বিএনপির ভারত মিশন কতটা সফল হবে?

বিশেষ প্রতিনিধি

সোমবার , ১১ জুন, ২০১৮ at ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ
52

ঘনিয়ে আসছে নির্বাচন। তাই গত নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও এবার তারা দুটি বিষয়কে সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রথমত: তাদের দলীয় চেয়ারপার্সনের মুক্তি, দ্বিতীয়ত: নির্বাচনে অংশ গ্রহণ। ইতোমধ্যে এ নিয়ে তাদের বিভিন্ন প্রস্তুতিও চোখে পড়ার মত। সর্বশেষ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের লন্ডন সফর এবং দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতার ভারত সফর নিয়ে রাজনীতিক মহলে বেশ আলোচনা চলছে। অবশ্য এর আগে আ.লীগের একটি প্রতিনিধি দলও ভারত ঘুরে এসেছিল। তবে বিএনপির ভারত সফর বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কারণ হিসেবে রাজনীতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগে বিএনপি ভারত বিরোধীতা করলেও এবার তাদের সমর্থন পাওয়ার জন্য দৌঁড়ঝাপ করছে। তবে তাদের ভারত মিশন কতটা সফল হবে সেটা দেখতে আরো অপেক্ষা করতে হবে বলে মন্তব্য বিশ্লেষকদের।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, বিএনপির নেতারা বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ভারতের সহায়তা চেয়েছেন। লন্ডন সফররত বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। নির্বাচনের ব্যাপারে ভারতের কাছে ঠিক কী ধরনের সাহায্য চেয়েছে বিএনপি, বিবিসি বাংলার এমন প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, আমরা যেটা চাই ভারতের কাছে তা হলোবাংলাদেশে একটা সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারত যেন সহায়তা করে। ভারত আমাদের প্রতিবেশী ও প্রভাবশালী দেশ। তাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ, ঘনিষ্ঠ। তাদের যথেষ্ট যোগাযোগ আছে বাংলাদেশের সঙ্গে। সেখানে অবশ্যই ভারতের একটা ভূমিকা আছে। কিন্তু কিভাবে ভারত সহায়তা করবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, যেকোনো দেশ যদি বড় হয় এবং তাদের যদি একটা ইনফ্লুয়েন্স থাকে ব্যবসাবাণিজ্য এবং আঞ্চলিক বিষয়গুলিতে, সেক্ষেত্রে তারা অবশ্যই বলতে পারে একটা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা তোমরা করো। আমরা কোনো সাহায্য চাচ্ছি না। আমরা একটা অবাধনিরপেক্ষ নির্বাচন চাচ্ছি যেখানে সবাই ভোট দিতে পারে।

ভারতের যদি বাংলাদেশের ওপর এরকম একটা প্রভাব থাকেও, তারা কেন সেটা করবে? বিশেষ করে যখন বর্তমান সরকারের সঙ্গে ভারতের এত ভালো সম্পর্ক এবং বিএনপির ব্যাপারে ভারতে অনেকের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে, এমন প্রশ্নে ফখরুল বলেন, এই সন্দেহ অনেকটাই অমূলক। কারণ বাংলাদেশে বিএনপি সরকার কখনোই ভারতের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করেছে বলে আমার জানা নেই। আর দ্বিতীয়ত বাংলাদেশে একটা গণতান্ত্রিক সরকার, জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে এমন একটা সরকার ভারতের জন্যই খুব প্রয়োজন। আর ভারতের সঙ্গে বিএনপির বৈরি সম্পর্ক যেগুলো প্রচার করা হয়, সেটা ঠিক নয়।

কিন্তু বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ভারত তো এমন অভিযোগ করে যে বিএনপির আমলে উত্তরপূর্ব ভারতের বিদ্রোহীরা বাংলাদেশে আশ্রয়প্রশ্রয় পেয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্রের চালানের মতো বিষয় ঘটেছে, যেটা ভারতের কাছে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়, এসব বিষয়ে তিনি বলেন, এ ঘটনাগুলো কতটা সত্যি, কতটা তৈরি করা, তা কিন্তু এখনো পরিপূর্ণভাবে আমরা জানি না।

