাপনগুলো। প্রত্যেক দর্শকের উচিত এসব বিজ্ঞাপন দেখা। কোনো কোনো বিজ্ঞাপন এতটাই হৃদয়গ্রাহীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে, দেখলে চোখে জল চলে আসে। ঢাকায় নির্মিত এসব বিজ্ঞাপন অন্যান্য চ্যানেলেও প্রচারিত হয়।
সততা স্টোরের বিজ্ঞাপনটার কথাই ধরা যাক। বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, স্কুল শিক্ষিকা ছাত্রদের কাছে সততা স্টোর সম্পর্কে ধারণা দিচ্ছেন। সৎ থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। সব শিক্ষার্থী মনোযোগ সহকারে শিক্ষিকার কথা শুনলেও একজন সেটাকে আমলে নিচ্ছে না। দুদকের সহায়তায় স্কুলে স্থাপিত সততা স্টোরে কোনো বিক্রয়কর্মী থাকেন না। নিজের জিনিস নিজে বাছাই করে মুল্যতালিকা দেখে কিনে নিতে হয়। তারপর কেনা পণ্যের মূল্য নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হয়। এতে করে, একজন শিক্ষার্থী চুরি করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, কি পণ্য নিচ্ছে তা কেউ না দেখা সত্ত্বেও নিজের প্রতি সৎ থাকতে পারে। বিজ্ঞাপনে একজন ছাত্রের অসৎ হওয়া, জ্যামিতি বাক্স চুরি করে বাসায় গিয়ে মা-বাবার শাসনের পর আবারো সৎ পথে ফিরে আসার হৃদয়স্পর্শী বর্ণনা দেয়া হয়েছে। এই বিষয়টিই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। কারণ, একজন মানুষ সৎ থাকার প্রাথমিক শিক্ষাটা পায় পরিবার থেকে। পরিবার যদি কাউকে অসৎ কাজ হতে বিরত থাকতে বাধা না দেয়, সৎপথে চলতে উৎসাহিত না করে তবে যে কেউ সহজেই দুর্নীতিবাজ হয়ে যেতে পারে। দেশে বিভিন্ন স্তরে দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ পারিবারিক শিক্ষা। এ বিজ্ঞাপন যদি সে জায়গায় কিছু মানুষকে হলেও সচেতন করতে পারে তবেই স্বার্থকতা।
বাল্য বিয়ে সম্পর্কে দুটি বিজ্ঞাপনের কথা আলাদা করে বলা যায়। একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, এক স্কুল ছাত্রী বান্ধবীদের সাথে ক্লাসের বিরতিতে ক্রিকেট খেলছে। এ সময় তার বাবা এসে তাকে বাসায় নিয়ে যেতে চায়। কারণ, তার বিয়ের জন্য ছেলে পক্ষ তাকে দেখতে আসবে। কিন্তু ওই স্কুল ছাত্রীটি যেতে চায় না। বাবা জোর করতে থাকলে মেয়েটি লেখাপড়ার কথা জানায়। পাশেই দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিলেন স্কুলের দাঁড়োয়ান এবং মেয়েটির সহপাঠীরা। এমন সময় স্কুলের দাড়োয়ান তালে তালে ঘণ্টা বাজালেন। আর সাথে সাথে মেয়েটির সব সহপাঠী হাতে তালি বাজাতে লাগল। কোনো কথা না বলে প্রতিবাদের অন্যরকম ভাষা। এ ভাষা দিনকে দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে। একইরকম চিত্র দেখা যায়, বাল্য বিয়ে নিয়ে অন্য একটি বিজ্ঞাপনেও। সে বিজ্ঞাপনচিত্রে দেখা যায়, বাসে করে বাবার সাথে স্কুলছাত্রীটি যাচ্ছে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। সে বাসেই উঠেন মেয়েটির বাবার পরিচিত এক ঘটক। ঘটক মেয়েটির বাবাকে মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে ঘটক লোভও দেখান। কিন্তু মেয়েটির বাবা রাজি হন না।

তখন বাসে থাকা অন্য যাত্রীরা হাতে তালি দিয়ে জনসমর্থন সৃষ্টি করেন। প্রতিবাদের ভাষা একজন থেকে ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে, সৃষ্টি হয় সাহসের। আর এক পর্যায়ে ঘটক পালিয়ে যেতে বাধ্য করা হয়। এসব বিজ্ঞাপনে বাল্য বিয়ে রোধে ১০৯ নাম্বারে ফোন করার অনুরোধ জানানো হয়। তবে যেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা হলো, নীরবে জনসমর্থন সৃষ্টি করা। আমাদের দেশে, অনেক অঞ্চলে এখনো মেয়েদের বাল্য বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউএনও, পুলিশ কিংবা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকক্ষেত্রে বাল্য বিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। তবে, যেসব খবর কারো কানেই পৌঁছে না, এমন অসংখ্য বাল্য বিয়ের ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে।
তাই এক্ষেত্রে মা-বাবার সচেতন হওয়া, শক্ত হওয়া যেমন জরুরি তেমনিভাবে স্কুল শিক্ষকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
কেননা, স্কুল শিক্ষার্থীরা মা-বাবার পরে স্কুলের শিক্ষকদের উপরেই ভরসা করে। তাদের পাশে দাঁড়ানো, স্কুল পাঠ্য বিষয়ের পাশাপাশি এসব বিষয়েও সচেতন করা শিক্ষকদেরও দায়িত্ব।

x