বাড়তি খাবার বা শিশুপুষ্টি

ডা. শহীদুল্লাহ চৌধুরী

শনিবার , ১৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৮:৪৫ পূর্বাহ্ণ
84

৬ মাস পর্যন্ত শিশুর শারিরীক মানসিক সব ধরণের যথাযথ বৃদ্ধি ও ক্রমবিকাশের জন্য এবং বিভিন্ন ধরণের রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্ত রাখার জন্য মায়ের দুধের কোনো বিকল্প নেই। শুধুমাত্র মায়ের দুধের মাধ্যমে জন্ম থেকে ৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে সুস্থ সবল এবং প্রাণবন্ত রাখা যায়। ঐ সময়ের মধ্যে আমরা শিশুকে মায়ের দুধ ছাড়া এক ফোঁটা পানি দিতেও নিষেধ করি। মনে রাখতে হবে যে, মায়ের দুধ শিশুর জন্য মায়ের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠ উপহার এবং সৃষ্ঠিকর্তার পক্ষ থেকে স্বর্গীয় দান। কিন্তু ৬ মাসের পর থেকে শিশুকে মায়ের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দিতে হবে। কারণ এই সময় শিশুর বৃদ্ধি এত বেশি হয়ে থাকে যার ঘাটতি শুধুমাত্র মায়ের দুধ দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এই বাড়তি খাবারকে আমরা Complementary Food বলে থাকি। বাড়তি খাবার এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে, পর্যাপ্ত পরিমাণে শর্করা, প্রোটিন, ভিটামিন ও মিনারেল থাকে। এইসব উপাদান সমৃদ্ধ খাবারকে সুষম খাদ্য বা Balanced Diet বলা হয়। অতি সহজে ঘরে বসেই সুষম খাদ্য তৈরি করা যায়। মনে রাখতে হবে, ঐ ধরণের খাবার তৈরি করতে যা সহজেই ঘরে প্রস্তুত করা যায় এবং শিশুর সহজেই হজম হয় বা শিশু খেতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। আর ঐ খাবারে শিশুর শারিরীক ও মানসিক বৃদ্ধি দ্রুত হয় এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৬মাস পর থেকে একদিকে যেমন শিশুর খাবারের চাহিদা বৃদ্ধি পায় অন্যদিকে মায়ের দুধের খাবারের বিভিন্ন উপাদান বিশেষ করে আয়রন, ভিটামিন এ, বি, প্রোটিন এবং জিঙ্ক এর যে ঘাটতি থাকে তা শিশুর যথাযথ বৃদ্ধিতে সহায়ক নয়। তাই ঐ সময় শিশুকে পর্যাপ্ত পরিমাাণে সুষম পরিমাণে দিতে হবে। খাবার তৈরির ক্ষেত্রে খাদ্যের সব উপাদানের সাথে ভিটামিন ও মিনারেলসমৃদ্ধ খাবার যোগ করতে হবে।

৫বছরের নিচে শিশুদের নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে, পুষ্টিহীনতায় ভুগছে বেশিরভাগ শিশু। তন্মধ্যে আয়রনের ঘাটতি দেখা গেছে প্রায় ৫৫ শতাংশ শিশুর, বেঁটে বা খাটো থাকে ৪০ শতাংশ এবং ওজন কম থাকে ৩৬ শতাংশ শিশুর।

৬ মাস বয়স পর্যন্ত শিশু মায়ের কাছ থেকে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) পায় বলে শিশু রোগাক্রান্ত হয় কম, কিন্তু এরপর থেকে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় ভিটামিন ও মিনারেল এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপাদানসমৃদ্ধ খাবারে-এককথায় সুষম খাবারে। তাই প্রয়োজনীয় উপাদানসমৃদ্ধ খাবারের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। যদি পুষ্টিহীনতা শুরু হয় তাহলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে-যা নিচের চিত্র থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যাবে।

ওজন কমে যাওয়া ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া

দৈনিক অপর্যাপ্ত বা কম খাবার গ্রহণ

ক্ষুধামন্দা

ভিটামিন ও খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানের ঘাটতি

বদহজম

শিশুর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া

এভাবে চলতে থাকলে শিশু অতিরিক্ত পুষ্টিহীনতায় ভুগতে থাকবে এবং শিশুর জীবননাশেরও সম্ভাবনা থাকে। আয়রন, বিভিন্ন ভিটামিন (এ, বি, সি, ডি) জিঙ্ক, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার যেমন সবুজ শাকসবজি, গাজর, মিষ্টিকুমড়া, আপেল, কলা, মালটা, কমলা, ডালিম, আম, আনারস নানারকম ফরমালিনমুক্ত ও ভেজালমুক্ত ফলমুল নিয়মিতভাবে শিশুকে খাওয়াতে হবে। তাহলেই একটি শিশু হৃষ্টপুষ্ট, স্বাস্থ্যবান, তীক্ষ্মবুদ্ধিসম্পন্ন ও রোগমুক্তভাবে সহজেই আমাদের পরিবারে বড় হয়ে বেড়ে উঠবে এবং পরবর্তীতে দেশ-জাতিকে নেতৃত্ব দেবে। ফলে বিশ্বে আমরা একদিন উন্নত জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবো। আমরা জানি, একটি শিশুর যাবতীয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে তার সুস্থ মস্তিষ্ক। এই মস্তিষ্কের প্রায় ৮০ শতাংশ গঠন হয়ে যায় মাত্র ২ বছর বয়সে। সুতারাং পুষ্টিমানসমৃদ্ধ খাবারই পারে সুন্দর সুস্থ ও মেধাসম্পন্ন শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি গঠাতে।

শিশুকে বাড়তি খাবার দেয়া শুরু করার পদ্ধতি

হঠাৎ করে শিশুকে অতিরিক্ত বা শক্ত খাবার দেওয়া ঠিক হবে না। শুরুতেই মায়ের দুধের পাশাপাশি তরল জাতীয় খাবার পরিবেশন করাতে হবে। সময় ভাগ করে বাড়তি খাবার দিতে হবে। শুরু করার এক মাসের মধ্যে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, বিকালের নাস্তা এবং রাতের খাবার অল্প অল্প পরিমাণে দিতে হবে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে শিশুর খাবারের পরিমাণও বাড়াতে হবে।

প্রথমে ১৫০-২০০মি.লি. বাটির ১ বাটি করে ১-২ বার, পরবর্তীতে ২০০-২৫০মি.লি. বাটির ১ বাটি করে ২-৩ বার করে প্রয়োজনমত খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। শিশুকে জোর করে বেশি খাবার খাওয়ানোর চিন্তা করা কখনোই সঠিক হবে না।

লেখক : কনসালটেন্ট (শিশু), চাইল্ড কেয়ার হসপিটাল, চট্টগ্রাম

x