তবে ভারতের মধ্যে বিএনপির ব্যাপারে যে সন্দেহ, সেটা দূর করতে বিএনপির কোনো কৌশল আছে কিনা জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, অবাধনিরপেক্ষ নির্বাচনে ভারতের সহায়তা চাই। অবশ্যই, আমরা তো সুনির্দিষ্টভাবে বলেছি যে আমাদের পার্শ্ববর্তীদেশগুলোর সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক হবে, সে সম্পর্কে আমরা একটা পেপারও দিয়েছি। সেখানে আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, উই উইল হ্যাভ জিরো টলারেন্স এবাউট এনি ইনসারজেন্সী ইনসাইড বাংলাদেশ। তাদেরকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। আমরা স্পষ্ট করে বলেছি তাদের কোন অস্তিত্ব থাকবে না। স্পেস থাকবে না। এটা আমরা যদি সরকারে যাই, এটা আমরা অবশ্যই নিশ্চিত করবো।

বাংলাদেশে বিএনপির ভাবমূর্তি একটি ভারত বিরোধী দল হিসেবে। এখন মানুষ যদি দেখে বিএনপিও ভারতের দ্বারস্থ হচ্ছে, সেটা কি বিএনপির রাজনৈতিক ভাবমূর্তির ক্ষতি করবে না? বিবিসির এমন প্রশ্নে ফখরুল বলেন, আপনারা এটাকে এমনভাবে দেখছেন কেন। আপনারা যেভাবে বলছেন তাতে এটা দাঁড়ায় যে এটা একটা প্রতিষ্ঠিত ইমেজ হয়ে গেছে। কিন্তু প্রশ্নটা সেখানে নয়। বিএনপি যেটা বিশ্বাস করে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। আর বিএনপিকে বাংলাদেশের স্বার্থ দেখতে হবে। সেই স্বার্থ দেখতে গিয়ে কেউ যদি বলে যে আমরা ভারতের বিরুদ্ধে কথা বলছি সেটা কিন্তু সঠিক একটা অ্যানালিসিস নয় বলে আমি মনে করি। আমি করি পারস্পরিক মর্যাদাবোধ, পারস্পরিক স্বার্থ এটা খুব জরুরি। ভারতের তো এটা দায়িত্ব যেন বাংলাদেশে তাদের বিরোধী মনোভাব বা ধারণা তৈরি না হয়। যেটা কিনা তাদের জন্যও ক্ষতিকর, আমাদের জন্যও ক্ষতিকর।

মাসখানেক আগে ভারতের একটি প্রভাবশালী সাপ্তাহিকে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছিল, ‘যদি বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসে, তখন কী হবে?’ ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দুজন বিশ্লেষক, যারা কাজ করেন একটি ফরেন পলিসি থিংক ট্যাংকের সঙ্গে তারাই এই প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। এর ঠিক এক মাস পর বিএনপির উচ্চপর্যায়ের এক প্রতিনিধিদলকে দেখা গেল নয়াদিল্লিতে। সেখানে তারা দফায় দফায় কথা বলছেন, কিভাবে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যায় সেটা নিয়ে।

কিন্তু গত মাসখানেকের ঘটনা কি সেখানে কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে? বিএনপি কি তার ভারত সম্পর্কিত অবস্থানে বড় পরিবর্তন আনছে? ভারতের নীতিনির্ধারকরা কি বাংলাদেশ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন? বিএনপি নিয়ে কি নতুন আগ্রহ তৈরি হচ্ছে? এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিশ্লেষক মহলে।

