বিখ্যাত লেখকদের নারীবান্ধব মন্তব্য কিংবা এর বিপরীত পাঠ

মাধব দীপ

শনিবার , ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
16

‘স্ত্রীলোকদিগের উপর যেমন কঠিন শাসন, পুরুষের উপর তেমন কিছু নেই। কথায় কিছু হয় না, ভ্রষ্ট পুরুষের কোন সামাজিক দণ্ড নেই। একজন স্ত্রী সতীত্ব সম্বন্ধে কোন দোষ করিলে সে আর মুখ দেখাইতে পারে না। হয়তো আত্মীয়-স্বজন তাকে বিষ প্রদান করেন, আর একজন পুরুষের প্রকাশ্যে সেই সব কাজ করিয়া রোশনাই করিয়া জুড়ি হাকাইয়া রাত্রিশেষে পত্নীকে চরণরেণু স্পর্শ করাইয়া আসেন, পত্নী পুলকিত হয়েন।’ -বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

নারীকে নিয়ে পুরুষের মন্তব্যের শেষ নেই। পৃথিবীর তাবৎ পুরুষ কবি-শিল্পী-সাহিত্যকরা যতোটা না নারীকে নিয়ে লিখেছেন তার সিকিভাগও বোধ করি পৃথিবীর নারী কবি-শিল্পী-সাহিত্যকরা পুরুষকে নিয়ে লেখেননি। এবং এটা স্পষ্টতই যে- ওইসব লেখনি বা উক্তির বেশিরভাগেই রয়েছে নারীদেহের রূপ-লাবণ্যের বর্ণনা, স্তুতিকীর্তন, ভোগ্যসামগ্রী হিসেবে নারীর চিত্রায়ণ অথবা ভয়ঙ্কর ও ছলনাময়ী হিসেবে নারীকে পাঠকের কাছে উপস্থাপন। আর এসবকিছুকে ছাপিয়ে নারীকে বহুমাত্রিক উপায়ে হেয় করার যাবতীয় চেষ্টাও করা হয়েছে যুগে-যুগে।
তাই, নারীকে নিয়ে এমনকিছু মন্তব্য যখন আমরা পাই আমাদের অতি পরিচিত, অতি প্রিয় কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-বা দার্শনিকদের কাছ থেকে যা চরমভাবে পুরুষতান্ত্রিক তখন আমরা এই আজকের সময়ে এসে তা মেনে নিতে পারি না। মনে নিতে পারি না। তবে- আশা জাগানিয়া কিংবা নারীপ্রগতিকে উৎসাহিত করে কিংবা পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যকে সমালোচনা করে- এমন লেখাও কিন্তু কম নয়! এসব লেখা বা উক্তি যেমন গভীরভাবে সমাজের ক্ষতকে চিহ্নিত করে এ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেয় তেমনি বিপরীতধর্মী লেখাগুলো সমাজের প্রগতিকে আটকে দিয়ে নারীকে- নারীর ক্ষমতা ও অর্জনকে হেয় করার দিকে আমাদের মনোজগতকে প্ররোচিত করে। নারীকে নিয়ে তেমনি কিছু উক্তি বা সারলেখনি নিয়ে আজকে এই লেখার অবতারণা।
প্রথমেই শুরু করা যাক- হুমায়ূন আজাদের কয়েকটি বাস্তবধর্মী ইতিবাচক উক্তি দিয়ে। তিনি তাঁর ‘প্রবাদ-প্রবচন’ গুচ্ছে লিখেছেন- ‘পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা’। নারী মা হয়ে যাওয়ার পর কীভাবে চারদেয়ালের মধ্যে বন্দী হয়ে যায় তাই ফুটে ওঠেছে এই বাক্যটিতে। কিছুদিন আগে একটা গবেষণা ফলাফলে দেখেছিলাম সেখানে আমেরিকার ২০০০ নারীর উপর গবেষণা চালানো হয়েছিলো। ফলাফলে বলা হয়েছিলো-একজন মা আড়াইটা ফুলটাইম জবের সমান পরিশ্রম করে। তখন হুমায়ূন আজাদের ওই উক্তিটি বারবার মনে পড়ছিলো। বাংলাদেশের নারীর অগ্রগতি সম্বন্ধে গিয়ে তিনি বলেছিলেন- ‘গত দু-শো বছরে গবাদিপশুর অবস্থার যতোটা উন্নতি ঘটেছে নারীর অবস্থার ততোটা উন্নতি ঘটে নি’। বর্তমান বাস্তবতায় অনেকেই হয়তো এই উক্তির সাথে একমত হবেন না কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এই উক্তির যথার্থতা হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। হয়ত একারণেই তিনি বলেছিলেন ‘বিশ্বের নারী নেতারা নারীদের প্রতিনিধি নয়; তারা সবাই রুগ্ন পিতৃতন্ত্রের প্রিয় সেবাদাসী’। