বিএনপির প্রার্থী এখনো অনিশ্চিত

মনোনয়ন দৌঁড়ে গিয়াস কাদের ও গোলাম আকবর খোন্দকার

মোরশেদ তালুকদার ও মীর আসলাম

বুধবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:২৭ পূর্বাহ্ণ
376

একাদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির প্রার্থী কে হচ্ছেন সেটা এখনো অনিশ্চিত। তবে মনোনয়ন দৌঁড়ে আছেন এ আসন থেকে নির্বাচিত সাবেক দুই সাংসদ। এরা হচ্ছেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী এবং বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার। মনোনয়ন প্রাপ্তির ব্যাপারে আশাবাদী এ দুই নেতাই। সর্বশেষ যে তিনটি নির্বাচনে (১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮) বিএনপি অংশ নিয়েছিল তার প্রত্যেকটিতেই রাউজানে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী। তবে প্রথমবার ছাড়া বাকি দুই বার পরাজিত হয়েছিলেন তিনি। তবে স্বল্প ভোটে এ পরাজয় হয়েছিল উল্লেখ করে তার অনুসারিরা বলছেন, ‘অতীতের অভিজ্ঞতা এবং দলের জন্য ত্যাগ এ দুই কারণেই গিয়াস কাদেরকেই দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে আগামীতে। তাছাড়া তৃণমূলের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে তার। বিষয়টিও মূল্যায়ন করবে কেন্দ্র।’
অবশ্য গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারিরা বলছেন, ‘দীর্ঘ ১৫ বছর ধরেই আসনটি আওয়ামী লীগের দখলে। তাই আগামী নির্বাচনে এ আসনটি পুনরুদ্ধারে মনোযোগ থাকবে কেন্দ্রের। তাই বিগত সময়ে পরাজিত হয়েছেন এমন প্রার্থীর বিকল্প খুঁজছে কেন্দ্র। সেক্ষেত্রে এগিয়ে আছেন গোলাম আকবর খোন্দকার।’
গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী : একাদশ সংসদ নির্বাচনে রাউজানে বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী। তিনি ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত সপ্তম সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপি থেকে। অবশ্য এরপর অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলেও পরাজিত হয়েছিলেন। তবে আগামী নির্বাচনেও মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। প্রসঙ্গত, গিয়াস উদ্দীন কাদের চৌধুরী পর্যায়ক্রমে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক ও সদস্য ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কেন্দ্রীয় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও শিল্প বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক পদেও দায়িত্ব পালন করেন।
রাউজান উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক ফিরোজ আহমেদ দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে এবং বিএনপি নির্বাচনে গেলে রাউজানে গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীই হবেন দলের একমাত্র প্রার্থী। তার কোন বিকল্প নেই। ৯৬ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাঠের নেতাকর্মীদের সাথে বর্তমানে তিনি যোগাযোগ রক্ষা করেন। অন্য প্রার্থী হিসেবে যাদের কথা শোনা যাচ্ছে তাদের সঙ্গে মাঠের কর্মীদের যোগাযোগ নেই বহু বছর ধরে।’
রাউজান উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি ইউছুপ তালুকদার দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এবং রাউজানের জনগণ স্বতস্ফূর্তভাবে ভোট দিতে পারলে গিয়াস কাদের চৌধুরী বিজয়ী হবেন।’
গোলাম আকবর খোন্দকার :
রাউজান থেকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী গোলাম আকবর খোন্দকার ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ সংসদীয় আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ৭ম সংসদ নির্বাচনে মীরসরাইয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নির্বাচনী এজেন্ট ছিলেন তিনি।