এদিকে বিবিসি বাংলা জানায়, ভারতের কয়েকজন সাবেক কূটনীতিক, লেখক ও সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া যাচ্ছে যে বিএনপি ভারতের আস্থা অর্জনে নতুন করে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। বিএনপির নেতাদের কথাতেও তার আভাস মিলছে। আর এর পাশাপাশি ভারতের নীতিনির্ধারকরাও বাংলাদেশে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিতে বিবেচনায় রাখতে চাইছেন। বিএনপি যে বাংলাদেশে এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি, তারা যে ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে, আবারও বাংলাদেশে সরকার গঠন করতে পারে, এই বিবেচনাগুলো কিন্তু ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকরা একেবারে বাদ দিতে চাইছেন না।

বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত একটি ধারণা হচ্ছে, ভারতের কাছে আওয়ামী লীগ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি পছন্দের দল এবং বিএনপি ক্ষমতায় ফিরে আসুক এটি তারা চায় নাএমন প্রশ্নের জবাবে অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কূটনীতিক বীনা সিক্রি (যিনি দিল্লির জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়ার বাংলাদেশ স্টাডি সেন্টারের সাবেক চেয়ার) বলেন, এটা একেবারেই ভুল প্রশ্ন এবং ভুল দৃষ্টিভঙ্গী। ভারত বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, শান্তিপূর্ণ এবং সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে আগ্রহী। ভারতের নেইবারহুড ফার্স্ট পলিসির মূল কথাও এটাই। পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতেই এটা হবে।’ তিনি স্বীকার করেন, শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের বিরাট উন্নতি হয়েছে, কিন্তু তিনি একই সঙ্গে এটাও বলছেন, ভারত বাংলাদেশের যেকোনো রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী, কথা বলতে প্রস্তুত। তবে তাদেরকে অবশ্যই দুদেশের মধ্যে শান্তিপূর্ণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অব্যাহত রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে।

বিএনপি প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে তিনি বলেন, ভারত যে কারও সঙ্গে কথা বলতে রাজী। কারণ ভারত পিপলটুপিপল রিলেশনশীপে বিশ্বাসী। কাজেই যে কারও সঙ্গেই ভারত কথা বলতে রাজী।

অন্যদিকে ভারতের সাময়িকী আউটলুকের সাবেক ডেপুটি এডিটর এস এন এম আবদী বলেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। এটা ভারতীয় নীতির এক নম্বর প্রায়োরিটি। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারত কিন্তু একটি বিকল্প দৃশ্যপটের জন্যও তৈরি। ভারত বিএনপিকে খারিজ করে দেয়নি। ভারত অনেকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। শুধু বিএনপি নয়; জাতীয় পার্টির সঙ্গেও ভারত কথা বলে।’

বিএনপির অবস্থান পরিবর্তন সম্পর্কে তিনি বলেন, বিএনপি বুঝতে পেরেছে, পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে। ভারত হচ্ছে ঘরের পাশের প্রতিবেশী। কাজেই বাংলাদেশকে তো ভারতের সঙ্গে থাকতে হবে। আর ভারতেরও এই উপলবিদ্ধ বাড়ছে যে বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকতে হবে। কারণ বাংলাদেশে কোনো সমস্যা হওয়া মানে হচ্ছে ভারতের বগলে ফোঁড়া গজানোর মতো। বগলে ফোঁড়া হলে সেটা কতো যন্ত্রণাদায়ক, সেটা ভারত বুঝতে পারে।

তবে বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ভূমিকার প্রশ্নে বীনা সিক্রি বলেন, নির্বাচন আয়োজনের প্রাথমিক দায়িত্ব তো বাংলাদেশের। এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন ব্যাপার। কাজেই ভারত যে কোনো ভাবেই বাংলাদেশের এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে, এটা হবে না। কখনোই না। অতীতেও ভারত এটা কখনো করেনি এবং ভবিষ্যতেও ভারত কখনো এরকম হস্তক্ষেপের কথা বিবেচনা করবে বলে আমি মনে করি না।

x