বিআরটিএর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক

গাড়ির ফিটনেস সনদ অগ্রহণযোগ্য হলে হবে না

শনিবার , ৯ মার্চ, ২০১৯ at ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ
50

ফিটনেস সনদ গ্রহণযোগ্য নয় দেশের এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ বাস ও মিনিবাসের। ১৪ শতাংশ ট্রাকেরও ফিটনেস সনদ অগ্রহণযোগ্য। একই অবস্থা সিএনজি চালিত অটোরিকশার। যেগুলোরও ১৮ শতাংশ ফিটনেস সনদ গ্রহণ করার মতো নয়। যানবাহনের ফিটনেস সম্পর্কিত এসব তথ্য উঠে এসেছে যানবাহনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ফিটনেস জরিপ সম্পর্কিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে। হাইকোর্টের নির্দেশে সম্প্রতি প্রতিবেদনটি দাখিল করেছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। যানবাহনের ফিটনেস সনদের এ বেহালের কারণে বিআরটিএতেই গলদ দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ফিটনেস সনদ ইস্যু তো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষই (বিআরটিএ) করে। তাহলে তাদের ইস্যু করা সনদের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না কেন। যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার বদলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে নজর বেশি দেয়ায় এমনটি হচ্ছে। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এ খবর প্রকাশিত হয়। খবরে আরো বলা হয়, পত্রিকাটির অনুসন্ধানেও বিশেষজ্ঞদের কথার সত্যতা বেরিয়ে এসেছে। গত বছরের আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের পর থেকে যানবাহনের ফিটনেস সনদ নেয়ার হার অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। ওই সময়ে ৫ থেকে ৯ আগস্ট পর্যন্ত ফিটনেস সনদ দেয়া হয় ৫ হাজার ১৪৩টি যানবাহনের। দৈনিক ১২ কর্মঘণ্টা হিসেবে সব মিলিয়ে বিআরটিএর কার্যালয় খোলা ছিল ৬০ ঘণ্টা। এ হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় ইস্যু হয়েছে ৮৫টির বেশি ফিটনেস সনদ। অর্থাৎ একটি ফিটনেস সনদ ইস্যু করতে সময় লেগেছে মাত্র ৪২ সেকেন্ড। দেশের সড়কগুলোয় যে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করে, সেটা যারা নিয়মিত বাসে, অটোরিকশা বা মিনিবাসে চলাচল করে তারা স্বাভাবিকভাবেই বোঝেন। চলতে চলতে হঠাৎ যানটি বন্ধ হয়ে যায়, তারপর চালক স্টিয়ারিং ছেড়ে গাড়ি থেকে নেমে ঠিকঠাক করে আবার গাড়ি স্টার্ট দেওয়া ইত্যাদি কার্যকলাপ থেকেই যাত্রীরা বুঝতে পারে গাড়ি স্বাভাবিকভাবে চলার শক্তি হারিয়েছে। শুধু শহর নগর ইত্যাদিতে চলাচল করা অধিকাংশ যানবাহনের বেহাল দশা দেখেই সাধারণ চোখেই এটা ধরা পড়ে। ভেবে অবাক হতে হয়, এ গাড়িগুলো সড়কে চলছে কী করে? এগুলোকে চলাচল করার সনদ দিলো কারা? গাড়ি চলাচল করার সনদ ইস্যু করে বিআরটিএ। তখন প্রশ্ন ওঠে মনে, বিআরটিএ এই গাড়িগুলোকে পরীক্ষা না করেই কি সনদ দিয়েছে। যদি দিয়ে থাকে তাহলে সেটা হয়েছে আইন অমান্য করা। যেসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার মধ্যে একটি হলো ফিটনেসহীন গাড়ি। ফিটনেস সনদ নিয়ে ফিটনেসহীন গাড়ির চলাচল দেশের পরিবহন খাতের নৈরাজ্যকে তুলে ধরেছে। আর এর জন্য ভুগতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে বাস-মিনিবাস-অটোরিকশা ও ট্রাকের ফিটনেস সনদ অগ্রহণযোগ্য হবার দায় বিআরটিএর ঘাড়ে গিয়েই পড়েছে। কারণ, তারাই তো যাচাইপূর্বক এই সনদগুলো ইস্যু করেছে। বস্তুতঃ এটা একদিকে যেমন বিআরটিএর এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করাকেই তুলে ধরেছে, তেমনি দেশের পরিবহন খাতে নৈরাজ্যকেই নির্দেশ করছে। গত বছর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিআরটিএ-র ফিটনেস সনদ প্রদান নিয়ে ঢাকার একটি দৈনিকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে দেখা গিয়েছিল, ওই সময় প্রতি ঘণ্টায় ৮৫টির বেশি ফিটনেস সনদও ইস্যু করা হয়েছিল। অর্থাৎ একটি ফিটনেস সনদ ইস্যু করতে সময় লেগেছিল মাত্র ৪২ সেকেন্ড। যেখানে ফিটনেস পরীক্ষার চারটি ধাপে সময় প্রয়োজন সর্বনিম্ন ৩ ঘণ্টা, সেখানে ৪২ সেকেণ্ডে একটি সনদ ইস্যু করা কী করে সম্ভব হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তখন বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, সম্ভবত যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষার বদলে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির দিকে বেশি নজর দিয়েছে বিআরটিএ; তা না হলে তাদের ইস্যু করা ফিটনেস সনদের গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না কেন? সঙ্গত প্রশ্ন। যদি সেটাই হয়ে থাকে তাহলে সেটা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগজনক। এ ধরনের কার্যক্রম সড়কে সনদ নিয়ে ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বাড়াবে; আর এতে বৃদ্ধি পাবে সড়ক দুর্ঘটনা। যখন চেষ্টা চলছে ক্রমেই ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের, তখন বিআরটিএর দায়িত্বে অবহেলা কোনক্রমেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোন যুক্তিতেই দায়সারাভাবে ফিটনেস সনদ দিতে পারে না বিআরটিএ। সনদ প্রদান প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছতার সঙ্গে যথাযথভাবে সম্পন্ন করতে হবে। তা না হলে, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের ফিটনেস সনদ পাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাবে।
একটি বিস্ময়ের্ল্ল্ল ব্যাপার হলো, ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে হামেশা চলাচল করলেও হঠাৎ হঠাৎ বন্ধ থাকে। সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে বিআরটিএর পক্ষ থেকে যখন ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরতে অভিযান চালানো হয় তখন ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে পাওয়াই যায় না। কিন্তু যেই অভিযান শেষ হয় তখন আবার সড়কে ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল করতে থাকে। যখন ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিকেরা গাড়ি বন্ধ রাখেন, তখন যানবাহন সংকটে জনগণকে অশেষ ভোগান্তি পোহাতে হয়। ফিটনেসবিহীন গাড়ি মালিকের এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। যথাযথভাবে পরীক্ষা না করে বিআরটিএ গাড়ির ফিটনেস সনদ দেবে না, এই প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বিআরটিএ সম্পর্কে দুর্নীতির যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে ও ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে সেগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এসবের জন্য বিআরটিএ-র সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংস্থাটিকে শক্তিশালী করা দরকার। সর্বোপরি বিআরটিএর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। আর মাঝে মাঝে নয়, নিয়মিতভাবে বিআরটিএসহ প্রশাসনকে সারাদেশে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে এ প্রবণতা অনেকটা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব বলে আমাদের ধারণা। বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি প্রতিরোধ ও সড়কে শৃঙ্খলা আনতে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে সুপারিশ করা হয়েছে। সমস্যার ব্যাপকতাও তার মাত্রা বোঝার জন্য যানবাহন, বিশেষ করে গণপরিবহনের ওপর সার্ভে পরিচালনা করা জরুরি বলেও জানানো হয়েছে প্রতিবেদনে। সরকারকে এগুলো গুরুত্ব সহকারে আমলে নিয়ে কাজ করতে হবে।

x