১৯৬৮ সালে ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতি শুরু করা এ রাজনীতিবিদ ১৯৭৮ সালে রাউজান থানা জাগদলের আহবায়ক ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে এর মধ্যে ১৯৮৪, ১৯৯২ সালে সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৯৫, ২০০৩ সালে সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা। এর আগে কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির অর্থনৈতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন সাবেক এই রাষ্টদূত।
রাউজান পৌরসভা বিএনপির সাবেক সভাপতি সেকান্দর চৌধুরী দৈনিক আজাদীকে বলেন, ‘গোলাম আকবর খোন্দকার সাহেব আমাদেরকে ইলেকশন করবেন বলেছেন। সেই হিসেবে দল যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে তিনি মনোনয়ন পাবেন বলে আশা করছি। উনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ এবং রাউজানের মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা আছে।’
তৃণমূলে দলের অবস্থান :
১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে এই নির্বাচনী এলাকায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের খেলায় এগিয়ে ছিল সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরিবারের সদস্যরা। এই পরিবারের প্রভাব বলয়ে থাকা রাউজান সংসদীয় আসনটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয় বিভিন্ন সময় রাজনীতির রঙ বদলিয়েছেন। তারা নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখতে যখন যে রঙ, সেই রঙ মেখে নির্বাচন করেছেন, গিয়েছেন সংসদে।
স্বাধীনতার পরবর্তী নির্বাচনী ইতিহাস হচ্ছে, এ নির্বাচনী আসনের প্রথম (১৯৭৩) নির্বাচিত সাংসদ ছিলেন বাংলাদেশ সংবিধান রচয়িতা কমিটির অন্যতম সদস্য দৈনিক আজাদীর প্রয়াত সম্পাদক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ। ৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে ২০০১ সালের পূর্বসময় পর্যন্ত এই আসনটি আওয়ামীলীগের হাত ছাড়া হয়ে যায়। এই সময়ে আওয়ামীলীগের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল হারুন, মহিউদ্দিন চৌধুরীর বিপরীতে (বিএনপি, এনডিপি ও জাতীয় পাটির প্রার্থী হয়ে) নির্বাচন করে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন জহির উদ্দিন খান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গোলাম আকবর খোন্দকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী।
১৯৯৬ সালে এই আসনের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ হয়। ৯৬ এর জাতীয় নির্বাচনের মনোনয়ন দাখিল পুর্বসময়ে আওয়ামীলীগ-বিএনপি দুই দলই নবাগতদের মনোনয়ন দেয়। এসময় সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ভ্রাতৃদ্বয় বিএনপিতে যোগ দিয়ে নির্বাচনে পরস্পরের বিরুদ্ধে ভোট যুদ্ধে নামেন। এই সময় দলের মনোনয়ন পাওয়া না পাওয়ার বিরহ বেদনায় বিএনপি নেতা গোলাম আকবর খোন্দকার অনুসারীরা বিদ্রোহ করেন। সেই থেকে রাউজানের রাজনীতির মাঠে সাংগঠনিকভাবে বিএনপি বিভক্ত হয়ে আছে। বর্তমান সময় পর্যন্ত দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশের নিয়ন্ত্রন সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পরিবারের হাতে অপর অংশটির নিয়ন্ত্রণ করেন গোলাম আকবর খোন্দাকার।
স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সাল থেকে দলটির উভয় অংশের নেতাকর্মীরা এখানে রাজনৈতিক ভাবে কোণঠাসা। বিএনপি জামাত জোট সরকারের আমলে এখানে যারা দলের পরিচয়ে দাপড়ে বেড়াতো তাদের অনেকেরই অবস্থান এখন শহর অথবা অজ্ঞাতস্থানে। কেউ কেউ বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে আছে জেল হাজতবাসে। আবার কেউ কেউ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সাথে ভিড়ে এলাকায় সরব আছেন। যারা এখনো মনে প্রাণে বিএনপির রাজনৈতিক আদর্শে উজ্জ্বীবিত, তারা বলছেন রাজনীতি থেকে তারা আপাতত দূরে সরে আছেন। পরিবেশ সৃষ্টি হলে নির্বাচনী মাঠে নামবেন।

x