বিএনপি নতুন ‘সংকটে’

যাচাই-বাছাইয়ে হেভিওয়েটরা বাদ বিকল্পরাই এখন নির্বাচন করবেন

মোরশেদ তালুকদার

বৃহস্পতিবার , ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ at ৫:২১ পূর্বাহ্ণ
1125

দলের চেয়ারপার্সনসহ হেভিওয়েট প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় বিএনপি নতুন করে ‘সংকটে’ পড়েছে বলেই ধারণা করা হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন মত আছে দলটির সিনিয়র নেতাদের। একটি অংশের দাবি, ‘এমন অনেক প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছে যারা এলাকায় গ্রহণযোগ্য। এদের অনেকেই দলীয় পরিচয়ের বাইরেও ব্যক্তিগত ইমেজের জন্য সাধারণ ভোটারদের কাছে জনপ্রিয়। তাই তাদের বাদ পড়ায় একধরনের সংকটই তৈরি হয়েছে।’
তবে সেটি মানতে নারাজ আরেকটি অংশ। তারা বলছেন, ‘হেভিওয়েট প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হবে, এমন সন্দেহ আগেই ছিল দলের। তাই প্রায় আসনেই একাধিক বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে। যাদের মনোনয়নপত্র বৈধও হয়েছে। মূল প্রার্থী বাদ পড়লে এসব বিকল্পরাই এখন নির্বাচন করবেন। এ বিকল্পদের অনেকে মূল প্রার্থীদের মতই গ্রহণযোগ্য। তাই বড় ধরনের সংকটে পড়েনি বিএনপি।’ অবশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ‘বিকল্পের মাধ্যমে প্রার্থী সংকট হয়তো দূর করা যাবে। কিন্তু বিকল্প সব প্রার্থীর ইমেজ মূল প্রার্থীর চেয়ে কম। তাছাড়া অতীতে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছেন এমন অনেকেই বাদ পড়েছেন। এদের জায়গায় নির্বাচনে অংশ নেয়া নবীন প্রার্থীরা অভিজ্ঞতার দিক থেকেও পিছিয়ে থাকবেন।
উল্লেখ্য, গত ২ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাই শেষে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে বিএনপির ১৪১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। দণ্ডপ্রাপ্ত, ঋণ খেলাপী এবং বিভিন্ন সেবাসংস্থার বিল বকেয়াসহ নানা কারণে এসব মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ১২ প্রার্থীর ১৩টি (এক প্রার্থী দুই আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন) মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। অবশ্য চট্টগ্রামে ১৬টি আসনের বিপরীতে ১৮০ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বাতিল হয় ৪৬টি। চট্টগ্রামে বাতিল হওয়াদের কেউ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন না।
বর্তমানে সারাদেশে বিএনপির বৈধ প্রার্থী আছেন ৫৫৫ জন। এছাড়া যারা বাদ পড়ছেন তারা গত দুইদিন আপিল করেছেন। যদিও শেষ পর্যন্ত আপিলকারীদের প্রার্থিতা বৈধ হয় কি না সেটা এখনো অনিশ্চিত। অনিশ্চয়তা আছে দলটির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাতিল হওয়া মনোনয়নপত্রের বৈধতা ফিরে পাওয়া নিয়েও।
এদিকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিন সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করে বলেছিলেন, ‘বেছে বেছে জনপ্রিয় প্রতিনিধিদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে’। অবশ্য এসব অভিযোগ নাকচ করে আসছেন নির্বাচন কমিশনারগণ।
সংকটে পড়বে বিএনপি :
জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজান দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘যাদের বাদ করা হয়েছে তাদের আপিলের মাধ্যমে ফেরার সম্ভাবনা আছে। বলা হয়েছিল, ছোটখাট ভুলগুলোর জন্য মনোনয়নপত্র বাতিল করা হবে না। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটি প্রযোজ্য করেনি। এখন আপিল করা হচ্ছে। যদি শেষ পর্যন্ত পুনর্বহাল না হয় সেক্ষেত্রে খুব বেশি সমস্যা হবে না। কারণ সেখানে তো বিকল্প প্রার্থী আছে।’
‘মাঠ পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা আছে এমন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় কোন সংকট তৈরি হবে কি না’ জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র এ নেতা ‘কিছুটা গ্যাপ তৈরি হবে’ উল্লেখ বলেন, ‘হেভিওয়েট প্রার্থীরা বাদ গেলে একটু তো সমস্যা হবেই। কারণ সবার ইমেজ এক নয়। এখানে বলা যেতে পারে, দলের ইমেজ তো আছেই। এর বাইরে ব্যক্তিগত ইমেজেরও একটা ভূমিকা থাকে। অনেক ভোটার আছেন, যারা রাজনীতির বাইরে এসে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে বেছে নেন। এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যরা বাদ গেলে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজে কিছুটা গ্যাপ হবে। মূল প্রার্থী এবং তার বিকল্পের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য তো থাকবেই। তবে আমরা আশা করছি সেটা কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে। কারণ, আমরা আগে থেকেই এমন ধারণা করেছিলাম, বাদ দেয়া হতে পারে। তাই ওই আসনটি যেন খালি না যায় (বিএনপির প্রার্থী না থাকা), সেজন্যই একাধিক প্রার্থী দিয়েছিলাম। মূল প্রার্থী যদি না ঠিকে তাহলে বিকল্প প্রার্থী নিয়েই আমরা মাঠে কাজ করবো।