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন তিনি আমাদের চোখের সামনের বাস্তবতাকে তুলে ধরেন এভাবে- ‘ছেলেটি তার বিছানা গুছিয়ে না রাখলে মা খুশি হয়, দেখতে পায় একটি পুরুষের জন্ম হচ্ছে; কিন্তু মেয়েটি বিছানা না গোছালে একটি নারীর মৃত্যু দেখে মা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।’
হুমায়ূন আজাদ আবার তাঁর এক উক্তিতেও হেয়ও করেছেন নারীকে। তিনি বলেছেন-‘অধিকাংশ রূপসীর হাসির শোভা মাংসপেশির কৃতিত্ব, হৃদয়ের কৃতিত্ব নয়।’ এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথও বাদ যাননি এধরনের মন্তব্য করা থেকে। তিনি বলেছেন- ‘পুরুষের বুদ্ধি খড়গের মতো; শান বেশি না দিলেও কেবল ভারেই অনেক কাজ করতে পারে। মেয়েদের বুদ্ধি কলম-কাটা ছুরির মতো; যতই ধার দাওনা কেনো, তাতে বৃহৎ কাজ চলে না।’ আবার তিনি বলেছেন- ‘মেয়েদের সম্মান মেয়েদের কাছেই কম।’ এই উক্তিটির সুর যেনো বেজে ওঠে হুমায়ূন আজাদের আরও একটি অভিজ্ঞতায়। তিনি বলেছিলেন- ‘নারী সম্পর্কে আমি একটি বই লিখছি; কয়েকজন মহিলা আমাকে বললেন, অধ্যাপক হয়ে আমার এ-বিষয়ে বই লেখা ঠিক হচ্ছে না। আমি জানতে চাইলাম, কেনো ? তাঁরা বললেন, বিষয়টি অশ্লীল!’ তবে রবীন্দ্রনাথ এও বলেছেন যে- ‘ নারী দাসী বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে নারী রাণীও বটে।’
বিখ্যাত সাহিত্যিক-লেখকদের মধ্যে টলস্টয় একবার বলেছিলেন- ‘মেয়েরা সাধারণত এতো খারাপ যে ভালো আর মন্দ মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্যই করা যায় না।’ সক্রেটিস-এর মতে- ‘নারী হচ্ছে বিশ্বে কলহ, কোন্দল এবং বিপর্যয়ের বিরাট উৎস।’ সিগমুন্ড ফ্রয়েড বলেছিলেন- ‘একটাই প্রশ্ন, যার কোনো উত্তর আজও আমি দিতে পারিনি। সেটা হচ্ছে , একজন নারী কী চায়।’ দার্শনিক জোসেফ বুটলার এর মতে- ‘একজন পুরুষ সর্বদা অর্থ উপার্জনের ধান্ধায় থাকে আর একজন মহিলা তার দেহগঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকে।’
গ্রিক নাট্যকার মেনানডিরের মতে- ‘পৃথিবীতে বা সমুদ্রে যত হিংস্র প্রাণী আছে সবচেয়ে বৃহত্তম প্রাণী হল মেয়েরা।’ শংকর এর মতে- ‘কম বয়েসী মেয়ে হলো রসগোল্লার মতো, যেখানে রাখবে সেখানেই পিঁপড়ে ধরবে।’ নেপোলিয়নের মতে- ‘পুরুষেরা মেয়েদের খেলার সামগ্রী আর মেয়েরা শয়তানের খেলার সামগ্রী।’ আরও একধাপ এগিয়ে তিনি এও বলেন যে- ‘মেয়েরা সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র বৈ কিছু নয়।’ সাহিত্যিক জেনবি তো তাচ্ছিল্যের সুরে বলেন, ‘মেয়েদের একটি ভালো স্বভাব, কথা না বলে থাকতে পারে না।’ পিথাগোরাসের মতে- ‘মেয়েদের চোখে দুই রকমের অশ্রু থাকে, একটি দুঃখের অপরটি ছলনার।’
জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদও রূপবতী নারীর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে- ‘যে নারীকে ঘুমন্ত অবস্থায় সুন্দর দেখায় সেই প্রকৃত রূপবতী।’ কাজল পরার সাথেও মেয়েদের সৌন্দর্যের সংযোগ স্থাপন করেছেন তিনি। বলেছেন- ‘কাজল ছাড়া মেয়ে দুধ ছাড়া চায়ের মত।’ আরেক জায়গায় বলেছেন- ‘মেয়েদের স্বভাবই হচ্ছে হালকা জিনিস নিয়ে মাতামাতি করা। আবার অন্য এক লেখায় বলেছেন- ‘মেয়েরা এমনিতেই সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত হয়। পেটে সন্তান থাকা অবস্থায় সন্দেহ রোগ অনেকগুণে বেড়ে যায়।’
বাউল হাসন রাজাও নারীকে দোষারোপ করেছেন যে নারীসঙ্গই তাঁর ‘মূলধন’ হারানোর কারণ। তিনি বলেছেন- ‘যৌবন ঘুমেরই স্বপন সাধন বিনে নারীর সনে হারাইলাম মূলধন।’ আবার নারীর দেহে ভোগকাতরতা খুঁজে পেয়েছেন তিনি এভাবে- ‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে…।’
প্রবাদেও প্রাচীনকাল থেকেই নানাসময়ে নারীর মর্যাদাকে, নারীর ব্যক্তিত্বকে নানা কৌশলে ছোট করে দেখে পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের গুনগান গাওয়া হয়েছে। যেমন প্রবাদে বলা হয়েছে- ‘নারীর বয়স তার দেহে, পুরুষের বয়স তার মনে’; ‘নারীর হৃদয় সাপের, বুদ্ধি গাধার, রূপটা দেবীর, চোখটা ধাঁধার।’
বিখ্যাত উপন্যাসিক সমরেশ মজুমদারও মেয়েদের কটাক্ষ করেছেন এভাবে- ‘নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা মেয়েগুলো তাদের সবরকম কনজারভেটিভ ধারনা বুকে পুষে রেখে এমন ভাবভঙ্গী করে যেন পৃথিবীর সব ছেলেই তাদের দিকে হামলে পড়ছে।’ মেয়েদের পৃথিবীকে জানার আগ্রহ নেই বা থাকে না বলেও তিনি এক লেখায় মত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- ‘মেয়েরা গণেশের মত, মা দূর্গার চারপাশে পাক দিয়ে যে জগত দেখে তাতেই তৃপ্তি আর পুরুষরা কার্তিকের মত সারা পৃথিবী ঘুরে আসে অথচ কি দেখে তা তারাই জানে না।’ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে- ‘মেয়েমানুষের এরকম হয়, ওরকম হয়, সব রকম হয়, শুধু মনের মত হয় না।’ প্রবোধকুমার স্যানালের মতে- ‘মেয়েদের চরিত্রের মাধুর্য পাওয়া যায় কুমারী অবস্থায়।’
তবে বেগম রোকেয়ার উত্তরসুরি হিসেবে তসলিমা নাসরিন যথার্থই বলেছেন যে- ‘নিজেদের অধিকারের ব্যপারে সামান্য সচেতন হলে মেয়েরা নিশ্চয়ই বুঝতো যে জগতে যত নির্যাতন আছে মেয়েদের বিরুূদ্ধে সবচেয়ে বড় নির্যাতন হল, মেয়েদেরকে সুন্দরী হওয়ার জন্য লেলিয়ে দেওয়া।’ আবার তিনি যখন লেখেন- ‘পৃথিবীর ইতিহাসে, কোনও অন্ধকার সমাজে যখনই কোনও নারী পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, নিজের স্বাধীনতার কথা বলেছে, ভাঙতে চেয়েছে পরাধীনতার শেকল, তাকেই গালি দেওয়া হয়েছে পতিতা বলে’ -তখন আমরা আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে এর মধ্যে খুঁজে পাই।
সুতরাং, নারী নিয়ে বিখ্যাত মানুষদের কিছু উক্তি, মতামত বা গুটিকয়েক প্রবাদ-প্রবচন- বাদ দিলে বাকীগুলো কতোটা সত্যি বা মিথ্যে সে বক্তব্যে না গিয়ে যদি বলি- সচেতন বা অবচেতনভাবে সেসব আমাদের মনে চরমভাবে পুরুষবান্ধব ও নারীবিদ্বেষী বাতাবরণ তৈরি করছে। তবে কি ভুল বলা হবে? হৃদয় দিয়ে আপনিই বিচার করুন।

x