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ‘গণহারে বিএনপি’ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে উল্লেখ করে মোহাম্মদ শাহজান বলেন, ‘আমরা মনে করি, পক্ষপাতদুষ্টভাবে এটা করা হয়েছে। আমাদের প্রার্থীদের চেয়েও বড় ধরনের সমস্যা থাকার পরেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় নি। ছোটখাট যে ভুলগুলো ছিল সেগুলোর জন্যও বাতিল করে দেয়ার কোন মানে হয় না। কোথাও একটা ‘সই’ (স্বাক্ষর) পড়েনি বা কোন কাগজ জমা দেয় নি, সেটার জন্য চাইলে বাতিল নাও করতে পারতো। সইটা নিয়ে নিলে কি হয়? শর্ট থাকা কাগজটা জমা নিতে পারে। একেবারে বাতিল কেন? আবার আওয়ামী লীগের অনেকে ঋণ খেলাপী হওয়ার পরেও সুযোগ পাচ্ছে। সবমিলিয়ে বলতে পারি, বাছাই প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পদে পদে যে প্রতিবন্ধকতা আমাদের জন্য করা হচ্ছে তাতে সুষ্ঠু নির্বাচনের আালামত আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
বিকল্প থাকায় সংকট নেই :
এদিকে প্রার্থীদের মনোননয়নপত্র বাতিল হওয়াকে সংকট হিসেবে দেখছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান। প্রবীণ এ রাজনীতিবিদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘দুরভিসন্ধি করে আমাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হতে পারে। এমন ধারণা থেকে প্রায় জায়গায় আমরা একাধিক বিকল্প প্রার্থী দিয়েছিলাম। এ বিকল্প প্রার্থীরাও কিন্তু পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য। ওই হিসেবে তেমন কোন অসুবিধা হচ্ছে না।’
আবদুল্লাহ আল নোমান বলেন, এই নির্বাচনে প্রধানত দল এবং প্রতীক, এই দুটোর প্রাধান্য থাকে। এদিকে গ্রহণযোগ্যদের মধ্যে যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে বা যাদের বিরুদ্ধে আবার মামলা দিচ্ছে শেষ পর্যন্ত তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ হবে কি না জানি না। তবে বিকল্প হিসেবে যারা পাইপলাইনে আছেন, তারা অনুপোযুক্ত নন। মানুষ এমন ধারণা করবে না, ‘যে কোন একজনকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে’। মানুষ তাদেরকে ‘একসেপ্ট’ (গ্রহণ) করবে। তাই এটাকে (মনোনয়নপত্র বাতিল) বড় ধরনের সংকট বলে মনে করি না। কারণ, বিকল্প প্রার্থী শুধু একজন নয়। অনেক জায়গায় একাধিক প্রার্থীও আছে।
‘চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চট্টগ্রামে যারা বিকল্প হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন তাদের অনেকের গ্রহণযোগ্যতা আছে। তাদের সময় হয়েছে নির্বাচন করার। বলা যায়, এসব বিকল্পরাই দলের মনোনয়ন প্রতিযোগিতায় থাকার মত। তাই তাদের বাদ দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতেও সময় লাগছে।
চট্টগ্রামে বাদ পড়া ১৩ জন :
চট্টগ্রামে বাতিল হওয়া বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে বেশিরভাগই ‘হেভিওয়েট’ বলে দাবি করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে মীরসরাইয়ে ঋণ খেলাপী হওয়ার কারণে শাহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে পদত্যাগপত্র কপি জমা দিতে না পারায় উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমিনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। একইভাবে ঋণ খেলাপী হওয়ায় ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, সীতাকুণ্ডে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব লায়ন আসলাম চৌধুরী, রাউজানে সামির কাদের চৌধুরী, রাঙ্গুনিয়ায় আবু আহমেদ হাসনাত, কোতোয়ালী-বাকলিয়া আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য মোহাম্মদ সামসুল আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। এছাড়া সন্দ্বীপ আসনে টিএন্ডটি বিল বকেয়া থাকায় সাবেক সাংসদ মোস্তফা কামাল পাশা, বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় চান্দগাঁও-বোয়ালখালী আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান এম. মোরশেদ খান, দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় হাটহাজারীতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন ও তার ছেলে ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এবং তফসিল ঘোষণার আগে ব্যাংক হিসাব খোলার কারণে চান্দগাঁও-বোয়ালখালী আসনে এরশাদ উল্লাহর মনোনয়ন পত্র বাতিল হয়।

x